ঘটনা হচ্ছে যে এখানে প্রতিবন্ধকটি হচ্ছে একটি প্রাচীন, একগুঁয়ে প্রথা, যাতে নৈতিকতার কোনোই বালাই নেই। আমাদের অবশ্যই বোঝাপড়া করতে হবে সেই পুরুষধর্মী ধর্ষকামিতার সঙ্গে, যে সম্পর্কে আমি ইতিমধ্যেই কথা বলেছি। একটা চমকপ্রদ উদাহরণ হচ্ছে ডঃ রয়ের একটি বই, ১৯৪৩-এ যা উৎসর্গ করা হয় পেতাঁকে। পিতৃসুলভ উৎকন্ঠায় লেখক দৃঢ়ভাবে কথা বলেছেন গর্ভপাতের বিপদ। সম্পর্কে, তবে পেট কেটে প্রসবকেই তার মনে হয়েছে সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বলে। গর্ভপাতকে দুষ্টাচরণ বলে গণ্য না করে তিনি অপরাধ বলে গণ্য করার পক্ষপাতী; এমনকি তিনি একে একটি চিকিৎসাব্যবস্থা হিশেবেও নিষিদ্ধ দেখতে চান। অর্থাৎ গর্ভধারণ যখন মায়ের জীবন বা স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি। তিনি ঘোষণা করেন যে একটি জীবন ও আরেকটি জীবনের মধ্যে বাছবিছার করা অনৈতিক, এবং এ-যুক্তির বলে তিনি মাকে বলি দেয়ার পরামর্শ দেন। দৃঢ়ভাবে তিনি ঘোষণা করেন যে মা ভ্রূণের মালিক নয়, এটি এক স্বাধীন সত্তা। ‘সচ্চিন্তাশীল’ এ-চিকিৎসকগণ যখন মাতৃত্বের গুণকীর্তনে মুখর হন, তখন অবশ্য তারা বলেন যে ভ্রূণ মায়ের দেহের একটি অংশ অর্থাৎ এটি মায়ের মূল্যে বেড়ে ওঠা কোনো পরজীবী নয়। নারীবাদবিরোধিতা এখনো কতো জীবন্ত, তা দেখা যায় যা-কিছু নারীর মুক্তির অনুকূল, সে-সব প্রত্যাখ্যানের জন্যে কিছু লোকের ব্যগ্রতায়।
উপরন্তু, আইন–যা বহু নারীকে দণ্ডিত করে মৃত্যু, বন্ধ্যাত্ব, চিররুগ্নতায়–জন্মের সংখ্যাবৃদ্ধির নিশ্চয়তাবিধানে একেবারে অক্ষম। বৈধগর্ভপাতের শক্ত ও মিত্ররা যেএকটি ব্যাপারে একমত, তা হচ্ছে পীড়নমূলক আইনের চরম ব্যর্থতা। প্রামান্য বিশেষজ্ঞদের মতে ফ্রান্সে সম্প্রতি বছর গড়ে প্রায় দশ লক্ষ গর্ভপাত ঘটে। এর মধ্যে দু-তৃতীয়াংশই ঘটে বিবাহিত নারীদের। এসব গোপন ও প্রায়ই ভুল অস্ত্রোপচারের ফলে ঘটে অজ্ঞাত, কিন্তু বিপুল সংখ্যক মৃত্যু ও অনিষ্ট।
গর্ভপাতকে অনেক সময় উল্লেখ করা হয় একটি ‘শ্রেণী-অপরাধ’ বলে, এবং এতে বেশ সত্যতা আছে। জন্মনিরোধের জ্ঞান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত, এবং শ্রমিক ও চাষীদের বাড়িতে যেহেতু চলন্ত জলের ব্যবস্থা নেই, তাই স্নানাগার থাকায় তাদের থেকে মধ্যবিত্তদের পক্ষে এটা প্রয়োগ করা সহজ; অন্যদের থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীরা বেশি সতর্ক; এবং সচ্ছল লোকদের মধ্যে শিশু বিশেষ ভারি দায়িত্ব নয়। প্রায়সই গর্ভপাতের অতিশয় জরুরি কারণগুলোর মধ্যে আছে দারিদ্র্য, ঘিঞ্জি বসতি, এবং কাজ করার জন্যে নারীর বাইরে যাওয়ার আবশ্যকতা। প্রায়ই দেখা যায় যে দুটি সন্তানের পর দম্পতিরা সন্তানের জন্ম সীমিত করতে চায়; তাই দেখা যায় যে গর্ভপাত করা বিরক্তিপূর্ণ নারীটিই আবার একটি চমৎকার মাতা, যে বাহুতে দোলাচ্ছে দুটি স্বর্ণকেশী দেবদূত : একই ও অভিন্ন ব্যক্তিটি।
