এসব জয়, যেগুলোর জন্যে নারী ন্যায়সঙ্গতভাবেই উল্লাস বোধ করতে পারে, সেগুলো ছাড়াও নিজেকে আকর্ষণীয় রাখা বোেঝায়–গৃহ রক্ষণাবেক্ষণের মতোইস্থিতিকালের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ; কেননা তার শরীরও এমন একটি বস্তু, সময়ের সাথে সাথে যার অবনতি ঘটে। আঁ জু পেরদায় কলেৎ অদ্রি বর্ণনা করেছেন এ-লড়াই, যা ধুলোর সাথে গৃহিণীর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয় :
তা আর যৌবনের টানটান মাংস ছিলো না; তার বাহু ও উরুর পেশির গঠন দেখা যেতো শিথিল চামড়ায় ঢাকা মেদের একটা স্তরের নিচে। উদ্বিগ্ন হয়ে সে আবার বদলালো তার কর্মসূচি : সকালে আধঘন্টা ব্যায়াম, এবং রাতে, শুতে যাওয়ার আগে, পনেরো মিনিট অঙ্গসংবাহন। সে পড়ে দেখতে লাগলো চিকিৎসাবিদ্যার বই ও ফ্যাশন ম্যাগাজিন, কটিরেখার দিকে লক্ষ্য রাখার জন্যে। পান করার জন্যে সে ফলের জুস বানাতে লাগলো, মাঝেমাঝে জোলাপ নিতে লাগলো, এবং থালাবাসন ধোয়ার সময় সে রবারের দাস্তানা পরতে শুরু করলো। তার দুটো কাজ–তার দেহকে নবযৌবন দেয়া ও তার গৃহকে ঘষেমেজে ঝকঝকে রাখা–অবশেষে হয়ে উঠলো একটি কাজ, তাই শেষে সে গিয়ে পৌছোলো এক ধরনের কানাকেন্দ্রে… বিশ্বটি যেনো থেমে গেছে, ঝুলে আছে বয়স ও ক্ষয়ের বাইরে… তার স্টাইলের উন্নতির জন্যে সে সাঁতারের দিঘিতে কঠোর রীতিতে সাঁতার শিখতে লাগলো, এবং রূপচর্চার সাময়িকীগুলো তার মনোযোগ কেড়ে নিলো ওগুলোর পুনরাবৃত্ত রূপচর্চার প্রণালি দিয়ে।
এখানে আবার নিত্যনৈমিত্তিকতার ফলে সৌন্দর্যচর্চা আর জামাকাপড় রক্ষণাবেক্ষণ হয়ে ওঠে একটা নীরস একঘেয়ে খাটুনি। সব সজীব বিকাশেরই মূল্য হ্রাস পাওয়ার বিভীষিকা কিছু কিছু কামশীতল বা হতাশাগ্রস্ত নারীর মধ্যে জীবন সম্বন্ধেই জাগিয়ে তোলে বিভীষিকা; অন্যরা যেমন সংরক্ষণ করে আসবাবপত্র বা বইয়মে রক্ষিত খাদ্য, তারা তেমনভাবে প্রচেষ্টা চালায় নিজেদের সংরক্ষণের। এ-নেতিবাচক একগুঁয়েমি তাদের করে তোলে নিজেদের অস্তিত্বের শত্রু এবং অন্যদের প্রতি বৈরী : সুখাদ্যে নষ্ট হয় দেহসৌষ্ঠব, মদে নষ্ট হয় গাত্রবর্ণ, বেশি হাসির ফলে চামড়ায় ভঁজ পড়ে, রোদে নষ্ট হয় ত্বক, ঘুমে হয়ে উঠতে হয় নিষ্প্রভ, কাজে জীর্ণ হয় দেহ, রমণের ফলে চোখের নিচে দাগ পড়ে, চুম্বনে লাল হয় গাল, স্পর্শাদরে নষ্ট হয় স্তনের গঠন, আলিঙ্গনে বিবর্ণ হয় মাংস, মাতৃত্ব বিকৃত করে চেহারা ও দেহ। আমরা জানি কতোটা রাগে তরুণী মা দূরে রাখে তার ববনাচের গাউনের প্রতি আকৃষ্ট শিশুকে : ‘তোমার চটচটে হাতে আমাকে ছুঁবে না, তুমি আমার পোশাকটা নষ্ট করবে!’ ছেনালও একই রকম রূঢ়ভাবে প্রত্যাখান করে স্বামী বা প্রেমিকের ব্যাকুল প্রণয়নিবেদন। সে নিজেকে রক্ষা করতে চায় পুরুষ থেকে, বিশ্ব থেকে, সময় থেকে, যেমন লোকজন ঢাকনা লাগিয়ে রক্ষা করে আসবাবপত্র।
