সত্য হচ্ছে সমকামিতা যতোটা ভাগ্যের অভিশাপ ততোটা স্বেচ্ছাকৃত বিকৃতি নয়। এটা এক বিশেষ পরিস্থিতিতে পছন্দ করা মনোভাব–অর্থাৎ, এটা একই সময়ে। প্রণোদিত ও স্বাধীনভাবে গৃহীত। এ-পছন্দকরণের সাথে জড়িত যে-সব ব্যাপার, সেগুলোর কোনোটিই–শারীরবৃত্তিক অবস্থা, মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস, সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান নয়, যদিও সবগুলোই এর ব্যাখ্যার জন্যে দরকার। নারীর পরিস্থিতি সাধারণভাবে যে-সমস্যা সৃষ্টি করে, এবং তার যৌন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যেবিশেষ সমস্যা, এটা তার সমাধানের অন্যতম উপায়। সমস্তু মানবিক আচরণের মতোই সমকামিতা নিয়ে যায় ভান, ভারসাম্যহীনতা, হতাশা, মিথ্যাচারের দিকে, বা উল্টোভাবে, এটা হয়ে ওঠে মূল্যবান অভিজ্ঞতাপুঞ্জের উৎস।
বিবাহিত নারী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৫ –পরিস্থিতি। পরিচ্ছেদ ১
সমাজের দেয়া নারীর প্রথাগত নিয়তি হচ্ছে বিয়ে। এতা এখনো সত্য যে অধিকাংশ নারীই বিবাহিত, বা বিবাহিত ছিলো, বা বিয়ের পরিকল্পনা করছে, বা বিয়ে না হওয়ায় কষ্ট পাচ্ছে। কুমারীব্রতী নারীদের ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করতে হয় বিয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে, সে কি নিরাশ, না কি বিদ্রোহী, না কি ওই প্রথার প্রতি উদাসীন। আমাদের তাই বিয়ে বিশ্লেষণ করেই এ-বিষয়ে অগ্রসর হতে হবে।
নারীর পরিস্থিতিতে যে-আর্থনীতিক বিবর্তন ঘটছে, তাতে বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে বিবাহপ্রথা : এটা হয়ে উঠছে দুটি স্বাধীন মানুষের নিজেদের সানন্দ সম্মতিতে উপনীত মিলন; চুক্তিকারী দু-পক্ষের বাধ্যবাধকতা ব্যক্তিগত ও পারস্পরিক; ব্যভিচার উভয়ের জন্যেই একটা চুক্তিভঙ্গ, একই কারণে একজন বা অপরজন বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। নারী আর প্রজননের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নয়, যা তার প্রাকৃতিক দাসীতুের চরিত্র অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন প্রজনন গণ্য হচ্ছে একটি স্বেচ্ছাপালিত ভূমিকা হিশেবে; এবং এটি উৎপাদনশীল শ্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, কেননা, অনেক ক্ষেত্রে, গর্ভধারণের জন্যে মা যে-সময়টা অবকাশ হিশেবে নেয়, তার ব্যয় বহন করে রাষ্ট্র বা নিয়োগকারী। তবুও আমরা বাস করছি যে-পর্বে, নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি। একটি ক্রান্তিকাল। নারীজনসংখ্যার একটি অংশমাত্র নিয়োজিত উৎপাদনে, এবং এমনকি যারা নিয়োজিত, তারা অন্তর্ভুক্ত এমন সমাজের, যাতে প্রাচীন রীতিনীতি ও প্রাচীন কালের মূল্যবোেধ আজো টিকে আছে। আধুনিক বিয়েকে বোঝা যাবে শুধু। অতীতের আলোকে, যা নিজেকে স্থায়ী করতে চায়।
