বিয়ের ট্র্যাজেডি এটা নয় যে তা ব্যর্থ হয় নারীর প্রতি প্রতিশ্রুত সুখ নিশ্চিত করতে–সুখের ব্যাপারে নিশ্চয়তাবিধান বলে কোনো জিনিশ নেই–ট্র্যাজেডি হচ্ছে এটা বিকলাঙ্গ করে নারীকে; তাকে ধ্বংস করে পুনরাবৃত্তি ও নিত্যনৈমিত্তিকতায়। আমরা দেখেছি নারীর জীবনের প্রথম বিশটি বছর অসাধারণভাবে সমৃদ্ধ; সে আবিষ্কার করে বিশ্ব ও তার নিয়তি। বিশ বা তার কাছাকাছি বয়সে সে হয় একটি ঘরের গৃহিণী, স্থায়ীভাবে বাঁধা থাকে একটি পুরুষের সাথে, কোলে একটি শিশু, তখন তার জীবন চিরকালের জন্যে কার্যত শেষ; প্রকৃত কর্ম, প্রকৃত কাজ তার পুরুষটির বিশেষাধিকার : নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে তার আছে তুচ্ছ কাজ, যেগুলো অনেক সময় খুবই ক্লান্তিকর, কিন্তু কখনই সন্তোষজনক নয়। তার আত্মবিসর্জন ও নিষ্ঠা প্রশংসা লাভ করেছে, কিন্তু ‘দুটি মানুষের সেবাযত্ন করে জীবন কাটিয়ে দেয়া’কে প্রায়ই তার মনে হয় অর্থহীন। নিজের কথা ভুলে থাকা খুবই চমৎকার, তবে মানুষের জানা দরকার কার জন্যে, কীসের জন্যে। এবং এর মাঝে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে যে তার নিষ্ঠাকেই অনেক সময় মনে হয় বিরক্তিকর, নাছোড়বান্দা ধরনের; এটা স্বামীর কাছে হয়ে ওঠে একটা স্বৈরাচার, যার থেকে সে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে; তবে স্বামীটিই এটা স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দেয় স্ত্রীর পরম, অনন্য যাথার্থ প্রতিপাদনরূপে। নারীটিকে বিয়ে করে সে নারীটিকে বাধ্য করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে তার কাছে দান করতে; তবে স্বামীটি এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বাধ্যবাধকতা মেনে নেয় না।
ভারসাম্যপূর্ণ দম্পতি কোনো ইউটোপীয় কল্পনা নয়; এমন দম্পতির অস্তিত্ব আছে, অনেক সময় আছে বিয়ের কাঠামোর মধ্যেই, তবে অধিকাংশ সময়ই বিয়ের বাইরে। কিছু সহচর মিলিত হয় তীব্র যৌন প্রেমে, যা তাদের স্বাধীন রাখে তাদের বন্ধুত্বে ও তাদের কর্মে; অন্যরা পরস্পরের সাথে জড়িত থাকে এমন বন্ধুত্বে, যা তাদের কামস্বাধীনতা খর্ব করে না; আরো কম সুলত হচ্ছে তারা, যারা একই সাথে প্রেমিকপ্রেমিকা ও বন্ধু, তবে তারা পরস্পরের মধ্যেই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ সন্ধান করে না। একটি পুরুষ ও একটি নারীর সম্পর্কের মধ্যে সম্ভব বহু সূক্ষ্ম দ্যোতনা; সহচারিতা, আনন্দ, বিশ্বাস, ভালো লাগা, সহযোগিতা, প্রেমে তারা পরস্পরের কাছে হতে পারে মানুষের পক্ষে লভ্য আনন্দোল্লাস, সমৃদ্ধি, ও শক্তির। অপর্যাপ্ত উৎস। বিয়ের ব্যর্থতার জন্যে ব্যক্তিমানুষকে দোষ দেয়া ঠিক নয় : কোঁৎ ও তলস্তয়ের মতো প্রবক্তাদের দাবির বিপরীতে দোষী সংস্থাটি নিজেই, যা শুরু থেকেই বিকৃত। একটি পুরুষ ও একটি নারী, যারা হয়তো পরস্পরকে নিজেদের পছন্দে বেছে নেয় নি, তারা পরস্পরকে জীবনতর সব রকমে তৃপ্ত করার জন্যে দায়িত্ববদ্ধ, এধারণা পোষণ ও ঘোষণা একটা পৈশাচিকতা, যা অবধারিতভাবে জন্ম দেয় ভণ্ডামো, মিথ্যাচার, শক্রতা ও সুখহীনতার।
