নিজে মা হয়ে নারী এক অর্থে গ্রহণ করে তার নিজের মায়ের স্থান : এটা বোঝায় তার সম্পূর্ণ মুক্তি। যদি সে আন্তরিকভাবেই কামনা করে, তাহলে তার গর্ভধারণের ফলে সে হবে আনন্দিত এবং সাহস পাবে একলা নিজে এ-ভার বহনের; কিন্তু সে যদি এখনো স্বেচ্ছায় মায়ের অধীনে থাকে, তাহলে সে নিজেকে আবার তুলে দেয় মায়ের হাতে; নবজাত সন্তানকে তার নিজের সন্তান বলে মনে না হয়ে ওটিকে তার মনে হবে একটি ভাই বা বোনের মতো। যদি সে একই সাথে মুক্তি পেতে চায়এবং নিজেকে মুক্ত করার সাহস না করে, তাহলে সে আশঙ্কা করতে থাকে যে শিশুটি তাকে বাঁচানোর বদলে আবার তার ওপর চাপিয়ে দেবে দাসত্বের জোয়াল, এবং এ-উদ্বেগের ফলে ঘটতে পারে গর্ভপাত।
তবে সর্বোপরি গর্ভধারণ এমন একটি নাটক, অভিনীত হয় নারীটির নিজের ভেতরেই। সে এটাকে একই সঙ্গে একটি সমৃদ্ধি ও একটি ক্ষত হিশেবে অনুভব করে;ভ্রূণটি তার দেহের একটি অংশ, এবং এটি একটি পরজীবী, যেটি বেঁচে থাকে তার দেহ খেয়ে; এটি তার অধিকারে এবং এটি দিয়ে সে অধিকৃত; এটি ভবিষ্যতের প্রতীক এবং এটি বহন করে সে নিজেকে বিশ্বের মতো বিশাল বলে অনুভব করে; কিন্তু এপ্রাচুর্যই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় তাকে, তার মনে হয় সে আর কিছু নয়। একটি নতুন জীবন প্রকাশ করতে যাচ্ছে নিজেকে এবং প্রতিপাদন করতে যাচ্ছে নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, এজন্যে সে গর্ববোধ করে; তবে সে অনুভব করে যেনো সে দুলছে ও তাড়িত হচ্ছে, সে হয়ে উঠেছে দুর্বোধ্য শক্তিরাশির খেলার পুতুল। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে গর্ভবতী নারী তার দেহের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে ঠিক সে-মুহূর্তে যখন সেটি লাভ করছে সীমাতিক্ৰমণতা; তার দেহের প্রতি তার দেহের জন্মে বিবমিষা ও তার দেহটি আর নিজের জন্যে অস্তিত্বশীল নয়, তাই দেহটি হয়ে ওঠে আগের থেকে অনেক বড়ো। প্রকৃতির প্রলোভনে পড়ে গর্ভবতী নারী হয়ে ওঠে উদ্ভিদ ও পশু, কোলয়েডের গুদামঘর, ডিমস্ফোটনযন্ত্র, ডিম; যে-শিশুরা গর্ববোধ করে তাদের তরুণ, সরলসোজা শরীর নিয়ে, তা ভয় পায় তাকে দেখে, এবং তরুণেরা তাকে দেখে ঘৃণায় ফিক করে হেসে ওঠে, কেননা সে এমন একটি মানুষ, একটি সচেতন ও স্বাধীন ব্যক্তি, যে হয়েউঠেছে জীবনের অক্রিয় হাতিয়ার।
প্রসবের জন্যে সময় লাগতে পারে চব্বিশ ঘণ্টা থেকে দুই বা তিন ঘণ্টা, তাই এসম্পর্কে কোনো সাধারণীকরণ করা যায় না। অনেক নারীর কাছে প্রসবের কাজটি হচ্ছে শহিদ লাভ। এর বিপরীতে, অনেক নারী এ-যন্ত্রণাকে বেশ সহজে বহনযোগ্য বলেই মনে করে। কেউ কেউ এতে বোধ করে ইন্দ্রিয়সুখ। কিছু কিছু নারী বলে যে। প্রসবের ব্যাপারটি তাদের দেয় এক ধরনের সৃষ্টিশীল শক্তির বোধ; তারা সত্যিই সম্পন্ন করেছে একটি স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত ও উৎপাদনশীল কাজ। অন্য চরম প্রান্তে অনেকে নিজেদের বোধ করে অক্রিয় দুর্ভোগগ্রস্ত ও উৎপীড়িত যন্ত্র।
