খুব কম বিষয়ই আছে, যার সম্পর্কে বুর্জোয়া সমাজ দেখিয়ে থাকে এর থেকে বেশি ভণ্ডামো; গর্ভপাতকে গণ্য করা হয় একটি ঘৃণ্য অপরাধ বলে, যার উল্লেখ করাকেও অশোভন মনে করা হয়। একজন লেখক যখন বর্ণনা করেন কোন নারীর সন্তান প্রসবের সময়ের আনন্দ ও যন্ত্রণা, সেটা চমৎকার; কিন্তু তিনি যদি বর্ণনা করেন একটি গর্ভপাতের ঘটনার, তখন তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় ময়লায় গড়াগড়ি দেয়ার এবং মানবজাতিকে এক শোচনীয় আলোতে উপস্থাপনের জন্যে। এখন, ফ্রান্সে প্রতি বছর যতোগুলো শিশু জন্মে গর্ভপাতও ঘটে ততোগুলোই। এটা এমন একটি ব্যাপক প্রপঞ্চ যে প্রকৃতপক্ষে এটাকে গণ্য করতে হবে নারীর পরিস্থিতির মধ্যে নিহিত ঝুঁকিগুলোর একটি বলে। তবুও আইন নাছোড়বান্দার মতো অটল একে একটি লঘু অপরাধ বলে গণ্য করার জন্যে এবং তাই এ-সুকুমার অস্ত্রোপচারটি গোপনে সম্পন্নকরার দরকার হয়। গর্ভপাত বৈধকরণের বিরুদ্ধে যে-সব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়, সেগুলোর থেকে বাজেকথা আর কিছুই হতে পারে না। মত পোষণ করা হয় যে এটি একটি ভয়ঙ্কর অস্ত্রোপচার। তবে মাগনাস হার্সফিল্ডের সাথে সৎ চিকিৎসকেরা স্বীকার করেন যে ‘হাসপাতালে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে, যথোচিত সাবধানতার সাথে, গর্ভপাত ঘটালে, তাতে দণ্ডবিধি যে-ভয়ানক বিপদের দাবি করে, সে-ভয় থাকে না’। এর বিপরীতে, বর্তমান অবস্থায় এটা আসলে যেভাবে করা হয়, তা নারীর জন্যে এক ভীষণ ঝুঁকি। গর্ভপাতকারীদের দক্ষতার অভাবে এবং যে-খারাপ অবস্থার মধ্যে তারা অস্ত্রোপচার করে, তার ফলে ঘটে বহু দুর্ঘটনা, যার কোনো কোনোটি মারাত্মক।
আরোপিত মাতৃত্ব পৃথিবীতে নিয়ে আসে হতভাগ্য শিশুদের, মা-বাবারা যাদের ভরণপোষণ করতে পারবে না এবং যারা হবে সর্বসাধারণের তত্ত্বাবধানের শিকার বা ‘শহিদ শিশু’। এটা উল্লেখ করা দরকার যে আমাদের সমাজ, যা খুবই উৎসাহী ভ্রূণের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে, জন্মের পর শিশুর প্রতি আর কোনো আগ্রহ পোষণ করে; ‘জনসহায়তা’ নামের অকীর্তিকর সংস্থাটিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ না নিয়ে সমাজ মামলা দায়ের করে গর্ভপাতকারীদের বিরুদ্ধে; শিশুদের যারা শিশুপীড়নকারীদের। কাছে রক্ষণের জন্যে দায়ী, মুক্তি দেয় তাদের সমাজ চোখ বুজে থাকে শিশু-আশ্রম ও ব্যক্তিপরিচালিত শিশু-অবাসের পশুতুল্য নির্দয়দের ভয়ঙ্কর নির্মমতার প্রতি। এবং যদি স্বীকার না করা হয় যে ভ্রূণটির মালিক সে-নারী যে ভ্রূণটি ধারণ করে, তাহলে অন্য দিকে স্বীকার করতে হয় যে শিশু এমন বস্তু, যার মালিক তারা পিতামাতা এবং তারা নির্ভরশীল তাদের কৃপার ওপর। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সম্প্রতি আমরা দেখেছি যে একজন শল্যচিকিৎসক আত্মহত্যা করেছেন, কেননা গর্ভপাত করানোর অপরাধে তিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, আর একটি পিতা, যে তার ছেলেকে পিটিয়ে পিটি ফেলেছিলো, তাকে দণ্ডিত করা হয়েছে তিন মাস কারাদণ্ডে, তবে তার কারাদণ্ড স্থগিত রাখা হয়েছে। সম্প্রতি এক পিতা যত্ন না নিয়ে গলাফোলা রোগে মরতে দিয়েছে তারা পুত্রকে; এক মা তার কন্যার জন্যে ডাক্তার ডাকতে রাজি হয় নি, কেননা সে বিধাতার ইচ্ছের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে : সমাধিক্ষেত্রে শিশুরা তার দিকে পাথর ছুঁড়েছে; তবে যখন কয়েকজন সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন একদল গণ্যমান্য ব্যক্তি প্রতিবাদ করেন যে পিতামাতারা তাদের শিশুদের মালিক, তাই বাইরে থেকে কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করা যায় না। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে এ-মনোভাবের ফলে এক মিলিয়ন ফরাশি শিশু শারীরিক ও নৈতিক বিপদের সম্মুখীন। উত্তর আফ্রিকার আরব রমণীরা গর্ভপাতের আশ্রয় নিতে পারে না, এবং তাদের জন্ম দেয়া দশজন শিশুর মধ্যে সাত-আটজনই মারা যায়; তবু কেউই বিচলিত বোধ করে, কেননা গর্ভধারণের এ-শোচনীয় ও উদ্ভট আধিক্য নষ্ট করে তাদের মাতৃসুলভ অনুভূতি। যদি এসব হয় নৈতিকতার অনুকূল, তাহলে এ-নৈতিকতা সম্পর্কে কী ভাবতে হবে। এর সঙ্গে আরো বলা দরকার যে-সব লোক জণের জীবনের প্রতি পোষণ করে অতিশয় বিবেকপরায়ণ শ্রদ্ধা, তারাই আবার যুদ্ধে বয়স্কদের মৃত্যুদণ্ডিত করার জন্যে হয় অতিশয় ব্যগ্র।
গর্ভপাতের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত বাস্তবিক বিচারবিবেচনাগুলো গুরুত্বহীন; নৈতিক বিচারবিবেচনার দিক দিয়ে ওগুলো পরিশেষে হয়ে ওঠে ক্যাথলিকদের পুরোনোযুক্তির সমার্থক : অজাত শিশুটির আছে একটি আত্মা, যেটি স্বর্গে প্রবেশাধিকার পাবে না যদি অদীক্ষা ছাড়াই ব্যাহত হয় তার জীবন। এটা বিস্ময়কর যে গির্জা অনেক সময় বয়স্কদের হত্যা করা অনুমোদন করে, যেমন করে যুদ্ধে অথবা আইনানুগ মৃত্যুদণ্ডের বেলা; কিন্তু এটা ক্ৰণাবস্থার মানুষের জন্যে সংরক্ষণ করে এক আপোসহীন মানবহিতৈষণা। এখানে অভাব ঘটে অক্ষুদীক্ষার মাধ্যমে পরিত্রাণের; তবে ধর্মযুদ্ধের সময় বিধর্মীরা ছিলো সমভাবে অক্ষুদীক্ষাহীন, তবু পূর্ণোদ্যমে উৎসাহিত করা হয়েছিলো তাদের নিধনকাণ্ডকে। সন্দেহ নেই আজ যে-অপরাধীকে গিলোটিনে বধ করা হয় এবং যে-সৈনিক মৃত্যুবরণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে, ধর্মবিচারসভা কর্তৃক দণ্ডিতদের সবাই ধর্মে তাদের থেকে বেশি দীক্ষাপ্রাপ্ত ছিলো না। এসব ক্ষেত্রে গির্জা ব্যাপারটি ছেড়ে দেয় বিধাতার করুণার ওপর; এটা স্বীকার করে যে মানুষ বিধাতার হাতের নিতান্তই একটি হাতিয়ার এবং কোনো আত্মার পাপমোচনের ব্যাপারটি মীমাংসিত হয় ওই আত্মাটি ও বিধাতার মধ্যেই। সুতরাং ভ্রূণের আত্মাটিকে স্বর্গে গ্রহণ করতে কেননা নিষিদ্ধ করা হবে বিধাতাকে? যদি কোনো গির্জীয় অধিবেশন এটা অনুমোদন করে, তাহলে বিধাতা আর অস্বীকার করবে না যেমন সে অস্বীকার করে নি গৌরবান্বিত পর্বগুলোতে যখন বিধর্মীদের বলি দেয়া হতো ধার্মিকভাবে।
