এবং, প্রথমত, যেখানে সে নিজেই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেখানে অবশ্যই তাকে ‘দারুণ দেখাতে হবে’; বাড়িতে কাজকর্ম করার সময় সে পরে থাকে আটপৌরে কাপড়চোপড়; যখন সে বাইরে যায়, যখন বাড়িতে কাউকে আপ্যায়ন করে, তখন সে ‘সাজগোজ’ করে। আনুষ্ঠানিক পোশাকপরিচ্ছদের আছে দ্বিগুণ ভূমিকা : এর কাজ নারীটির সামাজিক মর্যাদা নির্দেশ করা (তার জীবনযাপনের মান, তার ধনসম্পদ, যেসামাজিক গোষ্ঠিগুলোর সে অন্তর্ভুক্ত, সে-সব), তবে একই সঙ্গে এটা হচ্ছে নারীর আত্মরতির মূর্তরূপ; এটা একটি উর্দি ও একটি আভরণ; যে-নারী কোনো কিছু করা থেকে বঞ্চিত, সে অনুভব করে সে যা, তা সে প্রকাশ করছে এর সাহায্যে। তার রূপের যত্ন নেয়া, সাজসজ্জা করা হচ্ছে এক ধরনের কাজ, যা তাকে সাহায্য করে নিজের দেহের মালিকানা গ্রহণ করতে, যেমন সে গৃহস্থালির কাজের মধ্য দিয়ে মালিকানা গ্রহণ করে তার গৃহের; তখন তার মনে হয় যেননা সে নিজে বেছে নিয়েছে ও পূনর্সষ্টি করেছে তার অহংকে। সামাজিক রীতিনীতি আরো বাড়িয়ে দেয় নারীর অবয়ব-আকৃতির সাথে নিজেকে অভিন্ন করে তোলার প্রবণতা। কোনো পুরুষের পোশাকের কাজ হচ্ছে, তার দেহের মতোই, তার সীমাতিক্ৰমণতা নির্দেশ করা, দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়; তার পোশাকের চমৎকারিত্ব ও সুন্দর চেহারা দিয়ে সে নিজেকে একটি বস্তু বলে প্রতিষ্ঠিত করে না; তা ছাড়াও, সে তার অবয়ব-আকৃতিকে সাধারণত নিজের অহংয়ের অভিব্যক্তি বলে গণ্য করে না।
এর উল্টো দিকে, সমাজও চায় যে নারী নিজেকে করে তুলবে কামসামগ্রি। যেফ্যাশনের সে দাসী হয়ে উঠেছে, তাকে একজন স্বাধীন ব্যক্তি হিশেবে প্রকাশ করা তার উদ্দেশ্য নয়, বরং তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পুরুষের কামনার কাছে তাকে একটি শিকাররূপে দান করা; তাই সমাজ তার কর্মোদ্যোগকে এগিয়ে দেয় না, বরং চেষ্টা করে সেগুলোকে ব্যাহত করার। স্কার্ট ট্রাউজারের থেকে কম সুবিধাজনক, উঁচুখুড়ের জুতো বাধা দেয় হাঁটতে; সবচেয়ে কম ব্যবহারিক যে গাউন ও জুতো, সবেচেয়ে পলকা যে-হ্যাট ও মুজো, সেগুলো হচ্ছে সবচেয়ে অভিজাত ধরনের; পোশাক দেহকে ছদ্মবেশ দিতে পারে, বিকৃত করতে পারে, বা তার বাকগুলোকে সুস্পষ্ট করে তুলতে পারে; তা যাইহোক, এটা দেহকে করে তোলে প্রদর্শনের সামগ্রী। এজন্যেই ছোটো বালিকা, যে নিবিষ্টভাবে দেখতে ভালোবাসে নিজেকে, তার কাছে সাজসজ্জা এক মোহনীয় খেলা; হাল্কা রঙের মসলিন ও চকচকে চামড়ার জুততা সৃষ্টি করে যেপ্রতিবন্ধকতা, তার বিরুদ্ধে পরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তার শিশুসুলভ স্বাধীনতা; কাঁচা বয়সে বালিকা ছিন্নভিন্ন হইয়ে যায় নিজেকে প্রদর্শন করার ইচ্ছে ও অনিচ্ছের মধ্যে; কিন্তু একবার যখন সে মেনে নেয় কামসামগ্রি হিশেবে নিজের বৃত্তি, সে আনন্দ পেতে থাকে নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে।
