সাক্ষীর এ-ভূমিকায় স্বামী ভালো নয়। এখানেও আবার তার আবশ্যকতাগুলো দ্ব্যর্থবোধক। তার স্ত্রীটি যদি অত্যন্ত রূপসী হয়, তাহলে সে ঈর্ষা বোধ করতে থাকে; তবে প্রতিটি স্বামীই কম-বেশি একেকটি রাজা কানদৌলেস; সে চায় তার স্ত্রী তার সুনাম বাড়াবে, এজন্য তার স্ত্রীকে হতে হবে রুচিশীল, সুন্দরী, বা অন্তত ‘চলনসই’; নইলে তারা যখন এঙ্গে কোথাও যায় তখন সে হয় বদমজাজি ও শ্লেষপরায়ণ। আমরা দেখেছি বিয়েতে যৌন ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোর সুসামঞ্জস্য ঘটে না, এবং এখানে প্রতিফলিত হয় এ-শত্রুভাবাপন্নতা। যে-নারী বাড়িয়ে তোলে তার যৌনাবেদন, সে রুচিহীনতার পরিচয় দেয়, তার স্বামীর মতে; অন্য নারীতে যা তার কাছে মনে হতো প্রলুব্ধকর, নিজের স্ত্রীতে সেই প্রগলভতা সে অনুমোন করে না, এবং এই অননুমোদন নষ্ট করে দেয় যে-কোনো কামনা, যা সে বোধ করতে পারতো ভিন্ন অবস্থায়। তার স্ত্রী সংযতভাবে বেশভূষা করলে সে তা অনুমোদন করে, তবে করে নিরুৎসুকভাবে : তখন স্ত্রীকে তার আকর্ষণীয় লাগে না এবং অস্পষ্টভাবে নিন্দনীয় মনে হয়। এজন্যে সে কদাচিৎ স্ত্রীকে দেখে নিজের চোখে; সে স্ত্রীকে দেখে অন্যদের চোখ দিয়ে। ‘তার সম্বন্ধে লোকে কী বলবে?’ তার অনুমানগুলো ঠিক হওয়ার কথা নয়, কেননা সে তার স্বামিত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যদের দেয় কৃতিত্ব।
যখন নারী দেখে তার বেলা যে-বেশভূষা ও আচরণকে তার স্বামী সমালোচনা করে, কিন্তু মুগ্ধ হয় অন্য নারীর বেলা, এর থেকে আর কিছুই নারীকে অধিকতর রুষ্ট করে না। অধিকন্তু, বলা দরকার স্বামীটি এতো কাছে থাকে যে সে তার স্ত্রীকে দেখে; তার কাছে স্ত্রীর চেহারা সব সময় একই রকম; সে তার নতুন বেশভূষাও দেখে, কেশবিন্যাসের বদলও দেখতে পায় না। এমনকি প্রেমময় স্বামী বা ব্যাকুল প্রেমিকও প্রায়ই নির্বিকার থাকে নারীর বস্ত্রের প্রতি। যদি তারা তাকে নগ্নরূপে দেখতে ভালোবাসে, তাহলে এমনকি সবচেয়ে শোভন বস্ত্রটিও তাকে গোপন করার বেশি আর কিছু করে না; এবং সে চোখধাধানো থাকলেও তাদের কাছে যেমন প্রিয় থাকে, একই রকম প্রিয় থাকে খারাপ বস্ত্রে বা ক্লান্ত অবস্থায়। যদি তারা আর তাকে ভালো না। বাসে, তাহলে অতিশয় রূপবাড়ানো রও কোনো কাজে আসে না। বস্ত্র হতে পারে বিজয়ের অস্ত্র, তবে এটা প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র নয়; এর কলা মরীচিকা সৃষ্টির, এটা চোখের সামনে উপস্থিত করে একটা কাল্পনিক বস্তু; তবে যেমন ঘটে প্রাত্যহিক জীবনের ঘনিষ্ঠতার মধ্যে, তেমনি রক্তমাংসের আলিঙ্গনের মধ্যে চোখের সামনে থেকে বিলীন হয়ে যায় সব মরীচিকা; দাম্পত্য হৃদয়ানুভূতি, শারীরিক প্রেমের মতোই, বিরাজ করে বাস্তবতার স্তরেই। যে-পুরুষটিকে সে ভালোবাসেনারী তার জন্যে বেশভূষা করে না।
