প্রায়ই চিহ্নিত করা হয় দু-ধরনের নারীসমকামী : ‘পুরুষধর্মী’, যারা ‘পুরুষের অনুকরণ করতে চায়’, ও ‘নারীধর্মী’, যারা ‘পুরুষকে ভয় পায়’। এটা সত্য যে সার্বিকভাবে শনাক্ত করা যায় বিপর্যস্ততার দুটি প্রবণতা; কিছু নারী অক্রিয়তা মেনে নেয় না, আর অন্য কিছু নারী চায় নারীর বাহু, যার ভেতরে তারা নিজেদের সমর্পণ করতে পারে অক্রিয়ভাবে। অনেক কারণে আমার ওপরের শ্রেণীকরণকে নিতান্তই খামখেয়ালি ব্যাপার বলে মনে হয়।
‘পুরুষধর্মী’ নারীসমকামীকে তার ‘পুরুষকে অনুকরণ করার’ ইচ্ছের সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তাকে অস্বাভাবিক বলে নির্দেশ করা। ইতিমধ্যেই আমি দেখিয়েছি যে সমাজ এখন পুরুষধর্মী-নারীধর্মী বলে নির্দেশ করে থাকে যে-সব শ্ৰেণী, সেগুলো মেনে নিয়ে মনোবিশ্লেষকেরা সৃষ্টি করে থাকেন কতো অজস্র দ্ব্যর্থকতা। সত্য হচ্ছে যে পুরুষ আজ বোঝায় ধনাত্মকতা ও নিরপেক্ষতা–অর্থাৎ পুরুষ ও মানুষ। আর সেখানে নারী শুধুই ঋণাত্মক, স্ত্রীলিঙ্গ। যখনই নারী মানুষের মতো আচরণ করে, তখনই ঘোষণা করা হয় যে সে পুরুষের সাথে নিজেকে অভিন্ন করে তুলছে। খেলাধুলো, রাজনীতি, ও মননশীল ব্যাপারে তার কর্মকাণ্ড, অন্য নারীদের প্রতি তার যৌন কামনা, সব কিছুকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘পুরুষধর্মী প্রতিবাদ’ বলে।
এ-ধরনের ব্যাখ্যার পেছনের প্রধান বিভ্রান্তিটি হচ্ছে যে স্ত্রীলিঙ্গ মানুষের পক্ষে নিজেকে নারীধর্মী নারী করে তোলাই প্রাকৃতিক : এ-আদর্শ বাস্তবায়নের জন্যে বিষমকামী হওয়া, এমনকি মা হওয়াও, যথেষ্ট নয় : ‘খাঁটি নারী’ সভ্যতার তৈরি এক কৃত্রিম বস্তু, যেমন আগের দিনে তৈরি করা হতো খোজা। ছেনালিপনা, বশমানার জন্যে তার প্রবৃত্তিগুলো আসলে প্রতিবোধনের ফল, যেমন প্রতিবোধনের ফল পুরুষের শিশ্নগর্ব। পুরুষ, প্রকৃতপক্ষে, সব সময় তার পুরুষপ্রবৃত্তিকে মেনে নেয় না; এবং নারীর জন্যে যে-প্রকৃতি নির্দেশ করা হয়, সেটিকে নারীর পক্ষে একটু কম বশ্যতার সাথে গ্রহণ করার বিশেষ কারণ রয়েছে। ‘হীনম্মন্যতা, গূঢ়ৈষা’ ও ‘পুরুষধর্মী গূঢ়ৈষা’ ধারণা আমাকে মনে করিয়ে দেয় দেনিস দ্য রজম এর পার দি দিবল-এর গল্প : এক মহিলা মনে করে পল্লীগ্রামে ঘোরাঘুরির সময় কিছু পাখি তাকে আক্রমণ করেছিলো; কয়েক মাস মানসিক চিকিৎসার পরও তার আবিষ্টতা কাটে না, ডাক্তার একদিন তার রোগীকে নিয়ে ক্লিনিকের বাগানে যান এবং দেখতে পান যে পাখি সত্যিই তাকে আক্রমণ করেছিলো! নারী হীনতা বোধ করে, কেননা আসলে নারীত্বের চাহিদাগুলো তাকে হীন করে তোলে। সে স্বতস্ফূর্তভাবে হয়ে উঠতে চায় একটি পরিপূর্ণ মানুষ, একজন কর্তা, একটি স্বাধীন