আমরা দেখেছি নারীর নিকৃষ্টতার উদ্ভব ঘটেছে প্রথমত জীবন পুনরাবৃত্তির কাজে সীমিত থাকার ফলে, আর সেখানে পুরুষ তার দৃষ্টিতে, উদ্ভাবন করেছে শুধুই নিত্যনৈমিত্তিকভাবে অস্তিত্বশীল হয়ে থাকার থেকে আরো অপরিহার্য কারণ; নারীকে শুধু মাতৃত্ব লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে এ-অবস্থাকে চিরস্থায়ী করা। সে আজ সে-সব কাজে অংশগ্রহণের দাবি করছে, যে-সব কাজের মধ্য দিয়ে মানবজাতি ধারাবাহিকভাবে সীমাতিক্রমণতার মাধ্যমে, নতুন লক্ষ্য ও সাফল্য অর্জনের দিকে অগ্রগতির মাধ্যমে, চেষ্টা করে নিজের যাথার্থ প্রতিপাদনের; যদি জীবনের কোনো অর্থ থাকে, তাহলে সে জীবন প্রসব করার সম্মতি দিতে পারে না; সে এ-সময়ের আর্থনীতিক, রাজনীতিক, ও সামাজিক জীবনে ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা না করে মা হতে পারে না। কামানের ইন্ধন, ক্রীতদাস, বা শিকার উৎপাদন করা, ও অন্যদিকে স্বাধীন মানুষ সৃষ্টি করা এককথা নয়। একটি সুবিন্যস্ত সমাজে, যেখানে শিশুদের ভার প্রধানত নেবে সারা সমাজ, যেখানে যত্ন নেয়া হবে মায়ের এবং তাকে সাহায্য করা হবে, সেখানে নারীর জন্যে মাতৃত্ব ও জীবিকা সঙ্গতিহীন হবে না। এর বিপরীতে, যে নারী কাজ করে যে কৃষক, রসায়নবিদ, বা লেখক–সে তার গর্ভধারণকে গ্রহণ করেসহজভাবেই, কেননা সে তার নিজের দেহে মগ্ন নয়; যে-নারী যাপন করে সমৃদ্ধতম ব্যক্তিগত জীবন, সে-ই তার সন্তানদের দিতে পারে সবচেয়ে বেশি এবং তাদের কাছে দাবি করে সবচেয়ে কম; উদ্যোগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে অর্জন করে সত্যিকার মানবিক মূল্যবোধ, সে-ই সন্তানদের সবচেয়ে ভালোভাবে লালনপালনে সমর্থ।
মাতৃত্বের মধ্য দিয়েই নারী প্রকৃতপক্ষে সমান হয়ে ওঠে পুরুষের, এ-ধারণা পোষণ একটা প্রতারণা। মনোবিশ্লেষকেরা এটা দেখানোর জন্যে খুবই কষ্ট স্বীকার করেছেন যে সন্তান নারীকে সরবরাহ করে শিশ্নের সমতুল্য একটা বস্তু; পুরুষের এ গুণটি ঈর্ষণীয় হতে পারে, তবে এমন ছুতোতে কেউ বিশ্বাস করে না যে এরকম একটি বস্তুর নিতান্ত মালিক হওয়াই প্রতিপন্ন করতে পারে তার অস্তিত্বের যাথার্থ্য, বা এ-ই হতে পারে অস্তিত্বের পরম লক্ষ্য। মায়ের পবিত্র অধিকার সম্পর্কে কথাবার্তারও কোনোকমতি নেই; তবে মা হিশেবে নারীরা ভোট দেয়ার অধিকার পায় নি, এবং অবিবাহিত মা এখনো নিন্দিত; মা গৌরব লাভ করে শুধু বিয়ের মধ্যেই–অর্থাৎ, শুধু তখন, যখন সে অধীন হয় একটি স্বামীর। পিতা যতো দিন থাকবে পরিবারের আর্থনীতিক কর্তা, ততো দিন সন্তানেরা মায়ের থেকে বাবার ওপরই থাকবে বেশি নির্ভরশীল, যদিও মা-ই বেশি ব্যস্ত থাকে সন্তানদের নিয়ে। এটাই তার কারণ, যেমন দেখেছি আমরা, কেননা বাবার সাথে মায়ের সম্পর্ক দিয়ে প্রগাঢ়ভাবে প্রভাবিত হয় সন্তানদের সাথে মায়ের সম্পর্ক।
তারপর আবার, ‘ভালো’ গৃহিণী থাকে জীবনের কর্মকাণ্ডের বিরোধী পক্ষে, যেমন আমরা দেখেছি : শিশু হচ্ছে মোমে-মাজা মেঝের শত্রু। ঘরবাড়ি সুসজ্জিত রাখার জন্যে মায়ের ভালোবাসা রূপ নিতে পারে ক্রুদ্ধ রাগারাগিতে। এটা বিস্ময়কর নয় যেনারী লড়াই করে এসব বিরোধিতার মধ্যে, প্রায়সই যে তার দিন কাটায় স্নায়ুবিকারগ্রস্তও বদমেজাজি অবস্থায়; সে সব সময়ই হারে একভাবে বা অন্যভাবে, এবং তার প্রাপ্তিগুলো অনিশ্চিত, সেগুলো নিশ্চিতভাবে সাফল্য বলে পরিগণিত হয় না। সে কখনোই শুধু তার কাজের মধ্যে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে না; এটা তাকে ব্যস্ত। রাখে, কিন্তু তার অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপাদন