তবে আত্মরতি–মায়ের প্রতি সংবন্ধনের মতোই সব সময় সমকামিতার দিকে নিয়ে যায় না, উদাহরণস্বরূপ, এটা যেমন প্রমাণ হয়েছে মারি বাশকির্তসেভের বেলা, যাঁর লেখায় নারীর প্রতি প্রীতির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। তিনি ইন্দ্রিয়কাতর ছিলেন না, ছিলেন বুদ্ধিপ্রধান, এবং ছিলেন চরম আত্মভিমানী, বাল্যকাল থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেছেন যে পুরুষেরা তাঁকে দেবে উচ্চমর্যাদা; তিনি শুধু তার প্রতিই আগ্রহী ছিলেন, যা বাড়াতে পারে তার গৌরব। যে নারী দেবতারূপে পুজো করে শুধু নিজেকে এবং যার লক্ষ্য সাধারণভাবে সাফল্য, সে অন্য নারীর প্রতি উষ্ণ অনুরাগ পোষণ করতে ব্যর্থ হয়; সে তাদের মধ্যে দেখতে পায় শুধু শক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বী।
সত্য হচ্ছে নিয়ন্ত্রণকারী হেতু কখনোই মাত্র একটি নয়; সব সময়ই এটা এক পছন্দের ব্যাপার, যাতে পৌছোতে হয় একটা জটিল সামগ্রিক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে, এবং একটা স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে; কোনো যৌন নিয়তি নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন বরং তার কামের ধরন জীবন সম্পর্কে তার সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।
তবে পছন্দের ওপর থাকে পারিবেশিক পরিস্থিতির বিশেষ প্রভাব। আজ দুটি লিঙ্গ সাধারণত যাপন করে বিচ্ছিন্ন জীবন : মেয়েদের আবাসিক বিদ্যালয়ে ও শিক্ষাআশ্রমে দ্রুত ঘটে অন্তরঙ্গতা থেকে যৌনতা; যে-সব পরিবেশে ছেলেমেয়েদের সংসর্গের ফলে বিষমকামী অভিজ্ঞতার সুযোগ বেশি, সেখানে নারীসমকামীর সংখ্যা অনেক কম। বহু নারী, যারা কারখানায় ও অফিসে নারীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে কাজ করে, যারা পুরুষ দেখতে পায় খুবই কম, তারা কামনাপূর্ণ বন্ধুত্ব গড়ে তোলে নারীদের সাথেই : তারা দেখতে পায় যে নিজেদের জীবন জড়িয়ে ফেলা তাদের জন্যে বস্তুগত ও নৈতিকভাবে সহজ। বিষমকামী সম্পর্কের অভাবে বা ওটা লাভ কঠিন হলে তারা বাধ্য হয় বিপর্যস্ত হতে। হাল-ছাড়া-ভাব ও অনুরাগের মধ্যে সীমারেখা টানা কঠিন : পুরুষ তাকে নিরাশ করেছে বলে কোনো নারী অন্য নারীদের প্রতি অনুরক্ত হতে পারে, তবে অনেক সময়ই পুরুষ তাকে নিরাশ করেছে এজন্যে যে পুরুষের মধ্যে সে আসলে খুঁজেছিলো নারী।
এসব কারণে সমকামী ও বিষমকামী নারীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা ভুল। যখন একবার পার হয়ে যায় কৈশোরের অনিশ্চিত সময়, স্বাভাবিক পুরুষ নিজেকে আর সমকামী প্রমোদ আহরণ করতে দেয় না, কিন্তু স্বাভাবিক নারী প্রায়ই ফিরে আসে সেই প্রেমে–প্লাতোয়ী বা অপ্লাতোয়ী–যা মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলো তার যৌবনকে। পুরুষ তাকে হতাশ করেছে বলে নারীর মধ্যে সে খুঁজতে পারে এমন একটি প্রেমিককে, যে স্থান নেবে সে-পুরুষের, যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সাথে। নারীর জীবনে নিষিদ্ধ সুখ প্রায়ই যে সান্ত্বনার কাজ করে, কলেৎ তা নির্দেশ করেছেন তার ভাগাবদ-এ : কিছু নারী তাদের সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দেয় এমন সান্তনায়।
