বিয়ের রাত্রি কামকৰ্মটিকে রূপান্তরিত করে এক পরীক্ষায়, যাতে উভয়েই ভয় পায় যে তারা উত্তীর্ণ হতে পারবে না, প্রত্যেকেই নিজের সমস্যা নিয়ে এতো উদ্বিগ্ন থাকে। যে অন্যের সম্পর্কে সদয়তার সাথে ভাবতেও পারে না। এটা ঘটনাটিকে দেয়। ভীতিকর গাম্ভীর্য; এটা বিস্ময়কর নয় যে এ-ঘটনা নারীটিকে করে তোলে স্থায়ীভাবে কামশীতল। স্বামীটি যে-কঠিন সমস্যায় পড়ে, তা হচ্ছে এই : আরিস্ততলের ভাষায়, ‘যদি সে তার স্ত্রীকে অতিরিক্ত কামুকতার সাথে কামোদ্দীপ্ত করে’, তাহলে স্ত্রীটি মর্মাহত ও অবমানিত বোধ করতে পারে; এ-ভয়ই বিহ্বল করে মার্কিন স্বামীদের। অন্য দিকে, তার স্বামী যদি তাকে ‘মান্য’ করে, তাহলে সে স্ত্রীর কাম জাগাতে ব্যর্থ হয়। এ-উভয়সংকট সৃষ্টি হয় নারীর মনোভাবের দ্ব্যর্থতার ফলে : তরুণী যুগপৎ কামসুখ চায় ও পেতে অস্বীকার করে। যদি সে অসাধারণ ভাগ্যবান না হয়, তবে তরুণ স্বামীটিকে মনে হয় লম্পট অথবা একটা ভণ্ডুলকারী। তাই এটা বিস্ময়কর নয় যে স্ত্রীর কাছে দাম্পত্য দায়িত্বকে প্রায়ই মনে হয় ক্লান্তিকর ও বিস্বাদ।
প্রকৃতপক্ষে, বহু নারী কখনো কামপুলক বোধ না করেই বা আদৌ কামোত্তেজনা অনুভব না করেই হয় মা ও দাদী; কখনো কখনো তারা চিকিৎসকের পরামর্শ বা অন্য কোনো অজুহাতে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে তাদের মর্যাদা লাঘবকারী ‘দায়িত্ব’। কিন্সে বলেছেন বহু স্ত্রী ‘জানিয়েছে তারা মনে করে তাদের সঙ্গমের পৌনপুনিকতার মাত্রা অত্যন্ত বেশি এবং তারা চায় যে তাদের স্বামীরা যেনো এতো ঘনঘন সঙ্গম করতে না চায়। কিছু স্ত্রী কামনা করে আরো ঘনঘন সঙ্গম’। তবে আমরা দেখেছি যে নারীর কামসামর্থ্য প্রায় অসীম। এ-বিবোধ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে কামকে বিধিসম্মত করতে গিয়ে বিয়ে হত্যা করে নারীর কাম।
মনে হতে পারে যে বাগদানের সময়টিতে মেয়েটি ধীরেধীরে দীক্ষিত হবে; কিন্তু প্রথা অধিকাংশ সময়ই যুগলের ওপর চাপিয়ে দেয় কঠোর কৌমার্য। বাগদানের কালে কুমারী যখন জানে তার ভবিষ্যৎ স্বামীকে, তখনও তার পরিস্থিতি তরুণী বিবাহিত। নারীর থেকে বেশি ভিন্ন নয়; সে ধরা দেয় শুধু এ কারণে যে তার কাছে বাগদানকে বিয়ের মতোই চুড়ান্ত ব্যাপার বলে মনে হয়, এবং তার প্রথম সঙ্গম তখনও একটি অগ্নিপরীক্ষা। একবার যখন সে নিজেকে দান করেছে–যদি সে গর্ভবতী নাও হয়, যা নিশ্চিতভাবেই হবে বিয়ের বাধ্যবাধকতা তখন তার মন পরিবর্তন খুবই দুর্লভ ঘটনা।
সুবিধার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি মিলনের পক্ষে প্রেম উৎপন্ন করার বিশেষ সুযোগ আছে, এ-মত পোষণ নিতান্তই ভণ্ডামো; এটা নিতান্তই বাজেকথা যে দুটি বিবাহিত মানুষ, যারা আবদ্ধ ব্যবহারিক, সামাজিক, ও নৈতিক স্বার্থের বন্ধনে, তারা যতদিন বাঁচবে ততোদিন কামসুখ দিতে থাকবে পরস্পরকে। তবে সকারণ বিয়ের প্রস্তাবকারীদের এটা দেখাতে কোনোই অসুবিধা হয় না যে প্রেমের বিয়েও দম্পতির সুখের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। প্রথমত, তরুণী প্রায়ই যে-আদর্শ প্রেমের আবেগ বোধ করে, তা তাকে যৌন প্রেমের দিকে নিয়ে যায় না; তার প্লাতোয়ী মূর্তিপুজো, তার দিবাস্বপ্ন, তার শিশুসুলভ বা কৈশোরিক আবিষ্টতা প্রক্ষেপকারী। সংরাগ, প্রাত্যহিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপযোগী নয়, সেগুলো দীর্ঘকাল স্থায়ীও হয় না। যদি তার ও তার প্রেমিকের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও আন্তরিক যৌন আকর্ষণ থাকেও, তবুও তা একটি সারাজীবনের উদ্যোগের দৃঢ় ভিত্তি নয়।
