অর্থাৎ, একটি মনোনীত সঙ্গীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন নারীর কাজ নয়, তার কাজ হচ্ছে সাধারণভাবে নারীধর্মী ভূমিকাগুলো পালন করা; তাকে কামসুখ লাভ করতে হবে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট একটি রূপে সেটা ব্যক্তিগত স্বভাবের হবে না। তার কামনিয়তির আছে দুটি অপরিহার্য পরিণতি। প্রথমত, বিবাহবহির্ভূত কোনো যৌন কর্মকাণ্ডের অধিকার তার নেই; যৌনসঙ্গম এভাবে হয়ে ওঠে একটি সংস্থা, সমাজের স্বার্থের কাছে গৌণ হয়েওঠে দুটি লিঙ্গেরই কামনা ও পরিতৃপ্তি; তবে কর্মী ও নাগরিক হিশেবে পুরুষ যেহেতু সর্বজনীনতার দিকে প্রসারিত, তাই সে বিয়ের আগে ও বিয়ের বাইরে উপভোগ করতে পারে আকস্মিক প্রমোদ।
নারীর কামহতাশাবোধকে পুরুষেরা সুচিন্তিতভাবে মেনে নিয়েছে; প্রকৃতিই দায়ীএ-আশাবাদী দর্শন নির্ভর করে তারা সহজেই মেনে নিয়েছে নারীর দুঃখকষ্ট : এটা তার ভাগ্য; বাইবেলের অভিশাপ তাদের এ-সুবিধাজনক মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। গর্ভধারণের যন্ত্রণাদায়ক ভার–একটা ক্ষণিক ও অনিশ্চিত সুখের বিনিময়ে নারীর কাছে থেকে গুরুমূল্য আদায় করে নেয়া–বিষয় হয়েছে বহু অশালীন ঠাট্টাদ্রিপের। ‘পাঁচ মিনিটের সুখ : নয় মাসের কষ্ট’, এবং বেরোনোর থেকে এটা ঢোকে সহজেএটা এক কৌতুককর প্রতিতুলনা। তবে এ-দর্শনের ভেতরে আছে ধর্ষকাম। অনেক পুরুষ উপভোগ করে নারীর কষ্ট এবং ভাবতেই অস্বীকার করে যে এটা দূর করা দরকার। তাইবোঝা যায় তাদের সঙ্গিনীদের কামসুখ অস্বীকার করতে পুরুষেরা বিবেকের অস্বস্তিও বোধ করে না।
একথা খুবই সত্য যে স্বামীটি যদি জাগিয়ে তোলে নারীর কাম, সে তা জাগায় সর্বজনীন রূপে, কেননা তাকে একজন ব্যক্তি হিশেবে পছন্দ করে নেয়া হয় নি; তাই সে তার স্ত্রীকে প্রস্তুত করছে অন্যের বাহুর ভেতরে সুখখোজার জন্যে। মতেইন এর সাথে একমত, তবে তিনি একথা স্বীকার করে নেয়ার মতো সৎ যে পুরুষের পরিণামদর্শিতা নারীকে ফেলে দেয় এমন একটা পরিস্থিতিতে, যার জন্যে কোনো প্রশংসা মেলে না : ‘আমরা তাদের চাই স্বাস্থ্যবতী, তীব্র, সুডৌল, ও সতীরূপে, সব কিছু এক সাথে–অর্থাৎ, গরম ও ঠাণ্ডা উভয়ই’। প্রধো অনেকটা কম অকপট : তার মতে, বিয়ে থেকে প্রেম বর্জন করা হচ্ছে ‘ন্যায়নিষ্ঠা’র ব্যাপার; ‘সমস্ত প্রণয়ালাপ অশালীন, এমনকি যাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে বা যারা বিবাহিত, তাদের মধ্যেও; এটা গার্হস্থ্য শ্রদ্ধাবোধ, কর্মানুরাগ, ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্যে ধ্বংসাত্মক’।