অন্য দিকে, যে-নারী তার নারীত্ব উপভোগ করতে চায় নারীর বাহুবন্ধনে, সে গর্ববোধ করতে পারে যে সে কোনো প্রভুর আদেশ মানছে না। রেনি ভিভিয়েন ভীষণ ভালোবাসতেন নারীর সৌন্দর্য, এবং তিনি রূপসী হতে চাইতেন; তিনি নিজেকে সাজাতেন, গর্ববোধ করতেন নিজের দীর্ঘ চুলের; কিন্তু সুখ পেতেন স্বাধীন থাকতে, রক্ষণীয় থাকতে। তাঁর কবিতায় তিনি তিরস্কার করেছেন সে-সব নারীকে, যারা বিয়ের মাধ্যমে পুরুষের দাসী হতে রাজি হয়। কড়া পানীয়র প্রতি তাঁর অনুরাগ, কখনোকখনো তার অশ্লীল ভাষা প্রদর্শন করে তাঁর পৌরুষকামনা। অধিকাংশ যুগলেই প্রণয়স্পর্শ পারস্পরিক। তাই দুজন সঙ্গীর বিশেষ ভূমিকা কোনোক্রমেই সুনির্দিষ্টভাবে সুস্থিত নয় : শিশুসুলভ প্রকৃতির নারীটি ভুমিকা নিতে পারে সদ্যযৌবনপ্রাপ্ত যুবকের, যে জড়িত আছে একজন নিরাপত্তাদাত্রী মাতৃর সাথে বা ভূমিকা নিতে পারে প্রেমিকের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ কোনো দয়িতার। তারা তাদের প্রেম উপভোগ করতে পারে সমান অবস্থানে থেকে। সঙ্গীরা যেহেতু সদৃশ, মূলত একই রকম, তাই সম্ভব সব ধরনের সমবায়, স্থানবিন্যাস, বিনিময়, রঙ্গ। দু-বন্ধুর প্রত্যেকের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুসারে তাদের সম্পর্ক হয়ে ওঠে ভারসাম্যপূর্ণ। যদি তাদের একজন অপরকে সাহায্য ও ভরণপোষণ করে, সে নেয় পুরুষের ভূমিকা : স্বৈরাচারী রক্ষক, শোষিত ছলনাকারী, শ্রদ্ধেয় প্রভু ও মনিব, এবং কখনো কখনো বেশ্যার দালালের; নৈতিক, সামাজিক বা মননগত শ্রেষ্ঠত্ব তাকে দিতে পারে কর্তৃত্ব।
তবে এমন দৃষ্টান্ত বেশ দুর্লভ। অধিকাংশ নারীসমকামীই, যেমন আমরা দেখেছি, বাকসংযমের সাথে পুরুষদের এড়িয়ে চলে : কামশীতল নারীদের মতো তাদের। মধ্যেও আছে একটা বিরক্তি, ভীরুতা, গর্বের বোধ; তারা নিজেদের পুরুষের সমকক্ষ বলে বোধ করে না; তাদের নারীসুলভ বিরক্তির সাথে যুক্ত হয় একটা পুরুষসুলভ হীনম্মন্যতাবোধ; পুরুষেরা এমন প্রতিপক্ষ, যারা পটিয়ে সম্ভোগের, অধিকারের, ও তাদের শিকারকে কবলে রাখার জন্যে উৎকৃষ্টতর রূপে সজ্জিত; পুরুষ নারীকে যেভাবে দূষিত করে, তা তারা অপছন্দ করে। পুরুষ পাচ্ছে সামাজিক সুযোগসুবিধা, এটা দেখে এবং পুরুষ তাদের থেকে শক্তিশালী, এটা অনুভব করেও তারা ক্রুদ্ধ হয় : প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করতে না পারা, এটা জানা যে সে তোমাকে এক মুষ্টাঘাতে ধরাশায়ী করতে পারে, এটা জ্বালা দেয়ার মতো অবমাননা। এ-জটিল শত্রুতার কারণেই কিছু নারীসমকামী নিজেদের করে তোলে দৃষ্টিআকর্ষক; তারা একসঙ্গে জড়ো হয়; সামাজিকভাবে ও কামে তাদের কোনো দরকার নেই পুরুষের, এটা দেখানোর জন্যে তারা গড়ে তোলে এক ধরনের সংঘ। এ থেকে শূন্যগর্ভ বড়াই ও অভিনয়ের স্তরে নেমে যাওয়া সহজ, যা উৎসারিত হয় আন্তরিকতাহীনতা থেকে। নারীসমকামী প্রথমে অভিনয় করে যে সে পুরুষ; তারপর নারীসমকামী হওয়ায় সে পরিণত হয় একটা শিকারে; পুরুষের পোশাক, প্রথমে যা ছিলো একটি ছদ্মবেশ, তা পরে হয়ে ওঠে উদি; এবং পুরুষের পীড়ন এড়ানোর নামে সে দাসী হয়ে ওঠে সেচরিত্রটির, যেটির সে অভিনয় করে; নারীর পরিস্থিতিতে বন্দী থাকতে না চেয়ে সে বন্দী হয়ে পড়েনারীসমকামীর পরিস্থিতিতে।
