তাই উভয় পক্ষের জন্যেই বিয়ে একই সময়ে ভার ও সুবিধা; কিন্তু দুটি লিঙ্গের পরিস্থিতির মধ্যে কোনো প্রতিসাম্য নেই; মেয়েদের সমাজে বিন্যস্ত হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে বিয়ে, এবং যদি তারা থাকে অবাঞ্ছিত, তাহলে সামাজিকভাবে তাদের গণ্য করা হয় অপচয় বলে। এজন্যেই মায়েরা মেয়েদের বিয়ে দেয়ার জন্যে সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকে। গত শতকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে বিয়ের ব্যাপারে নারীদের সঙ্গে আদৌ কোনো আলাপ করা হতোনা।
এমন পরিস্থিতিতে মেয়েটি থাকে চূড়ান্তভাবে অক্রিয়; তাকে বিয়ে দেয়া হয়, পিতামাতারা তার বিয়ে দেয়। ছেলেরা বিয়ে করে, তারা পত্নী গ্রহণ করে। বিয়ের। মধ্যে তারা চায় বৃদ্ধি, তাদের অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপাদন, শুধু টিকে থাকার অধিকার নয়; এটা একটি দায়িত্ব, যা তারা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে।
বিয়ে বসে নারী নিজের বলে কিছুটা ভাগ পায় বিশ্বের; আইনগত অঙ্গীকার তাকে রক্ষা করে পুরুষের খামখেয়ালি কাজ থেকে; তবে সে হয়ে ওঠে পুরুষের ক্রীতদাসী। পুরুষটি এ-যৌথ উদ্যোগের আর্থনীতিক প্রধান; এবং এর পর থেকে সমাজের চোখে পুরুষটিই এ-উদ্যোগের প্রতিনিধিত্ব করে। নারীটি গ্রহণ করে পুরুষটির নাম; নারীটি অন্তর্ভুক্ত হয় পুরুষটির ধর্মে, তার শ্রেণীতে, তার সমাজে নারীটি যোগ দেয় পুরুষটির পরিবারে, নারীটি হয়েওঠে পুরুষটির ‘অর্ধেক’। পুরুষটি তার কাজের জন্যে যেখানে যায়, নারীটি সেখানে অনুসরণ করে তাকে এবং পুরুষটিই ঠিক করে তাদের বাসস্থান; নারীটি কম-বেশি চূড়ান্তভাবে ছিন্ন করে অতীতের সাথে সম্পর্ক, সে তার স্বামীর জগতের অন্তর্ভুক্ত হয়; নারীটি পুরুষটিকে দেয় তার দেহ, কুমারীত্ব এবং তাকে পালন করতে হয় কঠোর সতীত্ব। অবিবাহিত নারী আইনগতভাবে যা-কিছু অধিকার পায়, সে তা হারিয়ে ফেলে। রোমান আইন স্বামীর হাতে স্ত্রীকে ন্যস্ত করেছে লোকো ফিলিয়ায়ে, কন্যার স্থানে; উনিশ শতকের শুরুর দিকে রক্ষণশীল লেখক ঝের্নী ঘোষণা করেছিলেন শিশু যেমন মায়ের কাছে তেমনি স্ত্রী তার স্বামীর কাছে, ১৯৪২-এর আগে পর্যন্ত ফরাশি আইন দাবি করতে যে স্ত্রীকে হতে হবে স্বামীর অনুগত; আইন ও প্রথা আজো স্বামীকে দেয় মহাকর্তৃত্ব।
স্বামীটিই যেহেতু উৎপাদনশীল কর্মী, তাই সে-ই পারিবারিক স্বার্থ পেরিয়ে ঢেকে সমাজের স্বার্থে, সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথ ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য উন্মুক্ত করে নিজের জন্যে একটি ভবিষ্যৎ; সে হয় সীমাতিক্রমণতার প্রতিমূর্তি। নারী নষ্ট হয় প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার এবং গৃহস্থালির কাজে- অর্থাৎ বলা যায়, সীমাবদ্ধতায়।
