বিয়ে পুরুষকে প্ররোচিত করে এক খামখেয়ালপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদে : আধিপত্য করার প্রলোভন সত্যিকারভাবেই সর্বজনীন, যতো প্রলোভন আছে, এটা সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য; শিশুকে তার মায়ের কাছে সমর্পণ করা, স্ত্রীকে তার স্বামীর কাছে সমর্পণ করা হচ্ছে বিশ্বে স্বৈরাচারকে উৎসাহিত করা। তার কথা মেনে নেয়া ও তার প্রতি অনুরাগ পোষণ করা, তাকে পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শকরূপে গ্রহণ করা, প্রায়ই এটা স্বামীর কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় না; সে আদেশ জারি করে, সে অভিনয় করে প্রভু ও মনিবের। বাল্যকালে ও পরবর্তী জীবনে তার মনে যতো ক্ষোভ জমেছে, যে-সব ক্ষোভ প্রতিদিন জমেছে অন্য পুরুষদের সাথে কাজ করে, যে-সব পুরুষের অস্তিত্ব বোঝায় সে আছে শাসানোর নিচে ও আহত অবস্থায়–এ-সবেরই মোক্ষণ ঘটে যখন সে বাড়িতে ফিরে স্ত্রীর ওপর নির্বিচারে চালায় তার কর্তৃত্ব। সে বিধিবদ্ধ করে হিংস্রতা, ক্ষমতা, একরোখা সিদ্ধান্ত; সে কঠোর স্বরে নির্দেশ দিতে থাকে; সে চিল্কার করে এবং টেবিলের ওপর বাড়ি মারতে থাকে : এ-প্রহসন তার স্ত্রীর জন্যে এক প্রাত্যহিক বাস্তবতা। নিজের অধিকারে সে এতো অটল যে স্ত্রীর দিক থেকে স্বাধীনতার সামান্য ইঙ্গিতকেও তার কাছে মনে হয় বিদ্রোহ; তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রীকে নিশ্বাস ফেলতে দিতেও সে রাজি নয়।
তবে স্ত্রীটি সত্যিই বিদ্রোহ করে। যদিও প্রথম দিকে সে মুগ্ধ হয়েছিলো পুরুষের। মর্যাদায়, অচিরেই তার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার ভাবটা কেটে যায়। শিশু একদিন বুঝতে পারে যে তার পিতা একটি নিশ্চয়তাহীন মানুষ; স্ত্রীটি অবিলম্বে আবিষ্কার করে যে তার সামনে নেই কোনো প্রভু ও মনিবের মহান মূর্তি, আছে একটি পুরুষ; সে আর স্বামীটির ক্রীড়নক হয়ে থাকার কোনো কারণই দেখতে পায় না; স্বামীটি তার কাছে হয়ে ওঠে অপ্রীতিকর ও অন্যায় দায়িত্বের প্রতিমূর্তি। মর্ষকামী সুখে কখনো কখনো সে বশ্যতা মেনে নেয় : সে নেয় একটি বলি-হয়ে-যাওয়া মানুষের ভূমিকা এবং বিনা প্রতিবাদে তার এটা মেনে নেয়া হচ্ছে এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ ভৎসনা; তবে কখনোকখনে এও ঘটতে পারে যে সে তার প্রভুর সাথে লিপ্ত হয় খোলাখুলি যুদ্ধে এবং স্বামীটির ওপর পাল্টা স্বৈরাচার চালাতে চেষ্টা করে।
একটা স্বামী ‘ধরা’ হচ্ছে শিল্পকলা; তাকে ‘ধরে রাখা’ হচ্ছে একটি চাকুরি–এবং এমন একটি, যার জন্যে দরকার অসামান্য দক্ষতা। এক বিজ্ঞ ভগ্নী তার বিরক্তিকর নববিবাহিত তরুণী বোনকে বলেছিলো : ‘সাবধানে থেকো, মার্সেলের সাথে এসব দৃশ্য ঘটালে তুমি তোমার চাকুরিটা খোয়াবে’। যা বিপন্ন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : বস্তুগত ও নৈতিক নিরাপত্তা, নিজের একটা বাড়ি, স্ত্রীর গৌরব, প্রেম ও সুখের কমবেশি সন্তোষজনক একটা বিকল্প। স্ত্রী শিগগিরই বুঝতে পারে তার যৌনাবেদন হচ্ছে তার অস্ত্রগুলোর মধ্যে দুর্বলতম; ঘনিষ্ঠতার ফলে এটা তিরোহিত হয়; আর আহা, চারদিকে আছে আরো কতো আকর্ষণীয় নারী। তবু, সে চেষ্টা করতে থাকে নিজেকে কামপ্রলুব্ধকর করার চেষ্টা করতে থাকে খুশি করার; সে প্রায়ই ছিড়েফেড়ে যেতে থাকে গর্বে, যা তাকে নিয়ে যেতে থাকে কামশীতলতার দিকে ও এ-আশার মধ্যে যে তার