ধন্যবাদ মখমল ও রেশম ও চিনামাটির বাসনকোসনকে, যা দিয়ে সে ঘিরে ফেলে নিজেকে, এসব দিয়ে নারী কিছুটা পরিতৃপ্ত করতে পারে সে-স্পর্শেন্দ্রিয়গ্রাহ্য কামকাতরতাকে, তার কামজীবন যা কদাচিৎ প্রশমিত করতে পারে। এ-গৃহসজ্জাও প্রকাশ করে তার ব্যক্তিত্বকে; সে-ই পছন্দ করেছে, তৈরি করেছে, খুঁজে বের করেছে সাজসজ্জা ও তুচ্ছ আসবাবপত্র, সে-ই এসব বিন্যাস করেছে এমন এক নান্দনিক নীতি অনুসারে, যাতে প্রতিসাম্য সাধারণত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এগুলো প্রতিফলিত। করে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র, আবার সবার চোখের কাছে প্রকাশ করে তার জীবনযাপনের মান। এভাবে তার গৃহ হচ্ছে তার পার্থিব ভাগ্য, তার সামাজিক মূল্যের ও তার সত্যতম সত্তার প্রকাশ। যেহেতু সে কিছুই করে না, তাই তার যা আছে, তার মাঝেই সে ব্যাকুলভাবে খোঁজে আত্মসিদ্ধি।
গৃহস্থালির কাজে, চাকরদের সাহায্য নিয়ে বা না নিয়ে, নারী তার গৃহকে নিজের করে নেয়, প্রতিপন্ন হয় তার সামাজিক যাথার্থ্য, এবং নিজের জন্যে পায় একটি পেশা, একটি কাজ, যা উপকারিতা ও পরিতোষের সঙ্গে জড়িত থাকে জিনিশপত্রের সাথে–ঝলমলে চুলো, পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন কাপড়চোপড়, উজ্জ্বল তাম্র, ঘষামাজা আসবাবপত্র–কিন্তু এগুলো সীমাবদ্ধতা থেকে কোনো মুক্তির উপায় দেয় না এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সামান্যই। এসব কাজের আছে একটা ঋণাত্মক ভিত্তি : পরিষ্কার করা হচ্ছে ময়লা থেকে মুক্তি পাওয়া, গোছগাছ করা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা দূর করা। এবং দরিদ্র অবস্থায় কোনো সন্তোষই সম্ভব নয়; নারীর ঘাম ও অশ্রু সত্ত্বেও কুঁড়েঘর কুঁড়েঘরই থাকে; ‘জগতের কিছুই তাকে সুন্দর করতে পারে না’। বিপুল নারীবাহিনী লিপ্ত এ-অন্তহীন সংগ্রামে, কিন্তু তাতেও তারা ময়লা জয় করতে পারে না। এবং এমনকি সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্তের জন্যেও জয় কখনোই চূড়ান্ত নয়।
অন্তহীন পুনরাবৃত্তিতে ভরা গৃহস্থালির কাজের থেকে খুব কম কাজই সিসিফাসের পীড়নের মতো : পরিচ্ছন্ন জিনিশ ননাংরা হয়ে ওঠে, নোংরা জিনিশকে পরিচ্ছন্ন করা হয়, বার বার, দিনের পর দিন। গৃহিণী নিজকে ক্ষয়করে ফেলে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে মাটিতে পদাঘাত করতে করতে : সে কিছু তৈরি করে না, শুধু স্থায়ী করে বর্তমানকে। সে কখনো কোনো ধনাত্মক শুভর জয় অনুভব করে না, বরং ঋণাত্মক অশুভর সাথে করতে থাকে অন্তহীন সংগ্রাম। এক তরুণী ছাত্রী তার প্রবন্ধে লিখেছে : ‘আমি কখনো ঘর ঝাড়ামোছার দিন নেবো না’; সে ভবিষ্যৎকে মনে করে কোনো অজানা শিখরের দিকে ধারাবাহিক অগ্রসরণ; কিন্তু একদিন, তার মা যখন থালাবাসন ধুচ্ছিলো, হঠাৎ তার মনে হয় তারা দুজনেই আমৃত্যু আটকে পড়বে এ-ব্রতে। খাওয়া, ঘুমোনো, ধোয়ামোছা–বছরগুলো আর আকাশের দিকে ওঠে রং ষাষ্টাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে থাকে, ধূসর ও অভিন্ন। ধুলোবালির বিরুদ্ধে সংগ্রামে কখনো জয়লাভ ঘটে না।
