গ্যাস ও বিদ্যুৎ হনন করেছে অগ্নির ইন্দ্রজালকে, কিন্তু গ্রামে আজো বহু নারী উপভোগ করে জড় কাঠ থেকে জ্বলন্ত শিখা জ্বালানোর আনন্দ। যখন জ্বলে ওঠে তার আগুন, নারী হয়ে ওঠে অভিচারিণী; একবার হাত নেড়ে, যেমন সে মেশায় ডিম, বা আগুনের যাদুর মাধ্যমে, সে সম্পন্ন করে বস্তুর রূপান্তর : পদার্থ হয়ে ওঠে খাদ্য। এসব রসায়নের আছে মোহিনীশক্তি, কবিতা আছে খাবার সংরক্ষণ করার মধ্যে; চিনির যাদের মধ্যে গৃহিণী ধরে ফেলেছে খাদ্যের স্থায়িত্বকাল, সে জীবনকে আটকে ফেলেছে বয়ামের ভেতরে। রান্না হচ্ছে প্রত্যাদেশ ও সৃষ্টি; এবং নারী সফলভাবে তৈরি একটি কেক বা পরতে পরতে তৈরি একটি পেস্ট্রিতে পেতে পারে বিশেষ সুখ, কেননা সবাই তা বানাতে পারে না : ক্ষমতা থাকা চাই।
এখানেও ছোটো মেয়ে স্বাভাবিকভাবেই পছন্দ করে বড়োদের অনুকরণ করতে, সে তৈরি করে কাদার পাই বা অমন কিছু, এবং রান্নাঘরে সাহায্য করে আসল ময়দার তাল বেলতে। তবে অন্যান্য গৃহস্থালির কাজের মতোই পুনরাবৃত্তি অচিরেই আনন্দ নষ্ট করে দেয়। চুলোর যাদু বিশেষ আবেদন জাগাতে পারে না মেক্সিকি ইন্ডীয় নারীর কাছে, যারা জীবনের অর্ধেকটাই ব্যয় করে টর্টিলা বানাতে বানাতে, দিনের পর দিন, শতাব্দীর পর শতাব্দী একই রকমে। পুরুষ ও নারী লেখকেরা যারা গীতিময়রূপে এবিজয়কে তুরীয়লোকে উন্নীত করেন, তারা কখনোই বা কদাচিৎ বাস্তবে গৃহস্থালির কাজ করেছেন। এটা জীবিকা হিশেবে ক্লান্তিকর, শূন্য, একঘেঁয়ে। তবে যদি কেউ একাজ করার সাথে সাথে হয় একজন উৎপাদনকারী, একজন সৃষ্টিশীল কর্মী, তাহলে এটা জৈবিক ক্রিয়াগুলোর মতো স্বাভাবিকভাবেই সমন্বিত হয়ে যায় তার জীবনের সাথে; এ-কারণেই পুরুষেরা যখন গৃহস্থালির কাজ করে, তখন সেটা হয় অনেক কম নিরানন্দ; এটা তাদের কাছে একটা ঋণাত্মক ও অকিঞ্চিৎকর মুহূর্ত, যা থেকে তারা শিগগিরই মুক্তি পেয়ে যায়। স্ত্রী-চাকরানির ভাগ্যকে যা অপ্রীতিকর করে তোলে, তা হচ্ছে সে-শ্রমবিভাজন, যা তাকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে সাধারণ ও পরিহার্যের মধ্যে বদ্ধ করে। বাসস্থান ও খাদ্য জীবনের জন্যে দরকার, তবে এটা কোনো তাৎপর্য দান করে: গৃহিণীর অব্যবহিত লক্ষ্যগুলো উপায় মাত্র, প্রকৃত লক্ষ্য নয়। স্বাভাবিকভাবেই সে তার কাজকে কিছুটা স্বাতন্ত্র দেয়ার চেষ্টা করে এবং অপরিহার্য করে তুলতে চায়। সে মনে করে যে তার কাজ আর কেউ তার মতো করতে পারতো না; তার আছে তার ব্রত, কুসংস্কার, ও কাজের ধরন। কিন্তু প্রায়সই তার ‘ব্যক্তিগত সুর’ হচ্ছে বিশৃঙ্খলার এক অস্পষ্ট ও নিরর্থক পুনর্বিন্যাস।
