তবে ফ্রান্সে ফ্য দ্য স্যিকল ঔপনাসিক ও নাট্যকারেরা, যারা স্বর্গীয় চুক্তির গুণাবলি সম্পর্কে ছিলেন একটু কম নিশ্চিত, তারা দাম্পত্য সুখ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন অনেক বেশি খাঁটি মানবিক পদ্ধতিতে; বালজাকের থেকে অনেক বেশি সাহসের সাথে তারা ভেবেছিলেন কামের সাথে বৈধ প্রেমের মিলন ঘটানোর সম্ভাবনার কথা। মার্সেল ভিস্ত তরুণ স্বামীকে পরামর্শ দেন নিজের স্ত্রীকে রক্ষিতার মতো দেখতে, এবং সতর্কতার। সাথে তিনি আঁকেন বিবাহিত জীবনের সুখের ছবি। বার্নস্তেইন নিজেকে করে তোলেন বৈধ প্রেমের নাট্যকার : অনৈতিক, মিথ্যাভাষী, ইন্দ্রিয়কাতর, চৌর্যবৃত্তিপরায়ণ, স্বেচ্ছাচারী স্ত্রীর তুলনায় তাঁর স্বামীকে মনে হয় একজন জ্ঞানী ও উদার মানুষ; এবং বোঝা যায় সে একজন শক্তিশালী ও দক্ষ প্রেমিক। ব্যভিচারের উপন্যাসের প্রতিক্রিয়ায় বিয়ের যথার্থতা প্রতিপাদন করে বেরোয় অজস্র রোম্যান্টিক উপন্যাস। এমনকি কলেৎও নতি স্বীকার করেছিলেন নীতিবাক্য আওড়ানোর ঢলের কাছে, তার এজেনি লিব্যরততে, এক তরুণী স্ত্রী, যার সতীত্বমোচন করা হয়েছিলো অপরিণত বয়সে, তার দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা বর্ণনার পর যখন তিনি ঠিক করেন যে তিনি তাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন স্বামীর বাহুবন্ধনে কামসুখ লাভের সঙ্গে। মার্টিন মরিসের একটি উপন্যাসে তরুণী স্ত্রী কামকলা শেখে এক প্রেমিকের কাছে, তারপর সে ফিরে এসে স্বামীকে উপহার দেয় তার অভিজ্ঞতার সুফল।
অন্য কারণে এবং ভিন্ন এক উপায়ে আজকের মার্কিনিরা, যারা একই সাথে বিয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রীবাদী, কাম ও বিয়ের মধ্যে সংহতিসাধনের জন্যে বহু গুণে বাড়িয়ে চলছে তাদের প্রচেষ্টা। দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে বেরোচ্ছে বিপুল সংখ্যক বই, যেগুলোর উদ্দেশ্য দম্পতিকে পরস্পরের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল শেখানো; বিশেষ করে পুরুষটিকে শেখানো কী করে সে স্ত্রীর সাথে স্থাপন করতে পারে একটা সুখকর সঙ্গতি। মনোবিশ্লেষকেরা ও চিকিৎসকেরা কাজ করছেন বিবাহ উপদেষ্টা রূপে; সাধারণভাবে তারা একমত যে নারীদের কামসুখের অধিকার আছে এবং পুরুষদের জানা দরকার যথোচিত কলাকৌশল। যদি তরুণটি বিশখানা বিবাহবিষয়ক সারগ্রন্থ মুখস্থও করে, তবুও তার পক্ষে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে নববধুকে সে শেখাতে পারবে তাকে ভালোবাসতে। নারীটি সাড়া দেয় সমগ্র মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতিতে। এবং প্রথাগত বিয়ের পক্ষে নারীর কাম জাগানো ও বিকশিত করার মতো অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি আদৌ সম্ভব নয়।