কামনার ব্যগ্রতা হয়তো মুগ্ধ করবে তার স্বামীকে এবং স্বামীর কাছে তাকে প্রিয় করে তুলবে। সে নির্ভর করে অভ্যাসের জোর, একটি সুখকর গৃহের মোহিনীশক্তি, বিশেষ খাদ্যের প্রতি স্বামীর আকর্ষণম সন্তানদের প্রতি স্বামীর স্নেহের ওপরও; স্ত্রীটি তার আপ্যায়নের রীতি ওপোশাকপরিচ্ছদের সাহায্যেও চেষ্টা করে স্বামীটির সুনাম বাড়ানোর, এবং সে তার উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে স্বামীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে; তার পক্ষে যতোটা সম্ভব সে স্বামীর সামাজিক সাফল্য ও কাজের ক্ষেত্রে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলার চেষ্টা করে।
তবে, সর্বোপরি, সমগ্র প্রথাগত ঐতিহ্যধারা স্ত্রীদের ওপর নির্দেশ দেয় একটি পুরুষকে ‘বশে রাখা’র শিল্পকলা শিখতে; এজন্যে স্ত্রীদের আবিষ্কার ও প্রশ্রয় দিতে হবে স্বামীর দুর্বলতাগুলো, এবং চতুরতার সাথে পরিমাণমতোপ্রয়োগ করতে হবে তোষামোদ ও অবজ্ঞা, বাধ্যতা ও প্রতিরোধ, পাহারা ও ক্ষমাশীলতা। মনোভাবের শেষের মিশ্রণটি বিশেষভাবেই এক সুকুমার ব্যাপার। স্বামীকে খুব বেশি বা খুব কম স্বাধীনতা দিলে চলবে না। স্ত্রীটি যদি হয়অত্যন্ত বাধ্যগত, তাহলে সে দেখতে পাবে তার স্বামী পালাচ্ছে তাকে ছেড়ে; স্বামীটি যে-টাকা ও আবেগ নিয়োগ করে অন্য নারীদের ক্ষেত্রে, তা তার থেকেই নেয়া; এবং সে মুখোমুখি হয় একটা ঝুঁকির যে কোনো উপপত্নী তার স্বামীর ওপর এতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে পারে যে সে তার স্বামীকে বাধ্য করতে পারে স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে অথবা অন্তত তার স্বামীর জীবনে অধিকার করতে পারে প্রথম স্থানটি। তবে সে যদি স্বামীকে কোনো রকমরোমাঞ্চকর কর্মকাণ্ডই করতে না দেয়, যদি সে স্বামীকে জ্বালাতন করে সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে, আবেগের বিস্ফোরক দৃশ্য ঘটিয়ে, তার দাবি দিয়ে, তাহলে সে তার স্বামীকে ক্ষেপিয়ে তুলবে নিজের বিরুদ্ধে। কীভাবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘ছাড় দিতে হয়’, এটা জানতে হয়; যদি কারো স্বামী একটু ‘ঠকায়’, তাহলে তার চোখ বুজে থাকা ভালো; তবে অন্য সময় দু-চোখ খুলে রাখতে হবে বড়ো করে। বিবাহিত নারী বিশেষ করে পাহারা দেয় তরুণী নারীদের, যারা, সে মনে করে, আনন্দের সাথেই তার কাছে থেকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে তার ‘চাকুরিটি’। একটি ভীতিকর। প্রতিপক্ষের কবল থেকে স্বামীকে ছিনিয়ে আনার জন্যে সে স্বামীকে নিয়ে দূরে কোথাও যায়অবকাশ কাটাতে, তাকে আমোদপ্রমোদ দেয়ার চেষ্টা করে; যদি দরকার হয়মাদাম দ্য পপাদরের আদর্শে–তাহলে স্বামীর পেছনে লাগিয়ে দেয় একটি নতুন ও কম ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। কিছুতেই কাজ না হলে সে আশ্রয় নেয়কান্নাকাটির, স্নায়ুদৌর্বল্যের, উদ্যোগ নেয় আত্মহত্যার, এবং এমন অনেক কিছুর; তবে খুব বেশি ভাবাবেগপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা ও পাল্টা অভিযোগ স্বামীকে দূর করে দেবে বাড়ি। থেকে। যে-মুহূর্তে স্ত্রীটির খুবই হওয়া দরকার কামপ্রলুব্ধকর, তখনই সে ঝুঁকি নেয় নিজেকে স্বামীর কাছে অসহ্য করে তোলার; যদি সে খেলায় জিততে চায়, তাহলে তাকে সুকৌশলে মিশেল ঘটাতে হবে কপট অঞ ও সাহসী স্মিতহাসির, ধাপ্পা ও ছেনালিপনার।
