স্ত্রী প্রায়ই প্রেমের ভান করে নৈতিকতা, কপটতা, গর্ব, বা ভীরুতার মাধ্যমে। স্বামীর আধিপত্য এড়ানোর জন্যে তরুণী স্ত্রীর কম-বেশি প্রচণ্ড চেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার প্রকৃত বিরূপতা। মধুচন্দ্রিমা ও পরবর্তীগোলমাল, যা প্রায়ই দেখা দেয়, সে-সময়টা কেটে যাওয়ার পর স্ত্রীটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করে তার স্বাধীনতা, যা সহজ কাজ নয়। স্বামীটি প্রায়ই হয় বয়স্কতর, তার আছে পুরুষের মর্যাদা, আইনগতভাবে সে ‘পরিবারের প্রধান’, তার আছে একটা নৈতিক ও সামাজিক শ্রেষ্ঠতর অবস্থান অধিকাংশ সময়ই, অন্তত, স্বামীটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিগতভাবেও শ্রেষ্ঠতর। তার আছে উৎকৃষ্টতর সংস্কৃতির সুবিধা, বা যা-ই হোক, তার আছে পেশাগত প্রশিক্ষণ; কৈশোর থেকে সে আগ্রহ পোষণ করেছে বৈশ্বিক ব্যাপারের প্রতি–এগুলো তারই। ব্যাপার–সে কিছুটা আইন জানে, সে রাজনীতির সাথে তাল রেখে চলে, সে একটি দলের সদস্য, একটি সংঘের সদস্য, একটি সামাজিক সংস্থার সদস্য; কর্মী ও নাগরিক হিশেবে তার চিন্তাভাবনা কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। কঠোর বাস্তবের পরীক্ষার সাথে সে পরিচিত : অর্থাৎ, গড়পড়তা পুরুষের আছে যুক্তিপ্রয়োগের কৌশল, আছে সত্যঘটনা সম্পর্কে ধারণা ও অভিজ্ঞতাবোধ, কিছুটা সমালোচনার শক্তি।
বিপুল সংখ্যক নারীর মধ্যে এরই অভাব। এমনকি যদি তারা পড়াশোনা করেও থাকে, বক্তৃতা শুনেও থাকে, কোনো কিছুতে পারদর্শিতা অর্জনের জন্যে অল্পসল্প ভাবনাচিন্তা করেও থাকে, তবুও তাদের যাবতীয় তথ্য সংস্কৃতি হয়ে ওঠে না; এমন নয় যে তারা মানসিক ক্ৰটিবশত ঠিকমতো যুক্তিপ্রয়োগে অসমর্থ, বরং এজন্যে যে অভিজ্ঞতা তাদের ঠিকমতো যুক্তিপ্রয়োগের প্রতি নিষ্ঠাপরায়ণ করে নি; তাদের কাছে চিন্তাভাবনা হাতিয়ার নয়, একটা মজা; যদিও তারা বুদ্ধিমান, স্পর্শকাতর, আন্তরিক, তবুও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলের অভাবে তারা তাদের অভিমত প্রকাশ করতে পারে না এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারে না। এজন্যে তাদের স্বামীরা, তুলনামূলকভাবে মাঝারি ধীশক্তির হলেও, সহজেই তাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং এমনকি যখন তারা ভুলও করে, তখনও নিজেদের ঠিক বলে প্রমাণ করে। পুরুষের হাতে যুক্তিও অনেক সময় এক ধরনের হিংস্রতা, এক ধরনের প্রতারক স্বৈরাচার : স্বামীটি স্ত্রীটির থেকে বয়স্ক ও অধিকতর শিক্ষিত হলে যখন সে স্ত্রীর সাথে কোনো ব্যাপারে একমত হয়, তখন তার এ-শ্ৰেষ্ঠতাবশত সে স্ত্রীর মতামতের কোনো মূল্যই দেয় না; অক্লান্তভাবে সে স্ত্রীর কাছে প্রমাণ করে যে সে-ই ঠিক। স্ত্রীর কথা বলতে গেলে, সে জেদি হয়ে ওঠে এবং স্বামীর যুক্তির মধ্যে যে কোনো সার আছে, তা স্বীকার করতে চায় না; স্বামীটি পুরোপুরি অটল থাকে তার ধারণায়। তাই তাদের মধ্যে গভীর ভুল বোঝাবুঝি দেখা দেয়। নিজের অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়াগুলোর সত্যতা প্রতিপাদনের মতো যথেষ্ট বুদ্ধি স্ত্রীটির নেই, যদিও সেগুলোর মূল তার ভেতরে গভীরভাবে প্রোথিত, স্বামীটি সেগুলো বোঝার কোনো চেষ্টাই করে না; স্ত্রীটি বুঝতে পারে না তার স্বামী যে-পণ্ডিতি যুক্তি দিয়ে তাকে বিহ্বল করে, তার পেছনের অপরিহার্য ব্যাপারটি কী। তখন নীরবতা, বা অশ্রু, বা হিংস্ৰতা ছাড়া স্ত্রীটির আর কোনো অবলম্বন থাকে না, এবং শেষে স্ত্রীটি কিছু একটা ছুঁড়ে মারে স্বামীটির দিকে।
