আমাদের সংস্কৃতিতে যে মহাবিপদ শিশুর ওপর হুমকিস্বরূপ, তা হচ্ছে যে-মায়ের ওপর সমস্ত ভার দেয়া হয় সম্পূর্ণরূপে অসহায় শিশুটির, সে-মা প্রায় সর্বদাই হয়েথাকে একটি অতৃপ্ত নারী। কামে সে শীতল বা অপরিতৃপ্ত; সামাজিকভাবে সে নিজেকে মনে করে পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট; বিশ্বের বা ভবিষ্যতের ওপর স্বাধীনভাবে তার কোনো অধিকার নেই। এসব হতাশার সে ক্ষতিপূরণ করতে চায় তার সন্তানের মধ্য দিয়ে। যদি বুঝতে পারি যে নারীর বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পরিপূর্ণ সিদ্ধিলাভ কতোটা কঠিন, সংগোপনে সে লালন করে কতো অজস্র কামনা, বিদ্রোহী অনুভূতি, ন্যায়সঙ্গত দাবি, তখন এটা ভেবে ভয় পেতে হয় যে তারই ওপর ভার দেয়া হয়েছে অসহায় শিশুদের লালনপালনের। সেই যখন সে তার পুতুলগুলোকে একবার অত্যন্ত আদরযত্ন করতো, আবার করতো পীড়ন, তখন তার আচরণ ছিলো প্রতীকী; তবে তার সন্তানের জন্যে প্রতীক হয়ে ওঠে নির্মম বাস্তব। যে-মা তার সন্তানকে শাস্তি দেয়, সে শুধু একলা শিশুটিকে মারে না; এক অর্থে সে শিশুটিকে মারেই না : সে প্রতিশোধ নেয় একটি পুরুষের ওপর, পৃথিবীর ওপর, বা নিজের ওপর। এ-ধরনের মা প্রায়ই থাকে গভীর অনুশোচনাপূর্ণ এবং শিশুটি এতে ক্ষোভ বোধ নাও করতে পারে, তবে সে অনুভব করে মারপিটগুলো।
অধিকাংশ নারী যুগপৎ দাবি করে ও ঘৃণা করে তাদের নারীত্বের অবস্থাকে; একটা ক্ষুব্ধ অবস্থার মধ্য দিয়ে তারা এটা যাপন করে চলে। তাদের নিজেদের লিঙ্গের প্রতি ঘৃণাবশত তারা তাদের কন্যাদের দিতে পারে পুরুষের শিক্ষা, তবে তারা খুব কম সময়ই হয়ে থাকে যথেষ্ট পরিমাণে উদার। একটি নারী জন্ম দিয়েছে বলে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে মা তার কন্যাকে স্বাগত জানায় এ-দ্ব্যর্থবোধক অভিশাপ দিয়ে : ‘তুমি হবে একটা নারী’। সে যাকে মনে করে তার ডবল, তাকে একটি উৎকৃষ্টতর প্রাণীতে পরিণত করে সে ক্ষতিপূরণ করতে চায় তার নিজের নিকৃষ্টতার; এবং যেদুর্ভোগগুলো সে নিজে ভোগ করেছে, সেগুলোও চাপিয়ে দিতে চায় তার ওপর। অনেক সময় সে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে চায় অবিকল তার নিজের নিয়তি : ‘যা বেশ ভালো ছিলো আমার জন্যে, তা তোমার জন্যেও বেশ ভালো; আমি এভাবেই লালিত পালিত হয়েছিলাম, তুমি ভাগী হবে আমার ভাগ্যের’। এর বিপরীতে, অনেক সময় সে তার মতো না হওয়ার জন্যে কঠোর নির্দেশ দেয় সন্তানকে; সে চায় কিছুটা কাজে লাগুক তার অভিজ্ঞতা, এটা দ্বিতীয়বারের জন্যে সুযোগ পাওয়ার একটি উপায়। বেশ্যা তার মেয়েকে পাঠায় কোনো কনভেন্টে, মূখ নারীটি তাকে করে শিক্ষিত। যখন মেয়েটি বড়ো হয়, তখন দেখা দেয় আসল বিরোধ; আমরা যেমন দেখেছি, মেয়েটি তার মায়ের থেকে মুক্তি লাভ করে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তার স্বাধীনতা। এটাকে একটা ঘৃণ্য অকৃতজ্ঞতার লক্ষণ বলে মনে হয় তার মায়ের কাছে; সে। জেদের সঙ্গে চেষ্টা করে মেয়েটির মুক্তিলাভের ইচ্ছেকে বানচাল করে দিতে; তার ডবল একটি অপর হয়েউঠবে, এটা সে সহ্য করতে পারে না। নিজেকে পরম শ্রেষ্ঠ রূপে অনুভব করার আনন্দ–নারীর বেলা যা বোধ করে পুরুষেরা–কোনো নারী উপভোগ করতে পারে শুধু নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে তার মেয়েদের ক্ষেত্রে যদি তাকে ছেড়ে দিতে হয় তার বিশেষাধিকার, তার কর্তৃত্ব, তাহলে সে খুবই ভেঙে পড়ে। মা স্নেহশীলই হোক বা হোক বৈরী, তার সন্তানদের স্বাধীনতা চুরমার করে দেয় তার আশা। সে হয় দ্বিগুণ ঈর্ষান্বিত; বিশ্বের ওপর, যে তার মেয়েকে কেড়ে নিয়েছে তার কাছে থেকে, এবং তার মেয়ের ওপর, যে বিশ্বের একটি অংশ জয় করে সেটিকে অপহরণ করে নিচ্ছে তার কাছে থেকে।