আগে, মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠিতে, বিয়ের সময় মেয়েটির কুমারীত্ব দাবি করা হতো না; এবং অতীন্দ্রিয় কারণে রীতি ছিলো যে বিয়ের আগে মেয়েটির সতীত্বমোচন ঘটাতে হবে। ফ্রান্সের কিছু পল্লী অঞ্চলে এ-প্রাচীন রীতি এখনো দেখা যায়; সেখানে বিবাহপূর্ব সতীত্ব চাওয়া হয় না; এবং এমনকি যারা ভুল পা ফেলেছে। অর্থাৎ, অবিবাহিত মায়েরা তারা অনেক সময় অন্যদের থেকে অনেক সহজে পায় স্বামী। অন্য দিকে এও সত্য যে-সব বৃত্ত নারীমুক্তি স্বীকার করে নিয়েছে, সেখানেও ছেলেদের মতোই যৌনস্বাধীনতা দেয়া হয় মেয়েদের। তবে পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতা আবশ্যিকভাবে দাবি করে কনেকে তার স্বামীর কাছে তুলে দিতে হবে কুমারী অবস্থায়; স্বামীটি নিশ্চিতহতে চায় যে নারীটি অন্য কারো বীজ বহন করছে না; যে-দেহটিকে সে নিজের করে নিচ্ছে, সে চায় তার একক ও একচেটিয়া মালিকানা; কুমারীত্ব পরিগ্রহ করেছে একটা নৈতিক, ধর্মীয়, ও অতীন্দ্রিয় মূল্য, এবং এ-মূল্য আজো সাধারণভাবে স্বীকৃত। ফ্রান্সে আছে কিছু এলাকা, যেখানে বরের বন্ধুরা অপেক্ষা করে থাকে বাসরঘরের দরোজার আড়ালে, তারা হাসাহাসি করতে থাকে, গান গাইতে থাকে যে-পর্যন্ত না স্বামীটি বিজয়োল্লাসে বেরিয়ে আসে রক্তভেজা বিছানার চাদর দেখানোর জন্যে; বা মা-বাবারা পরের দিন ভোরে সেটা দেখায় প্রতিবেশীদের। কিছুটা কম স্থূলভাবে বাসররাত্রির প্রথা খুবই ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
শুধু প্রহসন ও বিচিত্রানুষ্ঠানেই আমরা দেখতে পাই না যে বাসররাত্রিতে অপূর্ণ নববধু পালিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে মায়ের কাছে। মনোচিকিৎসার বইপত্রও এ-ধরনের কাহিনীতে পরিপূর্ণ; এবং আমার কাছেও বলা হয়েছে এমন কয়েকটি কাহিনী : ওই মেয়েদের খুবই যত্নের সাথে লালনপালন করা হয়েছিলো, এবং তাদের যেহেতু কোনো যৌনশিক্ষা দেয়া হয় নি, তাই হঠাৎ কাম আবিষ্কার তাদের সাধ্যাতীত হয়ে ওঠে। মেয়েরা অনেক সময় বিশ্বাস করেছে যে চুমো খাওয়াই হচ্ছে সম্পূর্ণ যৌনমিলন, এবং স্টেকল এক নববধুর কথা বলেছেন যে তার স্বামীকে পাগল মনে করেছিলো, যেহেতু স্বামীটি মধুচন্দ্রিমার সময় করেছিলো খুবই স্বাভাবিক আচরণ। কোনো মেয়ে এমনকি একটি নারী বিপর্যস্তকে বিয়ে করেও কোনো অস্বাভাবিকতা সম্বন্ধে সন্দেহ না করেই কয়েক বছর বাস করতে পারে তার সাথে।
অতিশয় উগ্রতা কুমারীকে ভীত করে, অতিশয় সশ্রদ্ধতা তাকে অবমানিত করে; নারীরা চিরকাল ঘৃণা করে সে পুরুষক, যে তাদের কষ্টের মূল্যে স্বার্থপরায়ণতার সাথে সুখ উপভোগ করে; কিন্তু তারা সে-সব পুরুষের প্রতি বোধ করে চিরন্তন ক্ষোভ, যারা তাদের অবজ্ঞা করেছে বলে মনে হয়, এবং প্রায়ই ক্ষোভ বোধ করে তাদের প্রতি, যারা প্রথম রাতেই তাদের সতীত্বমোচনের উদ্যোগ নেয় নি, বা ব্যর্থ হয়েছে। হেলেন ডয়েটশ কিছু স্বামীর উল্লেখ করেছেন, যারা শক্তি বা সাহসের অভাবে চিকিৎসক দিয়ে নববধুদের সতীত্বমোচন করা বেশি পছন্দ করেছে, তাদের অভিযোগ হচ্ছে যে তাদের সঙ্গিনীদের সতীচ্ছদ অস্বাভাবিকভাবে প্রতিরোধক, যা সাধারণত অসত্য। এসব ক্ষেত্রে, তিনি বলেন, যে-পুরুষটি স্বাভাবিক রীতিতে তাকে বিদ্ধ করতে পারে নি, তার প্রতি নারীটি বোধ করে এমন ঘৃণা, যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