তবে উনিশশতক ভরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ধারণাগুলো কিছুটা সংশোধিত হয়; একটা ব্যগ্র প্রচেষ্টা দেখা দেয় বিয়েকে সমর্থন ও সংরক্ষণের জন্যে; এবং, অন্য দিকে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের অগ্রগতির ফলে নারীর দাবি সহজেরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; সৎ-সিমো, ফুরিয়ের, জর্জ সাঁ, এবং সব বোম্যান্টিক প্রচণ্ডভাবে দাবি করেন প্রেমের অধিকার। প্রশ্নটি ওঠে বিয়ের সাথে ব্যক্তিগত আবেগ জড়ানো সম্বন্ধে, যা তখন পর্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বর্জন করা হয়েছে। এ-সময়ই উদ্ভাবন করা হয় ‘দাম্পত্য প্রেম’-এর সন্দেহজনক ধারণাটি, প্রথাগত সুবিধাজনক বিয়ের সে-অলৌকিক ফলটি। বালজাক প্রকাশ করেন রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমস্ত যুক্তিরহিত ধ্যানধারণাগুলো। তিনি স্বীকার করেন যে নীতিগতভাবে বিয়ে ও প্রেমের মধ্যে কোনো মিল নেই; তবে একটি শ্রদ্ধেয় সংস্থাকে একটা ব্যবসায়িক চুক্তির সাথে সমীকরণ করা, যাতে নারীকে গণ্য করা হয় বস্তু হিশেবে, তাঁর কাছে ঘৃণ্য মনে হয়। এভাবে তিনি পৌছেন তার ফিজিয়লজি দি মারিয়াজ-এর বিব্রতকর অসম্বন্ধতার, যাতে তিনি বলেন বিয়ে একটি চুক্তি, অধিকাংশ মানুষ যা সম্পন্ন করে সন্তানদের বৈধ করার জন্যে, এবং তাতে প্রেম একটা বাজেকথা, এবং তারপর বলতে থাকেন ‘আত্মার বিশুদ্ধ মিল’ আর ‘সুখ’-এর কথা, যা অর্জিত হয় মানুষের ‘সম্মান ও শালীনতার বিধিবিধান’ পালনের মাধ্যমে। ‘প্রকৃতির গোপন সূত্র, যা পুষ্পিত করে অনুভূতি’, তার প্রতি অনুগত থাকার জন্যে তিনি ডাক দেন, এবং প্রয়োজন বোধ করেন ‘আন্তরিক প্রেম’-এর, এবং দাবি করেন এভাবে চর্চা করলে স্ত্রীর প্রতি অনুরাগ চিরস্থায়ী হতে পারে।
বিয়ে ও প্রেমের মধ্যে বিরোধ মেটানো এমন এক তুর দ্য ফর্স, যা সফল হতে পারে শুধু স্বর্গীয় হস্তক্ষেপই; নানা চাতুর্যপূর্ণ উপায়ে এ-সমাধানেই পৌচেছিলেন। কিয়ের্কেগার্দ। তিনি বলেন, প্রেম স্বতস্ফূর্ত; বিয়ে একটি সিদ্ধান্ত; তবে সকাম আকর্ষণ জাগাতে হবে বিয়ের মাধ্যমে বা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একজন প্রকৃত স্বামী, তিনি বলেন, ‘এক অলৌকিক ব্যাপার’। আর স্ত্রীর কথা বলতে গেলে, যুক্তিশীলতা তার জন্যে নয়, সে ‘চিন্তাশূন্য’; ‘সে প্রেমের সদ্যতা থেকে চলে যায় ধর্মের সদ্যস্কতায়’। সরল ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে প্রেমে পড়েছে এমন একটি পুরুষ বিধাতায় বিশ্বাসবশত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, ওই সিদ্ধান্তেরই নিশ্চয়তা দেয়ার কথা। অনুভূতি ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে সঙ্গতিবিধানের; এবং কোনো নারী প্রেমে পড়লে সে বিয়ে করতে চায়। আমি এক সময় চিনতাম ক্যাথলিক বিশ্বাসের এক মহিলাকে, যে সরলভাবে বিশ্বাস করতো ‘স্বর্গীয় বজ্ৰকরতালি’তে; সে ঘোষণা করেছিলো যখন দম্পতিটি বেদির পাদমূলে দাঁড়িয়ে বলে চরম শেষকথাটি যে ‘আমি করি’, তখন তারা অনুভব করে যে তাদের হৃদয়ে অলৌকিকভাবে জ্বলে উঠেছে পারস্পরিক প্রেমের শিখা। কিয়ের্কেগার্দ পুরোপুরি স্বীকার করেন যে থাকতে হবে একটা পূর্ব-‘অনুরাগ’; তবে এটা যে সারাজীবন স্থায়ী হবে, তা কম অলৌকিক ব্যাপার নয়।