সাজসজ্জার মাধ্যমে, আমি আগেই দেখিয়েছি, নারী নিজেকে করে তোলে। প্রকৃতির সহচর, এবং সে প্রকৃতির কাছে নিয়ে আসে ধূর্ততার আবশ্যকতা; পুরুষের কাছে সে হয়ে ওঠে পুষ্প ও রত্ন এবং নিজের কাছেও। পুরুষের ওপর জলের তরঙ্গিত প্রবাহ বিস্তার, পশমের উষ্ণ কোমলতা ছড়ানোর আগে, সে নিজে উপভোগ করে ওগুলো। তার টুকিটাকি গয়নাগাটি, তার গালিচাকম্বল, তার গদি, ও তার ফুলের তোড়ার সাথে তার সম্পর্ক অনেক কম অন্তরঙ্গ পালক, মুক্তো, বুটিদার রেশমি পোশাক, ও রেশমের সাথে তার সম্পর্কের থেকে, যা সে মিশিয়ে দেয় তার মাংসের সাথে; ওগুলোর বর্ণাঢ্যতা ও ওগুলোর কোমল বুনট ক্ষতিপূরণ করে কামের জগতের পরুষতার, যা তার ভাগ্য; যতো কম পরিতৃপ্ত হতে থাকে তার ইন্দ্রিয়ানুভূতি, সে ততোবেশি মূল্য দিতে থাকে ওগুলোকে। অনেক নারীসমকামী যে পুরুষের মতো পোশাক পরে, তা শুধু পুরুষদের অনুকরণ ও সমাজের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্যে নয়; তাদের কোনোই প্রয়োজন নেই মখমল ও সাটিনের সুখস্পর্শের, কেননা তারা নারীর শরীরেই লাভ করে একই ধরনের অক্রিয় গুণাবলি। বিষমকামী নারী, যে উৎসর্গিত। পুরুষের স্থল আলিঙ্গনের কাছে যদি সে এটা পছন্দও করে আর যদি সে এটা পছন্দ নাও করে–তার নিজের দেহ ছাড়া আর কোনো মাংসল শিকারকে আলিঙ্গন করার মতো তার কিছু নেই, তাই সে দেহকে একটি পুষ্পে রূপান্তরিত করার জন্যে সুগন্ধিত করে, এবং তার কণ্ঠহারের হীরের ঝলক মিলেমিশে যায় তার ত্বকের দ্যোতির সাথে; এগুলো অধিকার করার জন্যে বিশ্বের সমস্ত সম্পদের সাথে সে অভিন্ন করে তোলে নিজেকে। সে শুধু ওগুলোর কামনাতুর সুখ কামনা করে না, অনেক সময় চায়।ওগুলোর ভাবাবেগপূর্ণ ও আদর্শ মূল্যবোধগুলোও। এ-রত্নটি একটি স্মৃতিচিহ্ন, ওইটি একটি প্রতীক। অনেক নারী আছে, যারা নিজেদের করে তোলে সুগন্ধি ফুলের তোড়া, একটি পক্ষীশালা; আরো অনেকে আছে, যারা হচ্ছে যাদুঘর, আরো নারী আছে, যারা গূঢ়লিপিধর্মী। জর্জেৎ লেবলা তাঁর যৌবনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তার মেমওয়ারেতে লিখেছেন :
আমি সব সময় পরে থাকতাম ছবির মতো পোশাক। এক সপ্তাহ আমি থাকতাম ভান আইকের ছবির। মতে, রুবেলের কোনো রূপকের মতে, বা মেমলিংয়ের ভার্জিন-এর মতো। আজো আমি দেখতে পাই শীতকালের এক দিন আমি পার হচ্ছি ব্রাসেলসের একটি রাস্তা, পরে আছি আমেথি মখমল, যা কোনো চ্যাজিউবল থেকে ধার করে নেয়া রুপোর জরি দিয়ে বুনে পরিপাটি করা হয়েছে। আমার সোনালি চুল এঁটে আছে আমার হলদে পশমের শিরোবস্ত্রে, তবে সবচেয়ে অস্বাভাবিক জিনিশটি ছিলো আমার কপালের মাঝখানের হীরের বলয়টি। এসবের কী কারণ? আমি এটা উপভোগ করতাম পুরোপুরি এবং এতে আমার মনে হতো আমি অপ্রথাগতভাবে যাপন করছি জীবন। আমাকে যতোই উপহাস করা হতো আমার পোশাক পরিচ্ছদ হয়ে উঠতো ততোই কৌতুককর। আমি আমার অবয়বের সামান্যও বদলাতে লজ্জা পেতাম, কেননা তা করলে আমাকে নিয়ে পরিহাস করা হতো। এটা হতোএকটা শোচনীয় পরাজয়স্বীকার… বাড়িতে সব কিছু ছিল অন্য রকম। আমার আদর্শ কাঠামো ছিলো গোজোলি ও ফ্রা অ্যাক্সিলিকোর দেবদূতেরা, বার্নে-জোন্স ও ওয়ার্টসের মানবমূর্তি। আমি সব সময় পরতাম নীল ও সোনালি রঙের পোশাক; আমার ঝুলে পড়া বস্ত্র আমার চারদিকে স্তরেস্তরে গড়াগড়ি খেতো।