প্রায়ই বলা হয়ে থাকে নারীরা বেশভূষা করে অন্য নারীদের মনে ঈর্ষা জাগানোর জন্যে, এবং এ-ঈর্ষা প্রকৃতপক্ষে সাফল্যের একটা সুস্পষ্ট লক্ষণ : তবে এটাই একমাত্র লক্ষ্যবস্তু নয়। ঈর্ষান্বিত বা বিমুগ্ধ অনুমোদনের মাধ্যমে সে সে ধ্রুব ঘোষণাকরতে চায় তার সৌন্দর্যের, পোশাকের চমৎকারিত্বের, তার রুচির–তার নিজের; সে নিজের কাছে প্রদর্শন করে যে সে নিজে দিয়েছে নিজের অস্তিত্ব। এতে সে নিজেকে দান করে এক বেদনাদায়ক পরনির্ভরতার কাছে; স্বীকৃতি না পেলেও গৃহিণীর বিশ্বস্ত সেবা উপকারী; ছেনালের উদ্যোগগুলো হয় ব্যর্থ যদি তা কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করে। সে চায় নিজের এক সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন, এবং ধ্রুবর জন্যে তার এ-দাবিই তার সন্ধানকে করে তোলে অত্যন্ত হয়রানিপূর্ণ; যদি নিন্দে করে শুধু একটি কণ্ঠ, তাহলে এ-হ্যাটটি হয়ে ওঠে বিশ্রী; একটা প্রশংসা তাকে সুখী করে কিন্তু একটা ব্যর্থতা তাকে ধ্বংস করে দেয়; এবং ধ্ৰুব যিহেতু প্রকাশ পায় অজস্র ব্যাপারপরম্পরায়, তাই সে কখনোই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে না। এজন্যেই ফ্যাশনপরায়ণ নারী, ছেনাল, অতিশয় অরক্ষিত; এটাও ব্যাখ্যা করে কেনো কিছু কিছু সুন্দরী ও বহুলপ্রশংসিত নারী দুঃখের সাথে বিশ্বাস করে যে তারা সুন্দরীও নয় রুচিশীলও নয়, তারা যার অভাব বোধ করে, তা হচ্ছে একজন অজানা বিচারকের চূড়ান্ত অনুমোদন; কেননা তাদের লক্ষ্য একটা চিরস্থায়ী অস্তিত্ত্বাবস্থা (আঁ-সো) যা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
‘ভাবতেও কষ্ট লাগে,’ লিখেছেন মিশেলে, ‘নারী, সে-আপেক্ষিক সত্তা, যে বেঁচে থাকতে পারে শুধু একটি দম্পতির একটি সদস্য হিশেবে, সে প্রায়ই নিঃসঙ্গ থাকে পুরুষের থেকে অনেক বেশি। পুরুষ সবখানে সঙ্গী পায়, ধারাবাহিকভাবে পাতায় নতুন নতুন সম্পর্ক। পরিবার না থাকলে নারী কিছুই না। আর পরিবার হচ্ছে এক বিধ্বস্তকর বোঝ; তার সব ভার পড়ে নারীর ওপর’। এবং, সত্যিকারভাবেই, নারী তার সীমাবদ্ধ এলাকা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জানতেও পারে না একই লক্ষ্যে কর্মরত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গলাভের আনন্দ; নারীর কাজ তার মনকে অধিকার করে রাখে না, তার প্রশিক্ষণ তার মনে স্বাধীনতার জন্যে আকাঙ্খও জাগায় না, স্বাধীনতাকে ব্যবহার। করার জন্যে কোনো অভিজ্ঞতাও দেয় না, এবং তবুও সে তার দিনগুলো কাটিয়ে দেয় একাকীত্বের মধ্যে। বিয়ে তাকে হয়তো বহু দূরে সরিয়ে নিয়েছে তার নিজের পরিবার ও যৌবনকালের বন্ধুদের থেকে, এবং নতুন পরিচিতদের ও বাড়িথেকে প্রাপ্ত চিঠিপত্র দিয়ে এ-উলতার ক্ষতিপূরণ করা কঠিন। এবং নববধু ও তার পরিবারের মধ্যে। প্রকৃত অন্তরঙ্গতা নাও থাকতে পারে, এমনকি তারা কাছাকাছি থাকলেও তার মাও তার প্রকৃত বন্ধু নয় তার বোনেরাও নয়। বাসস্থানের অভাবে আজকাল অনেক তরুণ দম্পতি তাদের শ্বশুরশাশুড়ির সাথেই থাকে; কিন্তু এবাধ্যতাবশত একত্রবাস কোনোমতেই সব সময় বধুটির জন্যে প্রকৃত সাহচর্যের উৎস হয়ে ওঠে না।