সন্তানদের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক রূপ লাভ করে তার জীবনের সমগ্রতার মধ্যে; এটা নির্ভর করে তার স্বামীর সাথে তার সম্পর্কের ওপর, তার অতীত, তার পেশা, তার নিজের ওপর; সন্তানকে একটি সর্বজনীন সর্বরোগের মহৌষধরূপে গণ্য করা যেমন ভুল তেমনি ক্ষতিকর তেমনি একটা বাজে ব্যাপার। হেলেন ডয়েটশের গবেষণাগ্রন্থ, যেটি থেকে প্রায়ই উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, সেটির সিদ্ধান্ত এটাই, যাতে তিনি তার মনোচিকিৎসার অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করেছেন মাতৃত্বের প্রপঞ্চটি। নারী এর মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে আত্মচরিতার্থতা লাভ করে, একথায় আস্থা রেখে তিনি অতিশয় গুরুত্ব আরোপ করেছেন এ-ভূমিকাটির ওপর। তবে একটি শর্ত দিয়েছেন যে এটা স্বাধীনভাবে গৃহীত হতে হবে এবং আন্তরিকভাবে বাঞ্ছিত হতে হবে; তরুণী নারীটিকে থাকতে হবে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক, ও বস্তুগত পরিস্থিতিতে, যা তাকে সামর্থ্য দেবে এ-উদ্যোগ গ্রহণের; অন্যথায় এর পরিণতি হবে বিপর্যয়কর। বিশেষ করে, বিষাদগ্রস্ত উন্মাদরোগের বা মনোবৈকল্যের প্রতিষেধকরূপে সন্তান ধারণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে অপরাধ; এর অর্থ মা ও শিশু উভয়েরই সুখহীনতা। শুধু সে-নারী, যে ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাস্থ্যবতী, এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, সে-ই পারে একজন ‘ভালো’ মা হতে।
দ্বিতীয় ভ্রান্ত পূর্বধারণাটি, যেটি প্রত্যক্ষভাবে দ্যোতিত প্রথমটি দিয়ে, সেটি হচ্ছে যে সন্তান নিশ্চিতভাবেই সুখ পাবে তার মায়ের বুকে। ‘অস্বাভাবিক মা’ বলে কোনোজিনিশ নেই, একথা সত্য, কেননা মাতৃস্নেহের মধ্যে ‘স্বাভাবিক’ বলে কিছু নেই; তবে, ঠিক এ-কারণেই, খারাপ মা আছে অনেক। মনোবিশ্লেষণ যে-সব সত্য ঘোষণা করেছে, সেগুলোর মধ্যে প্রধান একটি হচ্ছে শিশুদের জন্যে সে-সব পিতামাতারা বিপদজনক, যারা নিজেরা ‘স্বাভাবিক’। প্রাপ্তবয়স্কদের গূঢ়ৈষা, আবিষ্টতা, ও মনোবৈকল্যের মূল নিহিত তাদের বাল্যকালের পারিবারিক জীবনের মধ্যে; যেপিতামাতারা নিজেরাই জড়িত বিরোধে, যাদের মধ্যে ঘটে কলহ ও বেদনাদায়ক দৃশ্যের অবতারণা, তারা শিশুর খুবই খারাপ সঙ্গী। বাল্যকালের পারিবারিক জীবনে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার ফলে তারা সন্তানদের সাথে সম্পর্ক পাতায় গূঢ়ৈষা ও হতাশাবোধের মধ্য দিয়ে; এবং অন্তহীনভাবে দীর্ঘতর হতে থাকে দুর্দশার এ-শেকল। বিশেষ করে, মায়ের ধর্ষ-মকামিতা কন্যার মধ্যে সৃষ্টি করে এমন অপরাধবোধ, যা ধর্ষ-মর্ষকামী আচরণরূপে প্রকাশ পায় তার সন্তানদের সঙ্গে আচরণে, এবং চলতে থাকে অন্তহীনরূপে।