বিয়ে সব সময়ই নারী ও পুরুষের জন্যে খুবই ভিন্ন জিনিশ। দুটি লিঙ্গ পরস্পরের কাছে প্রয়োজনীয়, কিন্তু এ-প্রয়োজন তাদের মধ্যে কখনোই পারস্পরিকতার অবস্থা সৃষ্টি করে নি; আমরা দেখেছি যে নারী কখনোই এমন একটি জাত হয়ে ওঠে নি, যারা সমান অবস্থানে থেকে পুরুষজাতের সাথে দেয়ানেয়া বা চুক্তি করেছে। পুরুষ। সামাজিকভাবে এক স্বাধীন ও পরিপূর্ণ মানুষ; সর্বপ্রথম তাকে গণ্য করা হয় একজন উৎপাদনকারীরূপে, গোত্রের জন্য সে যে-কাজ করে, যা দিয়ে প্রতিপন্ন হয় তার অস্তিত্বের যাথার্থ : আমরা দেখেছি প্রজননের ও গৃহস্থালির যে-ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে নারীকে, সেটা কেননা তাকে সমমর্যাদার নিশ্চয়তা দেয় নি। নারী, দাসী বা। প্রজা হিশেবে, বিন্যস্ত হয়েছে পরিবারের মধ্যে, যাতে আধিপত্য করে পিতারা বা ভ্রাতারা, এবং তাকে সব সময়ই কোনো পুরুষ বিয়ে দিয়েছে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে। আদিম সমাজে পিতার গোত্র বস্তুর মতোই বর্জন করতে নারীদের : দু-গোত্রের চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হতো নারী। বিবর্তনের ফলে বিয়ে যখন চুক্তির রূপ নেয়, তখনও পরিস্থিতির বিশেষ বদল ঘটে নি। দীর্ঘকাল ধরে চুক্তি সম্পন্ন হয় শ্বশুর ও জামাতার, মধ্যে, স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে নয়; একমাত্র বিধবাই তখন ভোগ করতো আর্থস্বাধীনতা। তরুণীর পছন্দের স্বাধীনতা সব সময়ই ছিলো খুবই সীমিত; আর কুমারীত্ৰত–এটা যখন পবিত্ররূপ ধারণ করতো, সেগুলো ছাড়া তাকে পরিণত করতে পরগাছা ও অস্পৃশ্য সমাজচ্যুত মানুষে; বিয়েই তার ভরণপোষণের ও তার অস্তিত্বের যাথার্থ্য প্রতিপাদনের একমাত্র উপায়। দু-কারণে তার ওপর দেয়া হতো এ-আদেশ।
প্রথম কারণ হচ্ছে সমাজকে নারীর দিতে হবে সন্তান, খুব কম সময়ই–যেমন স্পার্টায় ও কিছুটা নাটশিদের শাসনকালে রাষ্ট্র নারীকে সরাসরি নিয়েছে নিজের অভিভাবকত্বে এবং তার কাছে চেয়েছে সে শুধু হবে মা। কিন্তু এমনকি আদিম সমাজগুলোও, যারা জানতো না প্রজননে পিতার ভূমিকা, তারাও দাবি করতো নারীর থাকতে হবে একটি স্বামী, এবং দ্বিতীয় যে কারণে নারীর ওপর বিয়ের আদেশ দেয়া হয়, তা হচ্ছে পুরুষের কামক্ষুধা মেটানা এবং ঘরকন্নাও নারীর দায়িত্ব। সমাজ কর্তৃক নারীর ওপর অর্পিত এসব দায়িত্বকে ধরা হয় তার স্বামীর প্রতি সেবাকর্ম বলে : বিনিময়ে পুরুষটির নারীকে দিতে হবে উপহার, বা তাকে বিয়ে করতে হবে, এবং তার ভরণপোষণ করতে ভাবে। পুরুষের বহুবিবাহ সব সময়ই কম-বেশি অনুমোদন করা হয়েছে : পুরুষ সঙ্গম করতে পারে দাসী, উপপত্নী, রক্ষিতা, বেশ্যার সঙ্গে, কিন্তু তার বৈধ স্ত্রীর কিছু অধিকার তাকে মেনে নিতে হয়। যদি পীড়ন করা হয় স্ত্রীকে বা অন্যায় করা হয় তার প্রতি, তাহলে স্ত্রীর অধিকার আছে–কম-বেশি স্পষ্টভাবে যার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। নিজের পরিবারে ফিরে যাওয়ার এবং পৃথক বাসের বা বিবাহবিচ্ছেদ লাভের।
