তবে সব মিলিয়ে আজকাল বিয়ে হচ্ছে জীবনের মৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে টিকে থাকা একটি স্মৃতিচিহ্ন, আর স্ত্রীর পরিস্থিতি আগের থেকেও বেশি অপ্রীতিকর, কেননা আজো তার দায়িত্ব একই, তবে সেগুলো তাকে আর একই অধিকার, সুবিধা, ও সম্মান দেয় না। পুরুষ আজকাল বিয়ে করে সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটা নোঙর ফেলার স্থান পাওয়ার জন্যে, তবে সে নিজে সেখানে আটকে থাকতে চায় না; সে চুলো আর গৃহ চায়, কিন্তু সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বাধীনতাও তার আছে; সে ঘর বাঁধে, কিন্তু প্রায়ই অন্তরে থেকে যায় ভবঘুরে; সে গার্হস্থ্য সুখকে ঘৃণা করে না, তবে একেই লক্ষ্যে পরিণত করে না; পুনরাবৃত্তি তাকে ক্লান্ত করে; সে চায় অভিনবত্ব, ঝুঁকি, পরাভূত করার মতো বিরোধিতা, সঙ্গী ও বন্ধু যারা তাকে নিঃসঙ্গতা থেকে নিয়ে যায় আ দো। শিশুরা এমনকি তাদের পিতার থেকেও বেশি চায় পরিবারের সীমার বাইরে চলে যেতে : তাদের জীবন আছে অন্য কোথাও, এটা তাদের সম্মুখে; শিশু সব সময়ই চায় ভিন্ন জিনিশ। নারী প্রতিষ্ঠা করতে চায় অবিনশ্বরতা ও অনুবর্তনের এক বিশ্ব; স্বামী ও শিশুরা চায় নারীর সৃষ্টিকরা পরিস্থিতির সীমা পেরিয়ে যেতে। এজন্যেই, যে-কাজে সে তার সারাটি জীবন নিয়োগ করেছে, সেগুলো যে অনিশ্চিত প্রকৃতির, তা স্বীকার করতে যদিও সে ঘৃণা করে, তবুও সে জোর করে তার দায়িত্বগুলো চাপিয়ে দিতে চায় : সে মা ও গৃহিণী থেকে হয়ে ওঠে এক কঠোর সৎ মা ও খাণ্ডারি।
আজকাল এ-দুস্তর ব্যবধান এতোটা গভীর নয়, কেননা তরুণী এতোটা কৃত্রিম মানুষ নয়; সে অনেক ভালোভাবে অবহিত, জীবনের জন্যে অধিকতর ভালোভাবে প্রস্তুত। তবে আজো প্রায়ই সে তার স্বামীর থেকে অনেকছোটো। এ-ব্যাপারটির ওপর যথোচিত গুরুত্ব দেয়া হয় নি; প্রায়ই যা আসলে অসম প্ৰায়তার ব্যাপার, সেটাকে গণ্য করা হয় লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা বলে; অনেক ক্ষেত্রে নারীটি শিশু, এজন্যে নয় যে সে নারী, বরং এজন্যে যে আসলেই সে খুবই অল্পবয়স্ক। তার স্বামী ও তার বন্ধুদের ধীরস্থির মনস্কতা শ্বাসরুদ্ধকর, এর ভার মেয়েটিকে চেপে ধরে। তলস্তয়ের স্ত্রী, সোফি, তার বিয়ের এক বছর পর লিখেছেন :
সে বৃদ্ধ, সে অতিশয় নিবিষ্ট, আর আমার প্রসঙ্গে আমি অনুভব করি এতো তারুণ্য এবং বোকামির দিকে আমার এতো ঝোক! শয্যায় যাওয়ার বদলে পাগলের মতো আমি নাচতে চাই, কিন্তু কার সাথে?