করে না, কেননা তার যাথার্থ্য প্রতিপাদন তার হাতে নির্ভর করে না, করে স্বাধীন ব্যক্তিদের হাতে। গৃহে বন্দী থেকে, নারী নিজে তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না; ব্যক্তি হিশেবে দৃঢ়ভাবে আত্মঘঘাষণার জন্যে যে-সম্বল থাকাদরকার, তার তা নেই; এবং এর পরিণামে স্বীকৃতি দেয়া হয় না তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে। আরবদের ও ভারতীয়দের মধ্যে এবং বহু পল্লীজনগোষ্ঠির মধ্যে নারী হচ্ছে একটি গৃহপালিত মাদি পশু, সে যে-কাজটুকু করে তার জন্যে প্রশংসা পায় এবং সে অনুপস্থিত হয়ে গেলে কোনো আক্ষেপ ছাড়া তার স্থানে আরেকটি নেয়া হয়। আধুনিক সভ্যতায় তার স্বামীর চোখে সে কম-বেশি গণ্য হয় ব্যক্তি হিশেবে; তবে সে যদি তার অহংকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে, যুদ্ধ ও শান্তির নাতাশার মতো সে। যদি নিজেকে তার পরিবারের প্রতি সংরক্ত ও নির্মম আনুগত্যে গ্রাস না করে, তাহলে তাকে পর্যবসিত করা হয় এক শুদ্ধ সাধারণ্যে। সে হচ্ছে একান্তভাবে গৃহিণী, স্ত্রী, মাতা, অনন্য ও স্বাতন্ত্র্যহীন; এই চরম আত্ম-নীচতার মধ্যে নাতাশা বোধ করে পরমানন্দ। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য নারী, এর বিপরীতে, বোধ করে যে লোকজন তার স্বাতন্ত্র্য বুঝবে এ-স্ত্রী, এ-মাতা, এ-নারীরূপে। এ-সন্তুষ্টিই সে চাইবে সামাজিক জীবনে।
সামাজিক জীবন
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ৩
পরিবার কোনো বদ্ধ মানবগোষ্ঠি নয় : অন্যান্য সামাজিক এককের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এর বিচ্ছিন্নতা; গৃহ শুধু এমন কোনো ‘অভ্যন্তর’ নয়, যাতে রুদ্ধ হয়ে থাকে দম্পতিটি; এটি ওই দম্পতিটির জীবনযাত্রার মানের, তাদের আর্থিক মর্যাদার, তাদের রুচিরও প্রকাশ, এবং গৃহটি অন্যান্য এলাকজনের কাছে প্রদর্শন করার মতোও একটি জিনিশ। বিশেষ করে নারীর কাজ এ-সামাজিক জীবন পরিচালনা করা। পুরুষটি, উৎপাদনকারী ও নাগরিক হিশেবে, শ্রমবিভাজন ভিত্তি করে এক জৈব সংহতির অঙ্গীকারসূত্রে সমাজের সাথে যুক্ত; পরিবার, শ্রেণী, সামাজিক বৃত্ত, এবং সেটি যে-জাতির অন্তর্ভুক্ত, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত একটি একক হচ্ছে দম্পতিটি, এবং যান্ত্রিক সংহতির অঙ্গীকারসূত্রে এটি জড়িত অনুরূপ সামাজিক পরিস্থিতির সাথে; স্ত্রীটি শুদ্ধতমরূপে হয়ে উঠতে পারে এ সম্পর্কের মূর্তপ্রকাশ, কেননা স্বামীটির পেশাগত সংশ্লিষ্টতা অনেক সময়অসঙ্গতিপূর্ণ তার সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে, আর সেখানে স্ত্রীটির কোনো পেশাগত দায় নেই বলে, সে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারে তার সমান যোগ্যতাসম্পন্নদের সমাজের মধ্যে। উপরন্তু, তার আছে ‘একটু দেখা করতে গিয়ে’ এবং ‘বাড়িতে থেকে’ সে-সব সম্পর্ক রক্ষা করার অবকাশ, যেগুলোর কোনো বাস্তবিক উপকারিতা নেই এবং যেগুলো অবশ্য সে-সব সামাজিক শ্ৰেণীতেই গুরুত্বপূর্ণ, যার সদস্যরা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে তাদের উচ্চস্থান রক্ষা করার জন্যে ব্যগ্র–অর্থাৎ বলা যায়, যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠতর মনে করে অন্যদের থেকে। নারীটি সুখ পায় তার ‘অভ্যন্তর’ দেখিয়ে, এমনকি তার নিজের আকার-অবয়ব দেখিয়ে, যা তার স্বামী ও সন্তানদের চোখে পড়ে না, কেননা তারা এর সাথে পরিচিত। তার সামাজিক দায়িত্ব হচ্ছে ‘দারুণ দেখানো’, এবং এর সাথে যুক্ত হয় তার নিজেকে প্রদর্শন করার আনন্দ।
