এসব কারণে বহু কিশোরীই যেমন নতুন বিশ্বে তেমনি পুরোনোটিতে–যখন তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তারা আগের দিনের মতোই উত্তর দেয় : ‘আমি বিয়ে করতে চাই’। কিন্তু কোনো যুবকই বিয়েকে তার মূল লক্ষ্য মনে করে না। আর্থিক সাফল্যই তাকে দেবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মর্যাদা; এ-সাফল্যের মধ্যে বিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্যে। তবে এটা তাকে বিয়ে থেকে নিবৃত্তও করতে পারে। আধুনিক জীবনের অবস্থা–যা অতীত কালের থেকে কম সুস্থিত, অনেক বেশি অস্থির–যুবকের জন্যে বিয়ের শর্তগুলোকে বিশেষভাবে গুরুভার করে তোলে। অন্য দিকে এর উপকারিতা অনেক কমে গেছে, কেননা এখন তার পক্ষে আহার ও বাসস্থান পাওয়া অনেক বেশি সহজ এবং যৌনপরিতৃপ্তি সাধারণভাবে সুলভ। সন্দেহ নেই বিয়ে দিতে পারে কিছু বস্তুগত ও যৌন সুবিধা : এটি ব্যক্তিকে মুক্তি দেয় নিঃসঙ্গতা থেকে, তাকে গৃহ ও সন্তান দিয়ে নিরাপত্তার সাথে প্রতিষ্ঠিত করে স্থানে ও কালে; এটা তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত চরিতার্থতা। তবে মোটের ওপর পুরুষদের চাহিদা নারীদের সরবরাহের থেকে কম। বলা যেতে পারে পিতারা কন্যা দান করে না, বরং মুক্তি পায় কন্যার ভার থেকে; স্বামীর খোঁজে থাকা মেয়ে পুরুষের চাহিদা অনুসারে সাড়া দেয় না, সে চেষ্টা করে একটা চাহিদা সৃষ্টি করতে।
ফ্রান্সে ঠিক-করা বিয়ে আজো অতীতের ব্যাপার নয়; একটা বিশাল সুদৃঢ় বুর্জোয়া শ্ৰেণী আজো এটি টিকিয়ে রেখেছে। নেপলিয়নের সমাধির চারপাশে, অপেরায়, বলনাচে, সৈকতে, চায়ের নিমন্ত্রণে বিবাহার্থী তরুণীটি, তার প্রতিটি চুল ঠিক জায়গায় রেখে ও নতুন গাউন পরে, ভীরুতার সাথে প্রদর্শন করে তার দেহের সৌন্দর্য ও বি আলাপচারিতা; পিতামাতা তাকে বলতে থাকে। ‘নানাজনকে দেখে ইতিমধ্যেই তুমি আমার অনেক খরচ করিয়েছো; তুমি মন ঠিক করো। পরেরবার দেখানো হবে তোমার বোনকে’। অসুখী প্রার্থী বুঝতে পারে সে যতোই আইবড়ো হবে, ততোই। কমতে থাকবে তার সুযোগ; তাকে বিয়ে করার প্রার্থীর সংখ্যা কম : একপাল মেষের বিনিময়ে দান করা হয় যে-বেদুয়িন মেয়েটিকে, সে-মেয়েটির থেকে বেশি পছন্দের স্বাধীনতা তার নেই। কলেৎ এটা প্রকাশ করেছেন এভাবে : ‘যে-মেয়ের কোনো ধনসম্পত্তি নেই বা নেই অর্থকরী পেশা… সে পারে শুধু সুযোগ এলে মুখ বুজে সেটি ধরে ফেলতে এবং বিধাতাকে ধন্যবাদ দিতে!’
