প্রসাধনের এ-সামাজিক তাৎপর্য তার বেশভূষার মধ্য দিয়ে নারীকে প্রকাশ করতে দেয় সমাজের প্রতি তার মনোভাব। যদি সে প্রচলিত নিয়মের অনুগত হয়, তাহলে সে গ্রহণ করবে সতর্ক ও কেতাদুরস্ত ব্যক্তিত্ব। এখানে আছে বহু সম্ভবপর সূক্ষ্ম দ্যোতনা :সে নিজেকে তুলে ধরতে পারে ভঙ্গুর, শিশুসুলভ, রহস্যময়ী, অকপট, অনাড়ম্বর, উচ্ছল, অচঞ্চল, বেশ সাহসী, প্রশান্ত গম্ভীর রূপে। অথবা, এর বিপরীতে, যদি সে প্রথা অমান্য করে, তাহলে সে তার মৌলিকত্ব দিয়ে দর্শনীয় করে তুলবে সেটাকে। উল্লেখযোগ্য যে বহু উপন্যাসে ‘মুক্তনারী’ নিজের স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে তার পোশাকের স্পর্ধার সাহায্যে, যা জোর দেয় কামসামগ্রি হিশেবে তার প্রকৃতির উপর, সুতরাং তার পরনির্ভরশীলতার ওপর। উদাহরণস্বরূপ, এডিথ হোয়ারটনের দি এইজ অফ ইনসন্সএ এক তরুণী বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারী, যার আছে এক রোমাঞ্চপূর্ণ অতীত ও একটি দুঃসাহসী হৃদয়, সে প্রথমে দেখা দেয় বুকের দিকে বেশি করে কাটা একটি পোশাক পরে; সে যে কেলেঙ্কারির ঢেউ জাগিয়ে তোলে সেটা স্পষ্টভাবেই সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর প্রতি তার ঘৃণার প্রকাশ। একই ধরনে, তরুণী মেয়ে আনন্দ। পায় একজন পরিণত বয়সের নারীর মতো সাজতে, বৃদ্ধ নারী সুখ পায় ছোট্ট মেয়ের মতো সাজতে, বারবনিতা সাজতে পছন্দ করে ভদ্র সমাজের নারীর মতো, আর পরেরজন পছন্দ করে ‘স্বৈরিণী’র মতো সাজতে।
প্রতিটি নারী যদি তার মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেশভূষাও করে, তবু থাকে একটা অভিসন্ধি : ছদ, শিল্পকলার মতোই, কল্পজগতের জিনিশ। শুধু কাঁচুলি, বক্ষবন্ধনি, কলপ, প্রসাধনই দেহ ও চেহারাকে ছদ্মবেশ দেয় না; নারীদের মধ্যে যে সবচেয়ে কম পরিশীলিত, সেও যখন ‘বেশভূষা করে’, সেও নিজেকে ধরা দেয় না পর্যবেক্ষণের কাছে; ছবি বা মূর্তির মতো, বা মঞ্চের কোনো অভিনেতার মতো সে হয়ে ওঠে এক প্রতিনিধি, যার মাধ্যমে নির্দেশ করা হয় অনুপস্থিত কাউকে–অর্থাৎ, সেচরিত্রটিকে, যার সে উপস্থাপক, কিন্তু নিজে ওই চরিত্রটি নয়। অলীক, অটল, উপন্যাসের নায়কের মতে, কোনো প্রতিকৃতি বা আবক্ষ প্রতিমার মতো বিশুদ্ধ কিছুর সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন বোধ করে সে সন্তোষ লাভ করে; সে প্রাণপণে চেষ্টা করে নিজেকে এ-মূর্তিটির সাথে অভিন্ন করে তুলতে এবং এভাবে তার মনে হয় যেনো সে সুস্থিত করেছে নিজেকে, প্রতিপন্ন হয়েছে তার মহিমার যাথার্থ্য।
ঠিক এভাবেই, মারি বাশকির্তসেভের এক্রিৎ এতিম-এ আমরা দেখতে পাই তিনি পাতার পর পাতায় অক্লান্তভাবে বাড়িয়ে চলছেন তাঁর মূর্তি। তাঁর একটি পোশাকের কথা জানাতেও তিনি কৃপণতা করেন না; তাঁর মনে হয় যেননা তিনি রূপান্তরিত হয়ে গেছেন প্রতিটি নতুন বেশভূষায়, এবং নতুনভাবে জেগে ওঠে তার আত্মপুজো।
