নগরে নারীরা পরস্পরকে সাহায্য করে উদ্ধার করে। তবে একটা হাতুড়ে গর্ভপাতকারী পাওয়া সব সময় সহজ নয়, আরো কঠিন দরকারি টাকাপয়সা যোগাড়করা। তাই গর্ভিণী নারী সাহায্য চায় কোনো বান্ধবীর, বা নিজেই করে নিজের অস্ত্রোপচার। এ-অপেশাদার অস্ত্রোপচারকেরা প্রায়ই হয়ে থাকে অদক্ষ; তারা প্রায়ই ফুটো করে ফেলে এষণী বা শেলাইয়ের সূচ দিয়ে। এক ডাক্তার এক অজ্ঞ রাঁধুনি সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন যে প্রক্ষেপণি দিয়ে সে তার জরায়ুতে ভিনেগার ঢুকোতে গিয়েঢুকিয়ে ফেলে মূত্রাশয়ে, যা ছিলো প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক। স্থলভাবে শুরু ও অতি অযত্নে সম্পন্ন করার ফলে গর্ভপাত সব সময়ই হয়ে থাকে স্বাভাবিক প্রসবের থেকে অনেক বেশি বেদনাদায়ক, এতে এমন স্নায়ুবিকার ঘটতে পারে যে দেখা দিতে পারে মূৰ্ছারোগ, ঘটতে পারে মারাত্মক আভ্যন্তর ব্যাধি, এবং মারাত্মক রক্তক্ষরণ।
কলেৎ তাঁর গ্রিবিশ-এ নৃত্যশালার এক নর্তকীর অসহ্য যন্ত্রণার বিবরণ দিয়েছেন, যা সে ভোগ করে অজ্ঞ মায়ের হাতে; তার মা বলে যে এর ঠিক প্রতিষেধক হচ্ছে সাবানের ঘনীভূত দ্রবণ পান করা এবং সিকি ঘণ্টা ধরে দৌড়ানো। শিশুটির কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে এমন চিকিৎসায় অনেক সময় মারা যায় মা-টি। আমি এক সাঁটলিপিকারের কথা শুনেছি, যে খাদ্য ও জল ছাড়া নিজের রক্তে স্নাত হয়ে চার ঘণ্টা আটকে থাকে তার ঘরে, কেননা কারো সহিওয়ার সাহস তার হয় নি।
পুরুষেরা গর্ভপাতকে লঘুভাবে নিয়ে থাকে তারা মনে করে যে ক্ষতিকর প্রকৃতি নারীর ওপর আরোপ করেছে অজস্র বিপদ, এটা তার একটি, কিন্তু তারা এর মূল্যবোধ পুরোপুরি বুঝতে সমর্থ হয় না। যে-নারী গর্ভপাতের আশ্রয় নেয়, সে প্রত্যাখ্যান করে নারীর মূল্যবোধ, তার মূল্যবোধ, এবং একই সময়ে সে আমূলভাবে বিরোধিতা করে পুরুষের প্রতিষ্ঠিত নীতিবোধের। বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে তার নৈতিকতার সমগ্র মহাবিশ্ব। বাল্যকাল থেকে নারীকে বারবার বলা হয় যে তাকে তৈরি করা হয়েছে সন্তান বিয়োনোর জন্যে, এবং তার কাছে সব সময় গাওয়া হয় মাতৃত্বের মহিমার গান। তার পরিস্থিতির অসুবিধাগুলো ঋতুস্রাব, অসুখ, এবং আরো বহু কিছু–এবং গৃহস্থালির নীরস একঘেয়ে খাটুনির বিরক্তিকর ক্লান্তির যাথার্থ প্রতিপন্ন হয় তার এই চমকপ্রদ বিশেষাধিকার দিয়ে যে সে বিশ্বে নিয়ে আসে সন্তানদের। আর এখানে পুরুষ নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে নারী হিশেবে নারীকে ছেড়ে দিতে বলে তার বিজয়কে, যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় পুরুষের ভবিষ্যৎ, তার পেশার মঙ্গলের জন্যে!