তবে বিয়ের বাসনা থাকা সত্ত্বেও মেয়েরা প্রায়ই ভয় পায় বিয়েকে। তার জন্যে বিয়ে অনেক বেশি উপকারি পুরুষটির থেকে, তাই পুরুষটির থেকে মেয়েটি বেশি আগ্রহী হয় বিয়ের প্রতি; তবে এটা তার জন্য অধিকতর আত্মবিসর্জনও, বিশেষ করে এ-কারণে যে এর ফলে অতীতের সাথে তার সম্পর্কই ছিন্ন হয় প্রচণ্ডভাবে। আমরা দেখেছি বহু তরুণী বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে; দিন যতই ঘনিয়ে আসে যন্ত্রণা ততোই বাড়তে থাকে। এ-সময়েই অনেকের মানসিক ব্যাধি দেখা দেয়; সে-যুবকেরা বেলাও একই ব্যাপার ঘটতে পারে, যে নতুন দায়িত্ব নিতে ভয় পায়; কিন্তু এটা অনেক বেশি ঘটে তরুণীদের ক্ষেত্রে, এটা ঘটার কারণ ইতিমধ্যেই আলোচিত হয়েছে তবে এ-সংকট মুহূর্তে ওই কারণগুলো হয়ে ওঠে গুরুভার।
অনেক সময় বিয়েভীতি উদ্ভব ঘটে আগের কোনো অবিস্মরণীয় দুঃখজনক যৌন অভিজ্ঞতা থেকে, এবং প্রায়ই দেখা দেয় যে তার কুমারীত্বহানির ব্যাপারটি ধরা পড়ে যাবে, এ-ভয় থেকে। তবে একটি অচেনা পুরুষের কাছে নিজেকে দান করার ভাবনা যে প্রায়ই দুর্বহ হয়ে ওঠে, তার কারণ হচ্ছে বাপের বাড়ি ও পরিবারের সাথে মেয়েটির নিবিড় সম্পর্ক। এবং যারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের অনেকে কেননা এটা এমন কাজ, যা করতেই হবে, কেননা তাদের ওপর চাপ দেয়া হয়, কেননা এটাই একমাত্র কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সমাধান, কেননা স্ত্রী ও মা হিশেবে তারা চায় একটি স্বাভাবিক জীবন–তবুও তাদের মধ্যে থাকে একটা গোপন ও গভীরে-প্রোথিত প্রতিরোধেরবোধ, যা বিবাহিত জীবনের শুরুর সময়টাকে কঠিন করে তোলে, যা সুখকর ভারসাম্য অর্জনে চিরকাল বাধা দিতে পারে।
বিয়ে, তাই, সাধারণত প্রেমের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফ্রয়েড এটা প্রকাশ করেছেন এভাবে : ‘স্বামীটি, বলতে গেলে, কখনোই প্রিয় পুরুষটির বিকল্প ছাড়া আর কিছু নয়, সে নিজে ওই পুরুষটি নয়’। এবং এ-পৃথকীকরণ কোনোভাবেই আকস্মিক ব্যাপার নয়। এ-প্রথার বিশেষ প্রকৃতির মধ্যে এটা দ্যোতিত রয়েছে, যার লক্ষ্য পুরুষ ও নারীর আর্থিক ও যৌন মিলনের ফলে সমাজের স্বার্থ রক্ষা, তাদের ব্যক্তিগত সুখ নিশ্চিত করা নয়। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমন আজো কিছু মুসলমানের মধ্যে এমন হতে পারে যে পিতামাতারা যাদের বিয়ে ঠিক করেছে বিয়ের দিনের আগে তারা এমনকি পরস্পরের মুখও দেখে নি। সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবালুতা বা কামজকল্পনা ভিত্তি করে একটা আজীবনের কর্মোদ্যোগ গ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না।
যেহেতু পুরুষটিই ‘গ্রহণ করে’ নারীটিকে, তাই তার পছন্দ-অপছন্দ করার কিছুটা বেশি সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে যখন পাত্রীরা সংখ্যায় অজস্র। কিন্তু যৌনকর্মকে যেহেতু নারীর ওপর ন্যস্ত একটি সেবামূলক দায়িত্ব বলে গণ্য করা হয়, যার ভিত্তিতে তাকে দেয়া হয় সুযোগসুবিধা, তাই এটা যুক্তিসঙ্গত যে সে উপেক্ষা করবে তার ব্যক্তিগত বিশেষ অনুরাগগুলো। বিয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ হিশেবে নারীর স্বাধীনতা অস্বীকার করা; কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া যেহেতু প্রেমও থাকতে পারে না ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যও থাকতে পারে না, তাই নিজের জন্যে আজীবন কোনো একটি পুরুষের রক্ষণাবেক্ষণ লাভের ব্যাপারটি নিশ্চিত করার জন্যে তাকে ছেড়ে দিতে হয় একটি বিশেষ ব্যক্তিকে ভালোবাসা। আমি এক পরিবারের এক ধার্মিক মাতাকে তার কন্যাদের বলতে শুনেছি প্রেম হচ্ছে পুরুষদের একটা স্কুল আবেগ এবং সাধ্বী নারীদের কাছে এটা অজানা। নারীর সম্পর্কগুলো তার ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে সর্বজনীন অনুভূতির ভিত্তিতে; তাই তার পক্ষে পুরুষের মতো প্রাতিস্বিক কামনা পোষণ করা হচ্ছে তার জীবনবিধানকে দূষিত করা।