নবজাত শিশুর সাথে মায়ের প্রথম সম্পর্কগুলো একই রকমে বৈচিত্র্যপূর্ণ। তাদের শরীরের ভেতরে এখন যে-শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছু নারী কষ্ট বোধ করে: তাদের মনে হয় চুরি হয়ে গেছে তাদের সম্পদ। সেসিল সভাজ তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন এ-অনুভূতি : ‘আমি সে-মৌচাক, যেখান থেকে চলে গেছে মৌমাছির ঝাঁক’; এবং আবার : ‘তার জন্ম হয়েছে, আমি হারিয়েছি আমার তরুণ প্রিয়তমকে, এখন জন্ম হয়েছে তার, আমি একলা’।
বারবার দাবি করা হয়েছে যে শিশুর মধ্যে শিশ্নের সমতুল্য একটি বস্তু পেয়ে নারী সুখী হয়ে ওঠে, তবে এটি কিছুতেই একটি যথাযথ বিবৃতি নয়। ঘটনা হচ্ছেএকটি পুরুষ ছেলেবেলায় তার শিশ্নের মধ্যে যেমন একটি বিস্ময়কর খেলনা পেতো, বয়স্ক পুরুষ তা আর পায় না; প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কাছে এর মূল্য হচ্ছে এটি তাকে তার কাম্য বস্তুরাশি অধিকার করতে দেয়। একইভাবে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষকে ঈর্ষা করে পুরুষের অধিকৃত শিকারগুলোর জন্যে, যে-হাতিয়ারটি দিয়ে পুরুষ এ-কাজ করে, নারী সে-হাতিয়ারটিকে ঈর্ষা করে না। শিশু ধারণ করে সমগ্র প্রকৃতির রূপ। কলেৎ অদ্রির নায়িকা আমাদের বলেছে যে সে তার শিশুর মধ্যে পেয়েছে ‘আমার আঙুলগুলোর ছোঁয়ার জন্যে একটি ত্বক, সব বেড়ালছানা, সব পুষ্প যে-প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, এ ত্বক তা পূরণ করেছে’। নারীটি যখন ছিলো ছোটো মেয়ে, তখন সে যা চেয়েছিলো তার মায়ের মাংসে, এবং পরে সর্বত্র সব কিছুতে, শিশুর মাংসের আছে সে-কোমলতা, সে-উষ্ণ স্থিতিস্থাপকতা। শিশুটি হচ্ছে উদ্ভিদ ও পশু, তার চোখে আছে বৃষ্টি ও নদী, সমুদ্র ও আকাশের নীল; তার আঙুলগুলো প্রবাল, তার চুল হচ্ছে রেশমের বিকাশ; এটি একটি জীবন্ত পুতুল, পাখি, বেড়ালছানা; ‘আমার ফুল, আমার মুক্তো, আমার ছানা, আমার মেষ’। মা গুঞ্জন করতে থাকে অনেকটা প্রেমিকের শব্দপুঞ্জ, প্রেমিকের মতো লোলুপভাবে ব্যবহার করতে থাকে অধিকারমূলক কারকের; সে প্রয়োগ করে অধিকার করার একই অঙ্গভঙ্গি : স্পর্শাদর, চুম্বন; সে তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে, সে শিশুকে গরম রাখে নিজের কোলে ও বিছানায়। অনেক সময় এ-সম্পর্কস্পষ্টভাবেই কামের ধরনের। স্টেকেল থেকে ইতিমধ্যে উদ্ধৃত স্বীকারোক্তিতে মা বলছে সে লজ্জা পায়, কেননা তার লালনপালনের মধ্যে আছে একটা কামের আভাস এবং তার শিশুর স্পর্শ তাকে সুখে শিউরে দেয়; সে যখন সে দু-বছরের ছিলো, তখন শিশুটি, প্রায় অপ্রতিরোধ্যভাবে, তাকে আদর করতো প্রেমিকের মতো এবং শিশুর শিশ্ন নাড়াচাড়ার প্রলোভন কাটানোর জন্যে আড়াই করতে হয়েছে তাকে।