বিয়েতে আজো অনেকাংশে টিকে আছে এ-প্রথাগত রূপ। প্রথমত, যুবকের থেকে অনেক বেশি স্বৈরাচারিতার সাথে এটা চাপিয়ে দেয়া হয় যুবতীর ওপর। সমাজে আজো আছে অনেক গুরিত্বপূর্ণ স্তর, যেগুলোতে তরুণীর জন্যে আর কোনো ঘটনাপরম্পরা খোল নেই; পল্লীর শ্রমিকদের মধ্যে অবিবাহিত নারী এক অস্পৃশ্য ব্রাত্য মানুষ; সে হয়ে থাকে তার পিতার, বা তার ভাইদের, বা তার দুলাভাইয়ের দাসী; যারা নগরে চলে যায়, সে তাদের সঙ্গে যেতে পারে না; বিয়ে তাকে একটি পুরুষের দাসী করে তোলে, তবে এটা তাকে একটা গৃহের গৃহিণীও করে। মধ্যবিত্ত সমাজের কিছু কিছু বৃত্তে তরুণী আজো নিজের জীবিকা অর্জনে অসমর্থ; সে পারে শুধু তার বাপের বাড়িতে একটা পরগাছা হয়ে থাকতে বা কোনো অচেনা মানুষের বাড়িতে নিতে পারে কায়িক শ্রমের কাজ। এমনকি যখন সে অনেকটা মুক্তও, তখনও পুরুষের আর্থিক সুবিধার কারণে সে কোনো কাজ করার থেকে বিয়েকেই বেশি পছন্দ করে : সে এমন একটি স্বামী খোঁজে, যে মর্যাদায় তার থেকে ওপরে বা যে তার থেকে দ্রুত বা বেশি সাফল্য লাভ করবে বলে সে আশা করে।
এখনো মেনে নেয়া হয় যে কামের ব্যাপারটি হচ্ছে, আমরা দেখেছি, পুরুষের প্রতি একটি সেবামূলক কর্ম; পুরুষ সম্ভোগ করে এবং নারীকে কিছুটা অর্থ পরিশোধ করে। নারীর দেহ একটা জিনিশ, যা সে ক্রয় করে নারীর কাছে পুরুষটি হচ্ছে পুঁজি, যা সে শশাষণ করতে পারে। অনেক সময় নারীটি পণ নিয়ে আসতে পারে; বা প্রায়ই নারীটি দায়িত্ব নেয় কিছু গৃহস্থালির কাজের : ঘর দেখাশোনার, সন্তান লালনপালনের। তা যাই হোক, তার ভরণপোষণ লাভের অধিকার আছে এবং প্রথাগত নৈতিকতা এরই বিধান দেয়। স্বাভাবিকভাবেই সে প্ররোচিত হয় এ-সহজ উপায় দিয়ে, আরো অনেক বেশি প্ররোচিত হয় এ-কারণে যে নারীর জন্যে যে-সব পেশা খোলা আছে, সেগুলো অনুপযোগী ও সেগুলোতে বেতন খুবই কম; বিয়ে, এককথায়, আর সমস্ত থেকে অনেক বেশি সুবিধাজনক পেশা।
সামাজিক প্রথা অবিবাহিত নারীর যৌন স্বাধীনতা অর্জনকে আরো কঠিন করে তোলে। ফ্রান্সে স্ত্রীর ব্যভিচারকে, আজ পর্যন্ত, গণ্য করা হয় আইনগত অপরাধ বলে, কিন্তু নারীর অবাধ যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করে কোনোআইন নেই; তবুও অবিবাহিত নারী যদি প্রেমিক নিতে চায়, তাহলে প্রথমে তাকে বিয়ে বসতে হয়। এমনকি আজো অনেক সঠিক-আচরণশীল মধ্যবিত্ত তরুণী বিয়ে বসে ‘শুধু স্বাধীন হওয়ার জন্যে’। বেশ কিছু মার্কিন তরুণী যৌন স্বাধীনতা লাভ করেছে; তবে সাদের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অনেকটা ম্যালিনোস্কির দি সেক্সুয়াল লাইফ অফ দি সাভেজেজ-এ বর্ণিত তরুণীদের মতো, যারা ‘অবিবাহিত পুরুষদের গৃহ’-এ চর্চা করে অকিঞ্চিৎকর শৃঙ্গার : বোঝা যায় তারা পরে বিয়ে করবে যখন প্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য হবে। আমেরিকায় কোনো একলা নারী নিজের জীবিকা নিজে উপার্জন করলেও সে একটি অসম্পূর্ণ সত্তা; যদি সে একজন মানুষের সম্পূর্ণ মর্যাদা অর্জন করতে চায় এবং লাভ করতে চায় তার পূর্ণ-অধিকার, তাকে পরতে হবে একটি বিয়ের আংটি। মাতৃত্ব সম্মানজনক শুধু বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রেই; অবিবাহিত মা জনমতের কাছে এক অপরাধী, এবং সারাজীবন তার শিশু তার জন্যে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা।