কখনো কখনো স্ত্রীটি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। তবে প্রায়ই সে ইবসেনের এ ডলস হাউজ নাটকের নোরার মতো ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় এটা ছেড়ে দেয়, এবং স্বামীকে সুযোগ দেয় তার সম্পর্কে ভাবার অন্তত কিছু সময়ের জন্যে। সে তার স্বামীকে বলে : ‘তুমি তোমার রুচি অনুসারেই সব কিছু করেছে এবং আমার রুচিও ছিলো তোমার মতোই, বা আমি তার ভান করেছিলাম। আমি জানি না কোনটি–হয়তো দু-রকমেই–কখনো এটা, কখনো অন্যটা’। ভীরুতাবশত, বা বিব্ৰত বোধ করার জন্যে, বা আলস্যবশত স্ত্রীটি সমস্ত সাধারণ ও বিমূর্ত বিষয়ে তাদের যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার স্বামীর ওপরই ছেড়ে দেয়। একজন বুদ্ধিমান, সুসংস্কৃত, স্বাধীন নারী, স্বামীকে যে তার থেকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে পনেরো বছর ধরে স্বামীর ওপর নির্ভর করে এসেছে, এমন এক নারী আমাকে বলেছে, স্বামীর মৃত্যুর পর সে পীড়া বোধ করেছে যখন সে দেখতে পায় যে তার নিজের বিশ্বাস ও আচরণ সম্বন্ধে তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে; সে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ভাবার চেষ্টা করে এব্যাপারে তার স্বামী কী ভাবতো।
এ-বিজ্ঞ পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় স্বাভাবিকভাবেই স্বামীটি সুখ বোধ করে। নোরার স্বামী তাকে নিশ্চয়তা দেয় : ‘শুধু আমার ওপর নির্ভর করো—আমাকে উপদেশ দিতে ও পথ দেখাতে দাও তোমাকে! আমি আঁটি পুরুষ হতাম না, যদি না তোমার এ-নারীসুলভ অসহায়তা আমার চোখে দ্বিগুণ আকর্ষণীয় করে তুলতে তোমাকে… তোমাকে রক্ষা করার জন্যে আমার আছে বিস্তৃত ডানা’। তার সমানদের সাথে সংগ্রামের একটি কঠিন দিনের পর, উর্ধ্বতনদের কাছে আত্মসমর্পণের পর, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সে নিজেকে অনুভব করতে চায় একজন পরম পুরুষ ও একজন অকাট্য সত্যদাতারূপে। সে বর্ণনা করে সারাদিনের ঘটনা, বিরোধীদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে সে কতটা নির্ভুল ছিলো, তা ব্যাখ্যা করে, সে সুখ পায় তার স্ত্রীর মধ্যে নিজের একটি ডবল পেয়ে, যে তার আত্মবিশ্বাসের প্রতি জানায় সমর্থন ও তাকে উৎসাহ দেয়; সে পত্রিকাগুলো ও রাজনীতিক সংবাদের ওপর তার মতামত দেয়, ইচ্ছে করেই সে ওগুলো জোরে জোরে পড়ে শোনায় স্ত্রীকে, যাতে এমনকি সংস্কৃতির সাথেও তার স্ত্রীর সংস্পর্শ স্বাধীন না থাকে। সে নারীর অসামর্থ্যকে অতিরঞ্জিত করতে থাকে তার কর্তৃত্ব বাড়ানোর জন্যে; স্ত্রীটি কম-বেশি বশমানাভাবে মেনে নেয় এঅধীন ভূমিকা। যে-সব নারীকে কিছু সময়ের জন্যে নিজেদের ভেবেচিন্তে কাজ করতে হয়, তারা স্বামীদের অনুপস্থিতিতে আন্তরিকভাবেই আক্ষেপ বোধ করতে পারে, কিন্তু তারা প্রায়ই এটা আবিষ্কার করে বিস্মিত ও আনন্দিত হয় যে এমন পরিস্থিতিতে তাদের আছে অভাবিত সম্ভাবনা; তারা দায়িত্বভার গ্রহণ করে, সন্তান বড়ো করে, সিদ্ধান্ত নেয়, সাহায্য ছাড়াই চালিয়ে যায়। যখন তাদের পুরুষেরা ফিরে এসে আবার তাদের যোগ্যতাহীন করে তোলে, সেটা তার জন্যে হয় বিরক্তিকর।
