নারী চিত্রকর ও লেখকদের অনেকেই সমকামী। ব্যাপারটি এমন নয় যে তাদের যৌন-বিশিষ্টতা তাদের সৃষ্টিশীল শক্তির উৎস বা এ নয় যে এটা নির্দেশ করে শ্রেষ্ঠতর ধরনের শক্তি; বরং ব্যাপারটি হচ্ছে তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজে মগ্ন বলে তারা একটা নারীধর্মী ভূমিকা পালন করে বা পুরুষের সাথে লড়াই করে সময় নষ্ট করতে চায়। পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করে তারা একে মেনে নেয়ার ভান করতে চায় না বা নিজেদের ক্লান্ত করতে চায় না প্রতিবাদ করে। তারা কামসুখের মধ্যে চায় শমন, প্রশমিতকরণ, ও বিনোদন : তারা এড়িয়ে চলে এমন সাথী, যে দেখা দেয় প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে; এবং এভাবে তারা নিজেদের মুক্ত রাখে নারীত্বের মধ্যে দ্যোতিত বেড়ি থেকে।
তবে নারীটি যদি হয় আধিপত্যধর্মী ব্যক্তিত্বের, তাহলে তার কাছে সমকামিতাকে সব সময় পুরোপুরি সন্তোষজনক সমাধান বলে মনে হয় না। সে যেহেতু চায়আত্মপ্রতিষ্ঠা, তাই তার নারীধর্মী সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না করা তার কাছে অসন্তোষজনক মনে হয়; বিষমকামী সম্পর্ককে তার একই সঙ্গে মনে হয় হীনকর ও সমৃদ্ধিকর; তার লিঙ্গের মধ্যে দ্যোতিত রয়েছে যে-সীমাবদ্ধতা, তা অস্বীকার করে তার মনে হয় সে নিজেকে সীমিত করছে অন্যভাবে। ঠিক যেমন কামশীতল নারী চায়কামসুখ যখন সে তা প্রত্যাখ্যান করে, ঠিক তেমনি নারীসমকামীও চাইতে পারে স্বাভাবিক ও পরিপূর্ণ নারী হতে, যদিও সে অমন না হওয়াই পছন্দ করে।
নারীসমকামী সানন্দে মেনে নিতে পারে তার নারীত্বের ক্ষতি, যদি এটা করে সে লাভ করে এক সফল পুরুষত্ব; যদিও কৃত্রিম উপায়ে সে দয়িতার সতীত্বমোচন করতে পারে ও তাকে অধিকার করতে পারে, তবুও সে খোজা ছাড়া আর কিছু নয়, এবং এবোধ থেকে সে পেতে পারে নিদারুণ কষ্ট। সে নারী হিশেবে অপরিপূর্ণ, পুরুষরূপে নপুংসক, এবং তার ব্যাধি পরিণত হতে পারে মনোবৈকল্যে। দালবিজকে এক রোগী বলেছিলো : ‘যদি বিদ্ধকরণের জন্যে আমার একটা কিছু থাকতো, তাহলে অনেক ভালো হতো’। আরেকজন চেয়েছিলো তার স্তন শক্ত হোক। নারীসমকামী প্রায়ই তার পুরুষত্বের নিকৃষ্টতার ক্ষতিপূরণ করতে চায় ঔদ্ধত্য দিয়ে, দেপ্রদর্শন করে, যা দিয়ে সে অস্বীকার করে একটা আন্তর ভারসাম্যহীনতাকে।