তবে এসব সাবধানতাও পাকা চুল ও কাকের পার (অর্থাৎ চোখের কোণের কাছে চামড়ার কুঞ্চন) আবির্ভাব প্রতিরোধ করতে পারে না। যৌবনকাল থেকেই নারী জানে যে এ-নিয়তি অনিবার্য। এবং তার সমস্ত দূরদর্শিতা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা ঘটবেই : তার পোশাকের ওপর ছলকে পড়ে মদ, কোনো একটি সিগারেটের আগুনে পোড়ে পোশাকটি; এর ফলে হারিয়ে যায় সে-বিলাসিনী ও উৎসবপরায়ণ প্রাণীটি, যে গর্বিত হাসি নিয়ে আসতো নাচঘরে, কেননা তার মুখে এখন গৃহিণীর রাশভারী কঠোর ভঙ্গি; অচিরেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তার প্রসাধন বিশেষ একটি মুহূর্তকে অপরিমিত আলোতে ঝলকিত করার জন্যে কোনো আতশবাজির সমষ্টি ছিলো না, ছিলো না স্বল্পস্থায়ী উজ্জ্বলদীপ্তির ঝিলিক। এটা বরং এক সম্পদ, মূলধনীয় পণ্য, একটি বিনিয়োগ; এটা বুঝিয়েছে আত্মােৎসর্গ, এটার ক্ষতি এক সত্যিকার বিপর্যয়। দাগ, অর্শ, যেমন-তেমন তালি মেরে তৈরি পোশাক, বিশ্রী কেশবিন্যাস অনেক বড়ো প্রলয় পোড়া রোস্ট বা একটা ভাঙা পুষ্পধারের থেকে, কেননা ফ্যাশনপরায়ণ নারী বস্তুর। মধ্যে নিজেকে শুধু প্রক্ষেপই করে না, সে নিজেকে করে তুলতে চায় বস্তু, এবং এখন বিশ্বে সে নিজেকে সরাসরি আক্রান্তবোধ করছে। বস্ত্রপ্রস্তুতকারক ও টুপিবিক্রেতার সাথে তার সম্পর্ক, তার শারীরিক অস্থিরতা, কড়া চাহিদাগুলো–এসবই প্রকাশ করে তার গম্ভীর মনোভাব ও অনিরাপত্তাবোধ। একটা সুপ্রস্তুত গাউন তাকে করে তোলে তার স্বপ্নের সম্রান্ত মানুষ; কিন্তু একই প্রসাধন দুবার ব্যবহার করে, বা একটা বাজে প্রসাধন ব্যবহার করে, নিজেকে তার মনে হয় সমাজচ্যুত। মারি বাশকির্তসেভ আমাদের বলেছেন যে তার হাস্যরস, চালচলন, ও মুখের ভাব সবই নির্ভর করতো। তাঁর গাউনের ওপর; যখন তিনি মানানসই পোশাক পরা থাকতেন না, তখন নিজেকে তার মনে হতো বেঢপ, সাধারণ, এবং অবমানিত বোধ করতেন। খারাপ বেশে কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার থেকে অনেক নারী তাতে যাবেই না, যদিও সেখানে তাদের হয়তো পৃথকভাবে কেউ খেয়ালই করবে না।
কিছু নারী যদিও দাবি করে যে তারা ‘নিজেদের জন্যে বেশভূষা করে’, তবে আমরা দেখেছি এমনকি আত্মরতির মধ্যেও ইঙ্গিত থাকে যে অন্যরা তাদের দেখবে। পোশাকের প্রতি আসক্ত নারীরা, শুধু পাগল ছাড়া, কখনোইপুরোপুরি সুখ পায় না যদি অন্যরা তাদের দেখে; সাধারণত তারা সাক্ষী চায়। বিয়ের দশ বছর পরও তলস্তয়ের স্ত্রী চাইতেন যে তাঁর দিকে মুগ্ধচোখে তাকাক লোকজন এবং তাঁর স্বামী এটা দেখুন। তিনি ফিতে ও অলঙ্কার পছন্দ করতেন এবং চাইতেন চুলে ঢেউ খেলাতে; এবং যদি কেউ খেয়াল না করতো তাতে কী? কিন্তু তার ইচ্ছে করতো চিল্কার করে কাঁদতে।
