সুখের আদর্শটি সব সময়ই বস্তুগত রূপ নিয়েছে একটি গৃহরূপে, তা কুটিরই হোক বা হোক ক্যাসল; এটা নির্দেশ করে চিরস্থায়িত্ব ও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা। এর দেয়ালের অভ্যন্তরে পরিবারটি প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পৃথকখোপ বা একক গোষ্ঠিরূপে এবং প্রজন্ম আসে প্রজন্ম যায় এটি রক্ষা করে এর পরিচয়; অতীত, যা সংরক্ষিত হয় আসবাবপত্রের গঠন ও পূর্বপুরুষের চিত্রাবলিতে, প্রশ্রুিতি দেয় এক নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের; বাগানে ভোজ্য শব্জি ফলিয়ে ঋতুগুলো প্রকাশ করে তাদের আশ্বস্তকর চক্র; প্রতিবছর একই বসন্তকাল একই পুস্পসহ ভবিষ্যদ্বাণী করে নিত্য গ্রীষ্মের ফিরে আসার, ভবিষ্যদ্বাণী করে শরতের, যার এবারের ফলগুলো ভিন্ন নয় অন্য কোনো। শরতের ফলগুলো থেকে : কাল ও স্থান হঠাৎ তাদের কাজের রীতি বদল করে না, নির্দিষ্ট চক্রে তারা ফিরে ফিরে আসে। ভূসম্পত্তিভিত্তিক প্রতিটি সভ্যতায় বিপুল পরিমাণ সাহিত্য গায় চুলো ও গৃহের কবিতার গান। প্রায়ই ঘটে যে গৃহের কবিরা নারী, কেননা নারীর দায়িত্ব পরিবারপরিজনের সুখ নিশ্চিত করা; যখন রোমের দমিনারা বসততা আত্ৰিউমে, সে-সময়ের মতো তার ভূমিকা হচ্ছে ‘গৃহকত্রী’ হওয়া।
আজ গৃহ তার পিতৃতান্ত্রিক মহিমা হারিয়ে ফেলেছে; অধিকাংশ পুরুষের কাছে এটা থাকার জায়গা মাত্র, মৃত পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে সে আর ভীত নয়, এটা আর তার আগামী শতাব্দীগুলোকে বেষ্টন করে না। কিন্তু আজো নারী তার অভ্যন্তরকে সে-অর্থ ও মূল্য দেয়ার জন্যে ব্যর্থ, একদা যে-অর্থ ও মূল্য ধারণ করতে প্রকৃত ঘর ও গৃহ। ক্যানারি রোতে স্টেইনবেক বর্ণনা করেছেন এক ছিন্নমূল নারীকে, যে স্বামীসহ বাস করতো একটি বাতিল ইঞ্জিন বয়লারে, ছেড়া কাপড় ও পর্দা দিয়ে ওটি সাজানোর জন্যে নারীটি ছিলো বদ্ধপরিকর; পুরুষটি আপত্তি করে পর্দার কোনো দরকার নেই-‘আমাদের কোনো জানালা নেই’।
এ-উদ্বেগ একান্তভাবেই নারীধর্মী। একটি স্বাভাবিক পুরুষ তার চারপাশের জিনিশপত্রকে হাতিয়ার বলে মনে করে যে উদ্দেশ্যে ওগুলো তৈরি করা হয়েছে সে ওগুলো বিন্যস্ত করে সেভাবে; তার কাছে গোছানোর–নারী সেখানে প্রায়ই দেখতে পায় শুধু অগোছানো–অর্থ হচ্ছে তার সিগারেট, তার কাগজপত্র, তার যন্ত্রপাতি তার হাতের কাছে থাকা। আরো অনেকের মধ্যে আছে শিল্পীরা, যারা তাদের পছন্দের বস্তুর মাধ্যমে পুনর্সৃষ্টি করতে পারে বিশ্বকে–চিত্রকর ও ভাস্কররা–তারা যেখানে বাস করে তার প্রতিবেশ সম্পর্কে তারা থাকে অমনোযোগী। রদা সম্পর্কে রিল্কে লিখেছেন :