প্রথাগত বিয়ের রূপটি এখন বদলাচ্ছে, তবু এখনো এতে আছে পীড়ন, যা স্বামীস্ত্রী দুজনে ভোগ করে ভিন্নভাবে। তারা যে-বিমূর্ত, তাত্ত্বিক অধিকার উপভোগ করে, তাতে আজ তারা প্রায় সমান; তারা পরস্পরকে পছন্দ করার ব্যাপারে আগের থেকে অনেক বেশি স্বাধীন, তারা বিচ্ছিন্নও হতে পারে অনেক সহজে, বিশেষ করে আমেরিকায়, যেখানে বিবাহবিচ্ছেদ বিরল ব্যাপার নয়; একদা স্বামীস্ত্রীর বয়স ও সংস্কৃতির মধ্যে যে-পার্থক্য ছিলো, এখন তা সাধারণত কম দেখা যায়; এখন স্ত্রী যেস্বাধীনতা দাবি করে, স্বামী তা অনেক বেশি স্বেচ্ছায় মেনে নেয়; তারা ঘরকন্নার। কাজগুলো ভাগ করে নিতে পারে সমভাবে; তারা আমোদপ্রমোদও উপভোগ করে একত্রে : শিবিরাবকাশ, সাইকেল চালানো, সাঁতারকাটা, গাড়িচালনা ইত্যাদি। স্ত্রী আর স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষায় দিন কাটায় না; সে খেলাধুলো করতে যেতে পারে, কোনো ক্লাবের, সংঘের, সঙ্গীতদলের বা এমন কিছুর সদস্য হতে পারে, সে প্রায়ই ঘরের বাইরে ব্যস্ত থাকে, এমনকি তার থাকতে পারে কোনো কাজ, যাতে তার হাতে কিছু পয়সা আসে।
মা
মা
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ২
মাতৃত্বে নারী পূর্ণ করে তার শারীরবৃত্তিক নিয়তি; এটা তার প্রাকৃতিক ‘পেশা,’ কেননা তার সমগ্র জৈবসংগঠন প্রজাতির স্থায়িভুবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে আমরা। দেখেছি মানবসমাজ কখনোই পুরোপুরি প্রকৃতির কাছে সমর্পিত হয় নি। এবং প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশেষ করে প্রজননের কাজটি আর শুধুই জৈব আকস্মিকতার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটা মানুষের স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের অধীনে এসে গেছে। কিছু কিছু দেশ সরকারিভাবে গ্রহণ করেছে জন্মনিরোধের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি; ক্যাথলিক প্রভাবের অধীন জাতিগুলোর মধ্যে এর চর্চা হয় গুপ্তভাবে। পুরুষটি হয়তো করে বাহ্যিক বীর্যপাত বা নারীটি সঙ্গমের পর তার দেহ থেকে বের করে দেয় শুক্রাণু। এ-ধরনের নিরোধ প্রেমিকপ্রেমিকা বা বিবাহিত দম্পতির মধ্যে মাঝেমাঝেই সৃষ্টি করে বিরোধ ও ক্ষোভ; পুরুষটি অপছন্দ করে সুখের মুহূর্তে সতর্ক থাকতে; নারীটি ঘৃণা করে ডুশ। করার অপ্রীতিকর কাজটি; পুরুষটি ক্ষুব্ধ থাকে নারীটির অতিশয় উর্বর দেহের ওপর; নারীটি ভয় পায় জীবনের বীজানুগুলোকে, যেগুলোকে পুরুষটি ঝুঁকির সাথে ঢুকিয়ে। দিয়েছে তার ভেতরে। আর এসব সাবধানতা সত্ত্বেও যখন নারীটি দেখে যে সে ‘ধরা পড়ে গেছে’, তখন উভয়েই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। যে-সব দেশে গর্ভনিরোধের পদ্ধতি আদিম, সেখানে এটা ইটে প্রায়ই। তখন আশ্রয় নিতে হয় বিশেষভাবে বেপরোয়া এক প্রতিকারের : অর্থাৎ, গর্ভপাতের। যে-সব দেশে গর্ভনিরোধ অনুমোদিত, সেখানেও গর্ভপাত কম অবৈধ নয়, তবে সেখানে এটা খুবই কম দরকার পড়ে। কিন্তু ফ্রান্সে বহু নারী বাধ্য হয় এ-অস্ত্রোপচারের আশ্রয় নিতে এবং এটা তাদের অধিকাংশের প্রেণয়ের জীবনে হানা দিতে থাকে প্রেতের মতো।