ধোয়া, ইস্ত্রি করা, ঝাঁট দেয়া, কাপড়ের আলমারি নিচে থেকে ফেঁশো খুঁজে বের করা–এসব ক্ষয়রোধও জীবনকে অস্বীকার করা; কেননা জীবন একই সময়ে সৃষ্টি ও ধ্বংস করে, এবং এর ঋণাত্মক দিকটিই জড়িত গৃহিণীর সাথে। দার্শনিকভাবে দেখলে, তার অবস্থা ম্যানিকীয়বাদীর। ম্যানিকীয়বাদের সারকথা শুধু দুটি নীতি স্বীকার করা নয়, যার একটি শুভ, আরেকটি অশুভ; এটাও পোষণ করা হয় যে অশুভের বিলুপ্তির মাধ্যমেই অর্জিত হয় শুভ এবং কোন সক্রিয় কাজের মাধ্যমে নয়। এ-অর্থে শয়তানের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বে খ্রিস্টধর্ম আদৌ ম্যানিকীয়বাদী নয়, কেননা এতে অশুভকে সরাসরি পরাভূত করার প্রয়াস মাধ্যমে নয়, বরং বিধাতার কাছে আত্মনিবেদনের মাধ্যমে বড়াই করতে হয় শয়তানের সঙ্গে। সীমাতিক্ৰমণতা ও মুক্তির যে-কোনো মতাদর্শ শুভর দিকে অগ্রসরণের নিচে স্থান দেয় অশুভকে পরাভূত করা। কিন্তু নারীকে উৎকৃষ্টতর বিশ্ব নির্মাণের জন্যে আহ্বান জানানো হয় না : তার এলাকা। স্থিত এবং তার কাজ হচ্ছে তার এলাকায় ঢুকে পড়া অশুভ নীতির বিরুদ্ধে সমাপ্তিহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া; ধুলো, দাগ, কাদা, এবং ময়লার বিরুদ্ধে তার সংগ্রামে সে যুদ্ধ করে পাপের সাথে, কুস্তি লড়ে শয়তানের সাথে।
খাবার তৈরি করা, খাবার বাড়া, অনেক বেশি ধনাত্মক প্রকৃতির কাজ এবং প্রায়ই ঝাড়ামোছার কাজের থেকে অনেক বেশি প্রীতিকর। সবার আগে এটা বোঝায় বাজার করা, যা প্রায়ই হয়ে থাকে দিনের উজ্জ্বল স্থানটিতে। এবং শজি বাছতে বাছতে দরোজায় দাঁড়িয়ে গল্পগুজব হচ্ছে নিঃসঙ্গতা থেকে এক আনন্দজনক মুক্তি; জল আনতে যাওয়া আধা-নিঃসঙ্গ মুসলমান নারীদের জন্যে একটা বড় রোমাঞ্চ; বাজারে ও দোকানে নারীরা একই আগ্রহ নিয়ে নিজেদের একই দলের সদস্য মনে করে আলাপ করে গৃহস্থালি সম্পর্কে, ওই মুহূর্তে যা পুরুষের দলের বিরোধী, যেমন অপরিহার্য বিরোধী পরিহার্যের। কেনাকাটা করা এক গভীর সুখ, একটি আবিষ্কার, প্রায় একটি উদ্ভাবন। যেমন জিদ তার জর্নাল-এ বলেছেন, মুসলমানেরা জুয়োখেলা জানতো না বলে তার বদলে তারা আবিষ্কার করেছে গুপ্তধন; এটাই হচ্ছে বাণিজ্যিক
সভ্যতার কবিতা ও রোমাঞ্চ। গৃহিণী জুয়োর কিছুই জানে না, তবে একটি নিরেট। বাঁধাকপি, একটা পাকা কমবের এমন সম্পদ, যা চাতুর্যের সাথে জিতে নিতে হবে অনিচ্ছুক দোকানির থেকে; খেলাটি হচ্ছে সবচেয়ে কম টাকায় সবচেয়ে ভালোটা পাওয়া; মিতব্যয় ততোটা বাজেট সাশ্রয়ের জন্যে নয় যতোটা খেলায় জেতার জন্যে। যখন সে ভাবে তার পরিপূর্ণ ভাড়ারঘরের কথা সে সুখ পায় তার ক্ষণস্থায়ী বিজয়ে।