তবে, অন্য দিকে, কোনো একলা তরুণীর বিপজ্জনক পরিস্থিতির থেকে খুব কম পরিস্থিতিই অধিক শোচনীয়; টাকার অভাবে তার ‘ভুল’ সংশোধনের জন্যে সে বাধ্য হয় এক অপরাধমূলক কাজ করতে, তার গোষ্ঠি যাকে মনে করে ক্ষমার অযোগ্য। ঠিক এটাই প্রতি বছর ঘটে ফ্রান্সের ৩০০,০০০ কর্মচারী, সেক্রেটারি, শ্রমিক, ও চাষী নারীর ক্ষেত্রে; অবৈধ মাতৃত্ব আজো এতো বিভীষিকাময় দোষ যে অনেকে অবিবাহিত মা হওয়ার থেকে আত্মহত্যা বা শিশুহত্যাকেই বরণ করে নেয় : এর অর্থ হচ্ছে। কোনো দণ্ডই তাদের নিবৃত্ত করতে পারতো না অজাত শিশুটির থেকে ‘নিষ্কৃতি পাওয়া’ থেকে। সাধারণভাবে প্রচলিত গল্পটি প্রলোভনের গল্প, যাতে একটি কম-বেশি অজ্ঞ মেয়ে প্রলুব্ধ হয় তার দায়িত্বহীন প্রেমিকের দ্বারা, একদিন যা ঘটার ঘটে অবধারিতভাবে, সে এটা গোপন করে রাখে পরিবারের, বন্ধুদের, ও নিয়োগদাতার থেকে, এবং গর্ভপাতই হয় ভীতিকর, তবে মুক্তির একমাত্র কল্পনাসাধ্য উপায়।
প্রায়ই প্রলুব্ধকারী কামুকটি নিজেই নারীটিকে বোঝায় যে তাকে শিশুটির থেকে মুক্তি পেতেই হবে। অথবা এও হয় যে মেয়েটি যখন দেখে সে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, তার আগেই পুরুষটি তাকে ছেড়ে চলে গেছে, বা মেয়েটি সহৃদয়ভাবে চায় তার কলঙ্ক পুরুষটির কাছে গোপন করতে, বা সে বুঝতে পারে যে পুরুষটি তাকে সাহায্য করতে অসমর্থ। অনেক সময় মেয়েটি অনুশোচনার সাথেই শিশুটিকে ধারণ করতে অস্বীকার করে; কোনো-না-কোনো কারণে এমন হতে পারে যে এটিকে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত সে সঙ্গেসঙ্গেই গ্রহণ করে না, বা এ-কারণে যে সে একটা ‘ভালো ঠিকানা’ জানে না, বা এমন হতে পারে যে তার হাতে টাকা নেই এবং অকেজো ঔষধপত্র ব্যবহার করে সে সময় নষ্ট করে ফেলেছে–যখন সে পৌছে গেছে তার গর্ভের তৃতীয়, চতুর্থ, বা পঞ্চম মাসে, তখন এটা থেকে সে মুক্তির উদ্যোগ নেয়; আর তখন গর্ভপাত হয়ে ওঠে আগের মাসগুলোর থেকে অনেক বেশি বিপজ্জনক, যন্ত্রণাকর ও আপোশমূলক। নারীটি এটা জানে; সে উদ্বেগ ও হতাশার মধ্যে উদ্যোগ নেয় নিজেকে মুক্ত করার। গ্রামাঞ্চলে এষণীর প্রয়োগ আদৌ জানা যায় না; যে-পল্লীনারীর একটা স্থলন ঘটেছে, সে হয়তো গোলাবাড়ির মই থেকে পড়ে মরে, বা সে লাফিয়ে পড়ে নিচের তলায়, এবং অনেক সময় নিরর্থক আহত হয়; এবং এও ঘটতে পারে যে ঝোপের নিচে বা একটা খাদে পাওয়া যায় গলা টিপে মারা একটা ছোটো লাশ।