আমি যখন প্রথম বার কাছে আসি… আমি জানতাম তার গৃহ তার কাছে কিছুই নয়, হয়তো একটা তুচ্ছ ছোট্ট দরকার মাত্র, বৃষ্টির সময় ও ঘুমের জন্যে একটা ছাদ; এটা তার কাছে কোনো উদ্বেগের ব্যাপার ছিলো না এবং তার নির্জনতা ও স্থৈর্যের ওপর এটা কোনো ভার ছিলো না। নিজের গভীরে তিনি বইতেন একটি গৃহের অন্ধকার, আশ্রয়, ও শান্তি, এবং তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এটির ওপরের আকাশ, এবং এর চারপাশের বনভূমি, এবং দূরত্ব ও মহানদী সব সময়ই পাশ দিয়ে বয়ে চলতো।
কেউ যদি নিজের ভেতরে পেতে চায় চুল্লি ও গৃহ, তাহলে প্রথমে তাকে আত্মসিদ্ধি লাভ করতে হয় তার সৃষ্টিতে বা কর্মে। পুরুষ তার অব্যবহিত প্রতিবেশের প্রতি কম আগ্রহী, কেননা সে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়ে। আর সেখানে নারী আটকে থাকে দাম্পত্য এলাকার মধ্যে; তারই দায়িত্ব ওই কারাগারটিকে একটি রাজ্যে পরিণত করা। যে-দ্বান্দ্বিকতা সাধারণভাবে সংজ্ঞায়িত করে তার পরিস্থিতি, সেএকই দ্বান্দ্বিকতা নির্দেশ করে তার গৃহের প্রতি তার মনোভাব : সে গ্রহণ করে শিকার হয়ে, সে স্বাধীনতা পায় স্বাধীনতা ত্যাগ করে : বিশ্বকে প্রত্যাখ্যান করে সে জয় করতে চায় একটি বিশ্ব।
একটু অনুতাপের সাথেই তার পেছনে সে বন্ধ করে দেয় তার নতুন গৃহের দরোজা; যখন সে বালিকা ছিলো তখন সমগ্র পল্পীই ছিলো তার স্বদেশ; অরণ্য ছিলো তারই। এখন সে আটকে আছে এক সীমাবদ্ধ এলাকায়; প্রকৃতি ক্ষীণ হয়ে ধারণ করেছে ভাণ্ডে বোনা জারেনিয়ামের আকার দেয়াল বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে দিগন্তকে। তবে সে উঠে পড়ে লেগে গেছে এসব সীমাবদ্ধতা জয় করার জন্যে। কম বা বেশি দামি ব্রিক-আব্র্যাকরূপে সে তার চারদেয়ালের ভেতরে জড়ো করেছে জগতের যতো প্রাণী ও উদ্ভিদকুল, তার আছে বিচিত্র দেশ ও অতীত কাল; তার আছে স্বামী, যে প্রতিনিধিত্ব করে মানবসমাজের, এবং তার আছে সন্তান, যে তাকে বহনযোগ্যরূপে দেয় সমগ্র ভবিষ্যৎ।
গৃহ হয়ে ওঠে বিশ্বের কেন্দ্র এবং এমনকি তার একমাত্র বাস্তবতা; এক ধরনের প্রতি-বিশ্ব বা বিরোধী অবস্থানে বিশ্ব (বাশলা); আশ্রয়, নির্জনবাস, এটো, গর্ভ, এটা বাইরের বিপদ থেকে দেয় আশ্রয়; অলীক হয়ে ওঠে বিভ্রান্তিপূর্ণ বাহ্যজগত। এবং বিশেষভাবে সন্ধ্যাবেলা, যখন দরোজাজানালা বন্ধ, স্ত্রীর নিজেকে মনে হয় রাণী; যেসূর্য জ্বলে সকলের জন্যে, দুপুরবেলা দিকে দিকে ছড়ানো তার আলোতে সে বিরক্ত হয়; রাত্রিতে সে আর নিঃস্ব নয়, কেননা সে পরিহার করেছে সে-সব কিছু, যা তার অধিকারে নয়; সে দেখতে পায় প্রদীপের ঢাকনার নিচে জ্বলছে একটা আলো, যা তার নিজের এবং যা একান্তভাবে আলোকিত করে শুধু তার গৃহকেই : আর কিছু নেই। গৃহের ভেতরে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে বাস্তবতাকে, আর তখন মনে হয় যেনো ভেঙেচুরে পড়ছে বাইরের জগত।
