বিশ্বকে এমন ঐন্দ্রজালিকভাবে আত্মসাৎকরণের সবেচেয়ে ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় উন্মাদদের চিকিত্সানিকেতনে। যে-নারী মূল্যবান বস্তু ও প্রতীকদের প্রতি তার ভালোবাসা দমন করতে পারে না, সে ভুলে যায়নিজের আসল আকৃতি-অবয়ব এবং চেষ্টা করে অসংযত পোশাকপরিচ্ছদে সাজতে। তাই ছোটো বালিকা মনে করে সাজগোজ হচ্ছে এমন এক ছদ্মবেশ, যা তাকে পরিণত করে পরী, রাণী, বা ফুলে; সে যখন ভারাক্রান্ত থাকে ফুলমাল্যে ও ফিতায়, তখন সে নিজেকে মনে করে সুন্দর, কেননা সে নিজেকে অভিন্ন মনে করে এ-চমকপ্রদ জাকালো বস্ত্রের সাথে। কোনো জিনিশের রঙে বিমুগ্ধ সরল তরুণী মেয়ে খেয়াল করে না যে তার গাত্রবর্ণের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে পাংশুটে আভা। এ-বিলাসবহুল রুচিহীনতা দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও, যারা তাদের নিজেদের আকৃতি সম্বন্ধে সচেতন থাকার বদলে বেশি মুগ্ধ থাকে বাহ্যজগত দিয়ে; এ-প্রাচীনপোশাকপরিচ্ছদ, এ-প্রাচীন রত্নে মোহিত হয়ে তারা চীন বা মধ্যযুগকে ডেকে এনে সুখ পায় এবং দ্রুত পক্ষপাতপূর্ণ দৃষ্টিতে এক পলকে আয়নায় দেখে নিজেদের। অনেক সময় অবাক হতে হয় বৃদ্ধা রমণীদের অদ্ভুত আঁকালোপ্রতীক অলঙ্কার পরা দেখে : উষ্ণীষ, ফিতা, রুচিহীন চকচকে বস্ত্র, এবং প্রাচীন কণ্ঠহার; এগুলো দুঃখজনকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করায় ওই নারীদের ভাঙাচোরা মুখমণ্ডলের প্রতি। কামপ্রলোভন জাগানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে এ-নারীদের অনেকে এমন এক স্থানে এসে পৌচেছে, যেখানে সাজগোজ করা এক নিরর্থক খেলা, যেমন নিরর্থক ছিলো তাদের কিশোরবেলায়। আভিজাত্যপূর্ণ কোনো নারী, অন্য দিকে, যদি দরকার হয় ইন্দ্রিয়গত বা নান্দনিক সুখ পেতে পারে তার প্রসাধনের মধ্যে, তবে সে একে অবশ্যই শোভন করে রাখবে তার রূপের সাথে; তার গাউনের রঙ সুন্দর করে তুলবে তার গাত্রবর্ণ, এর ছাঁটকাটের ধরন জোর দেবে বা সুন্দরতর করে তুলবে তার দেহসৌষ্ঠবকে। তার কাছে মূল্যবান হচ্ছে নিজেকে অলঙ্করণ, যে-বস্তুগুলো তাকে অলঙ্কৃত করে, সেগুলো নয়।
প্রসাধন শুধু অলঙ্করণ নয়; আমি আগেই বলেছি, এটা নারীটির সামাজিক পরিস্থিতিও নির্দেশ করে। শুধু বেশ্যাই, যে একান্তভাবে কাজ করে কামসামগ্রিরূপে, নিজেকে প্রদর্শন করে এ-রূপে এবং অন্য কিছু রূপে নয়; প্রাচীন কালের কুঙ্কুমরঞ্জিত চুল ও ফুল-বিছানো বস্ত্রের মতো, আজকের উঁচুখুড়ের জুতো, শরীরের সাথে সেঁটে থাকা সাটিন, ভারি প্রসাধন, ও উগ্র সুগন্ধিদ্রব্য বিজ্ঞাপিত করে তার পেশা। অন্য ধরনের কোনো নারী যদি ‘পথচারিণীর মতো পোশাক’ পরে তাহলে সমালোচনার সম্মুখিন হবে। যে-নারী দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে পুরুষের কামনা জাগায়, সে রুচিহীন; তবে যে এটা অস্বীকার করে সেও খুব প্রশংসনীয় নয়। লোকজন মনে করে সে পুরুষধর্মী হতে চায় এবং হয়তো সে নারীসমকামী, বা সে নিজেকে দর্শনীয় করে তুলতে চায় এবং নিঃসন্দেহে সে একটি বাতিকগ্রস্ত নারী। বস্তু হিশেবে তার ভূমিকা অস্বীকার করে সে অমান্য করছে সমাজকে; যে হয়তো একটি নৈরাজ্যবাদী। যদি সে নিতান্তই অগোচরে থাকতে চায়, তাহলে তাকে থাকতে হবে নারীসুলভ। প্রথাই ঠিক করে প্রদর্শনবাদ ও শালীনতাবোধের মধ্যে আপোষমীমাংসা; কোনো সময়ে দেখা যায় ‘শালীন নারী’কে ঢেকে রাখতে হয় তার বক্ষদেশ, অন্য কোনো সময়ে ঢেকে রাখতে হয় গোড়ালি; কখনোবা পাত্র আকর্ষণের জন্যে তরুণী বিস্তার করতে পারে তার রূপের জাল, আর তখন বিবাহিত নারী ছেড়ে দেয় তার সব সাজসজ্জা, যেমন ঘটে বহু। কৃষকসমাজে; কখনো তরুণীরা পরতে বাধ্য হয় রক্ষণশীল ছাঁটকাটের পাতলা, বর্ণিল ফ্রক, আর তখন বৃদ্ধ নারীরা পরে আঁটোসাঁটো গাউন, উজ্জ্বল রঙ, ও প্রলুব্ধকর ঢঙের পোশাক; যোলো বছরের মেয়ে যদি পরে কৃষ্ণবর্ণের পোশাক, তাহলে এটাকে মনে হয় অতিশয় জমকালো, কেননা এ-বয়সে এটা পরে না।
এ-নিয়মগুলো অবশ্যই অমান্য করা যাবে না; তবে সব ক্ষেত্রেই, এমনকি সবচেয়ে কঠোর নীতিপরায়ণ গোষ্ঠিতেও, গুরুত্ব দেয়া হয় নারীর যৌন বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর; উদাহরণস্বরূপ, যাজকের স্ত্রীও তার চুলে ঢেউ খেলায়, লাগায় হাল্কা প্রসাধন, এবং সতর্কভাবে মেনে চলে রীতিটি, সে তার দৈহিক আকর্ষণীয়তার জন্যে যে-যত্ন নেয়, তা দিয়ে সে নির্দেশ করে যে নারী হিশেবে সে তার ভূমিকা মেনে নিয়েছে। সামাজিক জীবনের সাথে কামের এ-সামঞ্জস্য বিধানের ব্যাপারটি সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয় সান্ধ্য গাউনে। এটা যে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান, যার প্রধান লক্ষণই বিলাসিতা ও দর্শনীয় অপচয়, তা বোঝানোর জন্যে এ-গাউনগুলোকে হতে হয় দামি ও পলকা; এগুলোকে হতে হয় যথাসম্ভব অসুবিধাজনকও; স্কার্টগুলো এতো লম্বা ও এতো বিস্তীর্ণ বা এতোটা লেংচাননা ধরনের হয় যে তাতে হাঁটাই অসম্ভব; নারীর রত্নাবলি, লাগানো পাড়, চুমকি, পালক, এবং নকল চুলের নিচে নারী রূপান্তরিত হয় মাংসের পুতুলে। এমনকি এ-মাংসও প্রদর্শিত বস্তু; ফোটা, বিকশিত পুষ্পের মতো নারীরা প্রদর্শন করে তাদের কাঁধ, পিঠ ও স্তন। কামোন্মত্ত উৎসবে ছাড়া এসবের প্রতি পুরুষদের বেশি আগ্রহ দেখানো বিধেয় নয়; তারা আকস্মিকভাবে একটু তাকাতে পারে বা নাচের সময় জড়িয়ে ধরতে পারে; তবে তাদের প্রত্যেকে অনুভব করতে পারে এসব সুকুমার সম্পদপূর্ণ বিশ্বের রাজা হওয়ার মোহনীয়তা।