বৃদ্ধ বয়সের জলবায়ু আমাকে ঘিরে আছে, আমার চারপাশের সবাই বুড়ো। আমি নিজেকে বাধ্য করি যৌবনের প্রতিটি বাসনা দমন করতে, এ নিরাবেগ পরিবেশে মনে হয় আমি আছি খুবই অস্থানে।
স্বামীর দিক দিয়ে, স্বামী তার স্ত্রীর মধ্যে দেখতে পায় একটি শিশু; সে যেমন প্রত্যাশা করেছিলো তার স্ত্রী তার তেমন সঙ্গিনী নয় এবং সে স্ত্রীকে এটা বুঝিয়ে দেয়, এতে স্ত্রী অপমান বোধ করে। সন্দেহ নেই স্ত্রীটি নিজের বাড়ি ছাড়ার সময় একটি নতুন পথপ্রদর্শক পেয়ে খুশি হয়েছিলো, তবে সে চায় তাকেও গণ্য করা হোক ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বলে; সে শিশু থাকতে চায়, সে নারী হয়ে উঠতে চায়; একজন বেশি বয়সের স্বামী তার সাথে কখনোই পুরোপুরি সন্তোষজনক ব্যবহার করতে পারে না।
তবে যখন বয়সের ব্যবধান কম, তখনও একটি ব্যাপার থেকে যায় যে ওই তরুণ ও তরুণীটি লালিতপালিত হয়েছে বেশ ভিন্নভাবে; তরুণীটি এসেছে একটি নারীর জগত থেকে, যেখানে তাকে শেখানো হয়েছে নারীর সদাচরণ ও নারীর। মূল্যবোধগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, আর সেখানে তরুণটিকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পুরুষের নীতিবোধের সূত্রানুসারে। প্রায়ই তাদের পক্ষে পরস্পরকে বোঝা শক্ত হয়ে ওঠে এবং অচিরেই দেখা দেয় বিরোধ।
বিয়ে যেহেতু সাধারণত স্ত্রীকে স্বামীর অধীন করে, তাই তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সমস্যাটি তীব্রতর হয়ে ওঠে নারীটির কাছেই। বিয়ের কূটভাষ এখানে যে এটা একই সাথে একটি কামমূলক ও সামাজিক কাজ : নারীটির চোখে স্বামীরূপে। প্রতিফলিত হয় এ-পরস্পরবিপরীত মূল্য। স্বামীটি হচ্ছে পৌরুষের মর্যাদায় ভূষিত একটি নরদেবতা এবং সে গ্রহণ করবে স্ত্রীটির পিতার স্থান : রক্ষক, ভরণপোষণকারী, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক; তার ছায়ায়ই বিকশিত হবে স্ত্রীটির অস্তিত্ব; স্বামীটি মূল্যবোধের প্রতিপালক, সত্যের রক্ষক, সে-ই প্রতিপাদন করে দম্পতিটির নৈতিক যথার্থতা। তবে সে একটি পুরুষও, যার সাথে স্ত্রীটিকে সঙ্গী হতে হবে এমন একটি অভিজ্ঞতায়, যা। প্রায়ই লজ্জাজনক, উদ্ভট, আপত্তিকর, বা বিপর্যস্তকর, অনেকটা নৈমিত্তিক; স্বামীটি তার সাথে ইন্দ্রিয়চর্চায় মেতে ওঠার জন্যে স্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাবে, আবার সে-ই দৃঢ়ভাবে স্ত্রীকে পথ দেখিয়ে নেবে আদর্শের দিকে।
বিজ্ঞ পরামর্শদাতা ও ফনের মাঝামাঝি থাকতে পারে বহু সংকর রূপ। অনেক সময় পুরুষটি হয়ে ওঠে একই সঙ্গে পিতা ও প্রেমিক, যৌনকর্মটি হয়ে ওঠে এক পবিত্র কামোৎসব এবং অনুরাগিণী স্ত্রীটি সম্পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার করার মূল্যে লাভ করে চুড়ান্ত মোক্ষ। বিবাহিত জীবনে প্রীতিপূর্ণ সংরাগ খুবই দুর্লভ। অনেক সময়, আবার, স্ত্রীটি তার স্বামীকে ভালোবাসে প্লাতোয়ীভাবে, কিন্তু যে-পুরুষটিকে সে অতিশয় ভক্তি করে, তার বাহুবন্ধনে নিজেকে সমর্পণ করতে সে সম্মত হয় না, যেমন ঘটেছে একজন মহান শিল্পীর সাথে বিবাহিত এক নারীর বেলা, যে অনুরাগিণী ছিলো শিল্পীর, কিন্তু তার সাথে সে ছিলো পুরোপুরি কামশীতল। এর বিপরীতে, স্ত্রীটি স্বামীর সাথে মিলে উপভোগ করতে পারে এমন কোনো আনন্দ, যা তার কাছে মনে হতে পারে। উভয়ের জন্যেই এক নিচাশয়তা এবং এটা তার অনুরাগ ও ভক্তির জন্যে মারাত্মক। আবার, কামহতাশা তার স্বামীকে চিরকালের জন্যে নামিয়েদিতে পারে একটা বর্বরের স্তরে : দেহরূপে সে ঘৃণিত, চৈতন্যরূপে সে অবজ্ঞার পাত্র; ব্যস্তানুরূপে, আমরা দেখেছি কীভাবে তিরষ্কার, পারস্পরিক বিদ্বেষ, বিরক্তি নারীকে করে তুলতে পারে কামশীতল। যা প্রায়ই ঘটে, তা হচ্ছে তাদের কামের অভিজ্ঞতার পর স্বামীটিকে থাকতে হয় একজন শ্রদ্ধেয় শ্রেষ্ঠতর মানুষ, যার পাশব দুর্বলতাগুলো ক্ষমার যোগ্য; উদাহরণস্বরূপ, এটাই হয়তো ঘটেছিলো ভিক্তর উপোর স্ত্রী আদেলের বেলা। অথবা স্বামীটি হতে পারে নিতান্তই একটি প্রীতিকর সঙ্গী, যার নেই বিশেষ কোনো মর্যাদা, একই সঙ্গে যে ভালোবাসা ও ঘৃণার পাত্র।