শিশু আর অমূল্য সম্পদ নয়, জন্মদান আর পবিত্র কর্ম নয়; কোষের এ-দ্রুতবিস্তার হয়ে ওঠে আপতিক ও পীড়াদায়ক; এটা নারীর আরেকটি খুঁত। এর তুলনায়মাসিক বিরক্তিটাকে মনে হয় আশীর্বাদ : এখন উদ্বেগে চোখ রাখা হয় লাল ধারার ফিরে। আসার ওপর, যে-ধারাকে বিভীষিকাকর মনে হয়েছে তরুণী মেয়ের এবং যার জন্যে মাতৃত্বের প্রতিশ্রুত আনন্দ দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে। এমনকি যখন সে গর্ভপাতে সম্মতিও দেয়, এমনকি তা কামনাও করে, তখনও নারী এটাকে মনে করে তার নারীত্ব বিসর্জন : সে তার লিঙ্গে দেখতে বাধ্য হয় একটা অভিশাপ, এক ধরনের বৈকল্য, এবং একটা বিপদ। এ-অস্বীকৃতিকে একটা চরমে নিয়ে গিয়ে গর্ভপাতের আঘাতজনিত স্নায়ুরোগের ফলে কিছু নারী হয়ে ওঠে সমকামী।
নারীর ‘অনৈতিকতা’য়, নারীবিদ্বেষীদের যা একটি প্রিয় বিষয়, বিস্ময়ের কিছু নেই; কী করে তারা একটা আন্তর অবিশ্বাস পোষণ না করে পারে সে-সব অহঙ্কত নীতির প্রতি, পুরুষেরা যেগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা করে আর সংগোপনে অমান্য করে? পুরুষ যখন উচ্চপ্রশংসা করে নারীর বা যখন উচ্চপ্রশংসা করে পুরুষের, তখন পুরুষ যা বলে, তা অবিশ্বাস করতে শেখে নারীরা : যে-একটি জিনিশ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত, তা হচ্ছে এই খাজ কাটা ও ক্ষরণশীল জরায়ু, টকটকে লাল জীবনের এসব ছিন্নাংশ, এ-শিশু যে সেখানে নেই। নারী তার প্রথম গর্ভপাতের সময় শুরু করে ‘জানতে’। অনেক নারীর কাছে বিশ্ব আর কখনোই আগের মতো থাকবে না। এবং তবু, সুলভ জন্মনিরোধের অভাবে, গর্ভপাতই ফ্রান্সে আজ সে-নারীদের একমাত্র আশ্রয়, যারা পৃথিবীতে আনতে চায় না সে-শিশুদের, যারা দণ্ডিত হবে দুর্দশা ও মৃত্যুতে।
জন্মনিরোধ ও বৈধ গর্ভপাত নারীকে স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে দেয় তার গর্ভধারণের দায়িত্ব। বর্তমান অবস্থায়, নারীর গর্ভধারণ আংশিক স্বেচ্ছাকৃত, আংশিক আকস্মিক। কৃত্রিমভাবে গর্ভধারণ যেহেতু এখনো সাধারণ ব্যাপার হয়ে ওঠে নি, তাই এমন হতে পারে যে কোনো নারী গর্ভধারণ করতে চায়, কিন্তু তার ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে। কেননা পুরুষের সাথে তার সংস্পর্শ নেই, বা তার স্বামী বন্ধ্যা, বা সে নিজেই গর্ভধারণে অক্ষম। আবার, অন্য দিকে, কোনো কোনো নারী তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বাধ্য হয়সন্তানপ্রজননে। নারীর প্রকৃত মনোভাব অনুসারে গর্ভধারণ ও মাতৃত্বের ব্যাপারগুলোর অভিজ্ঞতা হতে পারে খুবই বিচিত্র, তা হতে পারে বিদ্রোহের, বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেয়ার, সন্তুষ্টির বা উদ্দীপনার। অবশ্যই বুঝতে হবে যে তরুণী মায়ের প্রকাশ্যে অঙ্গীকার করা সিদ্ধান্ত ও ভাবাবেগ সব সময় তার গভীরতর বাসনার সাথে খাপ খায় না। তরুণী অবিবাহিত মা তার ওপর হঠাৎ চাপানো বস্তুগত ভারে বিহ্বল হয়ে উঠতে পারে এবং হতে পারে বাহ্যিকভাবে হতাশাগ্রস্ত, এবং তবুও সে তার সন্তানের মধ্যে দেখতে পারে তার গোপন স্বপ্নের বাস্তবায়ন। অন্য দিকে, কোনো বিবাহিত তরুণী, যে আনন্দে ও গর্বে স্বাগত জানায় তার গর্ভধারণকে, সে হয়তো। অন্তর্গতভাবে একে ভয়পেতে পারে ও অপছন্দ করতে পারে, কারণ তার ওপর ভর করে থাকতে পারে আবিষ্টতা, অলীক কল্পনা, ও বাল্যস্মৃতি, যা সে খোলাখুলি স্বীকার করতে চায় না। এ-ব্যাপারে নারীরা যে গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়, এটা তার অন্যতম কারণ। তাদের নীরবতা আংশিকভাবে উদ্ভূত হয় একটি অভিজ্ঞতা, যা একান্তভাবেই তাদের অধিকারে, সেটিকে রহস্যাবৃত করে রাখার আনন্দ থেকে; তবে এ-সময়ে তারা অনুভব করে যে-সব আভ্যন্তর বিরোধ ও সংঘর্ষ, সেগুলো দিয়ে তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে।