এর ওপর জোর দেয়া অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ যে নিজেকে বস্তুতে পরিণত করতে অস্বীকার সব সময় নারীকে সমকামিতার দিকে নিয়ে যায় না; উল্টোভাবে, অধিকাংশ নারীসমকামী চর্চা করতে চায় তাদের নারীত্বের সম্পদগুলোর। একটি অক্রিয় বস্তুতে পরিণত হতে ইচ্ছুক হওয়া ব্যক্তিতার সব দাবি অস্বীকার করা নয় : নিজেকে বস্তুর গুণবিশিষ্ট করে এভাবে নারী পোষণ করে করে তার আত্মসিদ্ধির আশা; তবে তখন সে নিজেকে লাভ করতে চেষ্টা করবে নিজের অপরত্বের মধ্যে, তার বিকল্প সত্তার মধ্যে। যখন সে একলা, তখন সে সত্যিই তার ডবল সৃষ্টি করতে সফল হয় না; যদি সে মর্দন করে নিজের স্তন, তবুও সে জানে না একটা অচেনা হাতের কাছে তার স্তন কেমন লাগতো, এও জানে না একটি অচেনা হাতের ছোঁয়ায় কেমন লাগতো তার স্তনের; একটি পুরুষ তার কাছে তার জন্যে প্রকাশ করতে পারে তার মাংসের অস্তিত্ব অর্থাৎ, সে নিজে তার দেহটিকে যেভাবে বোধ করে, সেভাবে, এটা অন্যদের কাছে যেমন, সেভাবে নয়। শুধু যখন তার আঙুল ধীরেধীরে চলে অন্য কোনো নারীর শরীরে এবং অন্য নারীর আঙুল ধীরেধীরে চলে তার শরীরে, তখনই সম্পন্ন হয় দর্পণের। অলৌকিক কাণ্ড। পুরুষ ও নারীর মধ্যে প্রেম একটি কর্ম; এতে প্রত্যেকে অপর হয়ে ওঠে নিজের থেকে ছিন্ন হয়ে। নারীদের মধ্যে প্রেম ধ্যানমগ্নতা; এ-প্রণয়স্পর্শের লক্ষ্য অন্যকে অধিকার করা নয়, এর লক্ষ্য ধীরেধীরে অন্যের মধ্য দিয়ে নিজেকে পুনর্মুষ্টি করা; লুপ্ত হয়ে যায় বিচ্ছিন্নতা, কোনো সগ্রাম নেই, জয় নেই, পরাজয় নেই; যথাযথ পারস্পরিকতায় একই সময়ে প্রত্যেকেই কর্তা ও কর্ম, প্রভু ও দাস; দ্বৈততা হয়ে ওঠে পারস্পরিকতা।
এ-প্রতিবিম্বন নিতে পারে একটা মাতধর্মী ছাঁচ; মা নিজেকে দেখতে পায় ও প্রক্ষেপ করে মেয়ের মধ্যে, এবং প্রায়ই মেয়ের প্রতি থাকে তার একটা যৌন আকর্ষণ; নারীসমকামীর সাথে তার আছে একটি অভিন্ন কামনা যে একটি নরম মাংসের বস্তুকে সে নিজের বাহুতে রক্ষা করবে এবং দোলাবে। কলেৎ প্রকাশ করেন এ-সাদৃশ্যটি, যখন তিনি ব্রিলে দ্য ল ভিন-এ লেখেন : ‘তুমি আনন্দ দেবে আমাকে, আমার ওপর বেঁকে পড়ে, যখন, মায়ের উদ্বেগে দু-চোখ ভরে, তুমি তোমার প্রতি সংরক্তজনের মধ্যে খোজো সে-শিশুকে, যাকে তুমি জন্ম দাও নি’; এবং রেনি ভিভিয়ে তার আরেকটি কবিতায় বিকাশ ঘটিয়েছেন একই ভাবাবেগের : ‘… তোমাকে আশ্রয় দেয়ার জন্যে আমার বাহু দুটিকে করা হয়েছে উৎকৃষ্টতর… উষ্ণ দোলনার মতো যেখানে তুমি পাবে বিশ্রাম’।
সব প্রেমেই তা কামধর্মীই হোক বা হোক মাতৃধর্মী একই সঙ্গে আছে স্বার্থপরতা ও মহত্ত্ব, অপরকে অধিকার করার এবং অপরকে সব কিছু দেয়ার বাসনা; তবে মা ও নারীসমকামী একই রকম বিশেষ করে যতোটা মাত্রায় তারা উভয়েই আত্মরতিপরায়ণ, যতোটা অনুরক্ত তারা যথাক্রমে মেয়ের প্রতি বা বান্ধবীর প্রতি, তাদের প্রত্যেকের কাছে মেয়ে বা বন্ধু হচ্ছে নিজের প্রক্ষেপণ বা প্রতিফলন।