মৌলিকত্ব ও অনন্য উৎকর্ষ অর্জনের এ-ধরনের প্রাণপণ চেষ্টায় নারী নষ্ট করে প্রচুর সময় ও প্রয়াস; এটা তার কাজকে দেয় একটা খুঁটিনাটির প্রতি অতি-যত্নশীল, অবিন্যস্ত, ও সমাপ্তিহীন চরিত্র এবং এর ফলে গৃহস্থালির কাজের প্রকৃত ভার নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে বিবাহিত নারীরা গৃহস্থালির কাজ করে গড়ে সপ্তাহে তিরিশ ঘণ্টা, বা কোনো চাকুরিতে কর্মের সপ্তাহগুলোর চারভাগের তিন ভাগ। বেতনভুক্ত কোনো চাকুরির কাজের সাথে যদি এ-কাজও করতে হয়, তাহলে কাজ হয়ে ওঠে বিপুল, আর যদি নারীটির কিছু করার না থাকে, তাহলে কাজ হয় সামান্য। এর সাথে কয়েকটি শিশুর লালনপালন স্বাভাবিকভাবেই নারীর কাজ অনেক বাড়িয়ে দেয় : দরিদ্র মায়েরা সাধারণত সব সময়ই কাজ করে। অন্য দিকে, মধ্যবিত্ত নারীরা যারা কাজের লোক রাখে, তারা অনেকটা নিষ্কর্মা; তারা তাদের অবসরভোগের মূল্য পরিশোধ করে অবসাদে। যদি তাদের আর কোনো দিকে আগ্রহ থাকে, তাহলে তারা তাদের গৃহস্থালির দায়িত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে ও জটিল করে তোলে, শুধু হাতে কিছু একটা কাজ থাকার জন্যে।
এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার হচ্ছে যে এ-শ্রমের স্থায়ী কোনো কিছু সৃষ্টির কোনো লক্ষ্য নেই। নারী প্রলুব্ধ হয়–যতো বেশি প্রলুব্ধ হয় ততোবেশি কঠোরভাবে সে খাটাখাটি করে তার কাজকেই কাজের লক্ষ্য বলে গণ্য করতে। সদ্য উনুন থেকে বের করে আনা একটা পুরো কেক দেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে : ‘ধিক, এই কেক খাওয়া!’ এটা সত্যিই খুব জঘন্য ব্যাপার তার স্বামী ও সন্তানদের কাদামাখা পায়ে তার মোমমাজা শক্ত কাঠের মেঝের চারদিকে ভারি পদক্ষেপে হাঁটানো! জিনিশপত্র ব্যবহৃত হলে ময়লা হয় বা নষ্ট হয় আমরা দেখেছি সে কতোখানি চেষ্টা করে যাতে ওগুলো ব্যবহৃত না হয়। সংরক্ষিত খাবার ছাতা-ধরা না পর্যন্ত সে জমিয়ে রাখে; সে বৈঠকখানা তালাবদ্ধ করে রাখে। কিন্তু সময় নির্মমভাবে বয়ে চলে; খাদ্যদ্রব্য ইঁদুর আকৃষ্ট করে, ওগুলোতে পোকা ধরে; পতঙ্গরা আক্রমণ করে লেপকথা কাপড়চোপড়। বিশ্বটি পাথরে খোদাই করা কোনো স্বপ্ন নয়, এটা তৈরি পচনশীল সন্দেহজনক বস্তুতে; খাদ্যদ্রব্য দালির মাংসল ঘড়ির মতোই দ্ব্যর্থবোধক। একে মনে হয় জড়, অজৈব, কিন্তু গোপন শুয়োপোকারা হয়তো একে পরিণত করেছে লাশে। যে-গৃহিণী নিজেকে হারিয়ে ফেলে বস্তুর মধ্যে, সে বস্তুর মতোই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সারা বিশ্বের ওপর : পোশাকপরিচ্ছদ ঝলসে যায়, রোস্ট পুড়ে যায়, চিনেমাটির বাসনকোসন ভাঙে; এগুলো চরম বিপর্যয়, কেননা যখন জিনিশপত্র ধ্বংস হয়, ওগুলো চিরকালের জন্যে শেষ হয়ে যায়। এগুলোর মাধ্যমে সম্ভবত চিরস্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়।