দিনের পর দিন তিনি পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন এ-ধ্রুবপদটি : ‘আমাকে মোহনীয় দেখাচ্ছিলো কৃষ্ণ পোশাকে… ধূসর পোশাকে আমাকে দেখাচ্ছিলো মোহনীয়… শুভ্র পোশাকে, আমি ছিলাম মোহনীয়’।
যেহেতু নারী একটি বস্তু, তাই বেশ বোঝা যায় যে তার সহজাত মূল্য প্রভাবিত হয় তার পোশাকের ধরন ও অলঙ্করণ দিয়ে। সে যে এতো গুরুত্ব দেয় তার রেশম বা নাইলনের মুজোর, দাস্তানার, হ্যাটের ওপর, এটা তার দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরর্থক নয়, কেননা অবস্থান ঠিক রাখার জন্যে এটা এক অত্যাবশ্যক বাধ্যবাধকতা। আমেরিকায় কর্মজীবী মেয়ের অর্থকোষের এক বড়ো অংশ ব্যয় হয় রূপচর্চায় ও পোশাকপরিচ্ছদে। ফ্রান্সে এ-ব্যয় কিছুটা কম; তবে কোনো নারীকে যতো বেশি দারুণ দেখায়, সে ততত বেশি সম্মান পায়; চৌকশ দেখানো হচ্ছে একটি অস্ত্র, একটি পতাকা, একটি প্রতিরক্ষা, একটি প্রশংসাপত্র।
পোশাকের চমৎকারিত্বও একটা দাসত্ব; এর উপকারিতা পাওয়ার জন্যে অর্থ ব্যয় করতে হয়; এবং ব্যয়টা এতো বেশি যে, মাঝেমাঝেই, সুগন্ধিদ্রব্য, রেশমি মুজো, অন্তর্বাস, বা এরকম কিছু চুরি করার সময় মনোহারি দোকানের গোয়েন্দার হাতে ধরা পড়ে কোনো-না-কোনো সচ্ছল নারী। সুবেশবাসের জন্যে বহু নারী লিপ্ত হয় বেশ্যাবৃত্তিতে, বা গ্রহণ করে আর্থিক ‘সহায়তা’: প্রসাধনের জন্যেই তাদের দরকার হয় অতিরিক্ত অর্থের। সুবেশের জন্যে দরকার পড়ে সময় ও যত্নেরও; তবে এটা এমন কাজ, যা কখনো কখনো সদর্থক আনন্দও দিয়ে থাকে; এ-এলাকায়, যেমন পারিবারিক বাজার করার সময়, সম্ভাবনা আছে গুপ্তধন আবিষ্কারের, আছে মূলাহ্রাসের খোজাখুঁজি, আছে ঠকানোর কৌশল, ফন্দি, এবং উদ্ভাবনপটুত্ব। যদি সে চতুর হয়, তাহলে কোনো নারী দ্রুত বাড়াতে পারে নিজের বস্ত্রসম্ভার। মূলাহাসের দিনগুলোতে চলে রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা। একটি নতুন বস্ত্র একটা উদযাপন। প্রসাধন বা। কেশবিন্যাস হয়ে উঠতে পারে একটি শিল্পকর্ম সৃষ্টির বিকল্প। আজ খেলাধুলো, শরীরচর্চা, স্নান, অঙ্গসংবাহন, ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের মাধ্যমে নারী আগের থেকে অনেক বেশি পায় নিজের শরীর গঠনের আনন্দ; সে-ই ঠিক করে কী হবে তার ওজন, দেহের মাপ, ও তার চামড়ার বর্ণ। আধুনিক নান্দনিক ধারণাগুলো তাদের সুযোগ দেয় সৌন্দর্যের সাথে কর্মের মিলন ঘটানোর : তার অধিকার আছে নিজের পেশি নিজের ইচ্ছেমতোগঠনের, সে মেদ জমতে দেয় না; শরীরচর্চার মধ্যে কর্তা হিশেবে সে লাভ করে দৃঢ়ভাবে আত্ম-ঘঘাষণা এবং কিছু পরিমাণে নিজেকে মুক্ত করে সে নিজের অনিশ্চিত মাংস থেকে; কিন্তু এ-মুক্তি সহজেই পিছু হটে হয়ে ওঠে পরনির্ভরশীল। হলিউডের তারকা জয় ঘোষণা করে প্রকৃতির ওপর, কিন্তু প্রযোজকের হাতে সে আবার হয়ে ওঠে একটি অক্রিয় বস্তু।