এমনকি যখন বিয়ের আগেও থাকে যৌন প্রেমসম্পর্ক বা জেগে ওঠে মধুচন্দ্রিমার সময়, খুব কম সময়ই তা টিকে থাকে পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে। সন্দেহ নেই যৌন প্রেমের জন্যে দরকার বিশ্বস্ততা, কেননা প্রেমে জড়িত দুটি মানুষ যে-কামনা বোধ করে, তা তাদের জড়িত করে ব্যক্তিরূপে; বাইরের কারো সাথে অভিজ্ঞতা লাভ করে তারা একে অস্বীকার করতে চায় না; তারা পরস্পরকে পরস্পরের জন্যে মনে করে বিকল্পহীন; কিন্তু এ-বিশ্বস্ততার ততোটুকুই অর্থপূর্ণ যতোটা তা স্বতস্ফূর্ত; এবং কামের ইন্দ্রজাল বেশ দ্রুতই স্বতস্ফূর্তভাবে উবে যায়। অলৌকিক ব্যাপারটি হচ্ছে প্রত্যেক প্রেমিককে, ওই মুহূর্তে ও দেহে, এটা দান করে এমন একটি সত্তা, যার অস্তিত্ব ছড়িয়েপড়ে সীমাহীন সীমাতিক্ৰমণতায়; এ-সত্তাটিকে অধিকার করে রাখা নিঃসন্দেহে অসম্ভব, তবে এক বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ও মর্মভেদী উপায়ে অন্তত সাধিত হয় সংস্পর্শ। কিন্তু ব্যক্তি দুটি যখন শত্রুতা, বিরক্তি, বা উদাসীনতাবশত আর এমন সংস্পর্শ কামনা করে না, তখন বিলীন হয়ে যায় যৌন আকর্ষণ।
সত্য হচ্ছে শারীরিক প্রেমকে যেমন চূড়ান্ত লক্ষ্য হিশেবে বিবেচনা করা যায় না, তেমনি একে নিতান্তই একটি লক্ষ্য অর্জনের উপায় বলেও গণ্য করা যায় না; এটা অস্তিত্বের যাথার্থ প্রতিপন্ন করতে পারে না; তবে অসংশ্লিষ্টরূপে এর যাথার্থ্যও প্রতিপাদন করা যায় না। অর্থাৎ, যে-কোনো মানুষের জীবনে এর পালন করা উচিত একটি কাহিনীমূলক ও স্বাধীন ভূমিকা। একথা বলার অর্থ হচ্ছে সর্বোপরি একে হতে হবে মুক্ত।
তাই বুর্জোয়া আশাবাদ বাগদত্তা একটি মেয়েকে যা দিতে পারে, তা নিশ্চিতভাবেই প্রেম নয়; তার সামনে তুলে ধরে রাখা হয় যে-উজ্জ্বল আদর্শ, তা হচ্ছে সুখের আদর্শ, যা বোঝায় সীমাবদ্ধতা ও পুনরাবৃত্তির জীবনে শান্ত ভারসাম্যের আদর্শ। সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার বিশেষ বিশেষ পর্বে সার্বিকভাবে এটাই হয়েছে মধ্যবিত্তের আদর্শ এবং বিশেষ করে ভূসম্পত্তিশালীদের আদর্শ; ভবিষ্যৎ বা বিশ্বকে জয় করা তাদের লক্ষ্য ছিলো না, ছিলো অতীতকে শান্তিপূর্ণভাবে রক্ষা করা, স্টেটাস কৌ অক্ষুন্ন রাখা। আকাঙ্খ ও সংরাগহীন এক কারুকার্যখচিত মাঝারিত্ব, নিরন্তর পুনরাবৃত্ত লক্ষ্যহীন দিনের পর দিন, যে-জীবন তার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন না করে ধীরেধীরে এগিয়ে চলে মৃত্যুর দিকে—‘সুখ’ বলতে তারা এই বুঝিয়েছে। এপিকিউরাস ও জেনোর দ্বারা অস্বচ্ছভাবে অনুপ্রাণিত এ-ভ্রান্ত প্রজ্ঞা আজকাল বাতিল হয়ে গেছে : বিশ্ব যেমন আছে তেমন টিকিয়ে রাখা ও চলতে দেয়া আকাঙ্খিতও নয় সম্ভবও নয়। পুরুষকে দায়িত্ব দেয়া হয় কর্মের, তার কাজ উৎপাদন, যুদ্ধ, সৃষ্টি, প্রগতি, নিজেকে বিশ্বের সমগ্রতা ও ভবিষ্যতের অনন্ততার দিকে সম্প্রসারিত করা; কিন্তু প্রথাগত বিয়ে নারীকে পুরুষের সঙ্গে সীমাতিক্ৰমণতার জন্যে আমন্ত্রণ জানায় না; এটা নারীকে আটকে রাখে। সীমাবদ্ধতায়, তাকে আবদ্ধ করে রাখে তার নিজের বৃত্তের ভেতরে। তাই একটি অপরিবর্তনীয় ভারসাম্যের জীবন, যাতে অতীতের ধারাবাহিকতারূপে বর্তমান এড়িয়ে চলে আগামীকালের বিপদগুলো, নারী সে-জীবন নির্মাণের বেশি আর কিছু করার কথা ভাবতে পারে না। অর্থাৎ, তৈরি করে সম্যকভাবে এক সুখের জীবন। প্রেমের বদলে নারী বোধ করবে এক বিঘ্ন ও সশ্রদ্ধ আবেগ, যার নাম দাম্পত্য প্রেম, পত্নীসুলভ প্রীতি; তাকে কাজ করতে হবে গৃহের দেয়ালের ভেতরে, সে বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলবে তার বিশ্ব; অনন্তকাল ধরে সে যত্ন নিতে থাকবে মানবপ্রজাতির অনুবর্তনের।