সত্তা, যার সামনে খোলা আছে বিশ্ব ও ভবিষ্যৎ এবাসনাকে যে পুরুষধর্মিতার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, তার কারণ হচ্ছে আজ নারীত্ব বোঝায়অঙ্গহানিত্ব। চিকিৎসকদের কাছে বিপর্যস্তরা যে-সব বিবৃতি দিয়েছে, সেগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে তাদের যা প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে, এমনকি শৈশবেও, তা। হচ্ছে তাদের নারীধর্মী বলে গণ্য করা। তারা বালিকাসুলভ কাজ করতে অপমান বোেধ করে, চায় ছেলেদের খেলা ও খেলার সামগ্রি; তারা করুণা করে নারীদের, তারা ভয় পায়রমণীয় হয়ে উঠতে, বালিকা বিদ্যালয়ে যেতে তারা অস্বীকৃতি জানায়।
এ-বিদ্রোহ কিছুতেই কোনো পূর্বনির্ধারিত সমকামিতার দ্যোতনা করে না। কলেৎ অদ্রি বারো বছর বয়সে যখন আবিষ্কার করেন তিনি কখনো নাবিক হতে পারবেন না, তখন তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান। তার লিঙ্গ তার ওপর যে-সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দেয়, তার জন্যে ভবিষ্যৎমুখি নারীর পক্ষে ক্রোধ বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। সে কেনোএসব প্রত্যাখ্যান করবে, সেটা আসল প্রশ্ন নয় : বরং সমস্যাটি হচ্ছে একথা বোঝা যে কেননা সে মেনে নেবে এসব। নারী বশ্যতা ও ভীরুতার মাধ্যমে খাপ খাওয়ায়; কিন্তু এ-মেনে নেয়া সহজেই রূপান্তরিত হয় বিদ্রোহে, যদি সমাজ এর জন্যে যে-ক্ষতিপূরণ দেয়, সেগুলো অপ্রতুল হয়। এটাই ঘটবে সে-সব ক্ষেত্রে যেখানে কিশোরী বোধ করে যে সে নারী হিশেবে হীনভাবে সজ্জিত; বিশেষ করে এভাবেই দেহসংস্থানগত সম্পদগুলো হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ; যে-নারী মুখাবয়বে ও দেহকাঠামোয় কুৎসিত, বা নিজেকে সে অমন মনে করে, সে প্রত্যাখ্যান করে নারীধর্মী নিয়তি, ওই নিয়তির জন্যে নিজেকে তার মনে হয় অনুপযুক্ত। তবে একথা বলা ভুল হবে যে পুরুষধর্মী। প্রবণতা আয়ত্ত করা হয় নারীধর্মী বৈশিষ্ট্যগুলোর অভাবের ক্ষতিপূরণের জন্যে; বরং সত্য হচ্ছে পুরুষের সুবিধাগুলো বিসর্জনের বিনিময়ে কিশোরীকে যে-সব সুযোগসুবিধা দেয়া হয়, সেগুলো খুবই অকিঞ্চিৎকর।
এমনকি যদি তার একটি চমৎকার দেহ ও সুন্দর মুখও থাকে, তবুও যে-নারী মগ্ন নিজের উচ্চাভিলাষী কাজে বা যে-নারী নিতান্তই সাধারণভাবে মুক্তি পেতে চায়, আরেকটি মানুষের জন্যে নিজের কাজ ছেড়ে দিতে সে অস্বীকার করবে; সে নিজেকে উপলব্ধি করে নিজের কাজে, শুধু নিজের সীমাবদ্ধ দেহে নয় : পুরুষের যে-বাসনা তাকে ক্ষীণ করে আনে তার দেহের সীমানার মধ্যে, তা তাকে তোটাই আহত করে যতোটা আহত করে তরুণ ছেলেকে; সে বশীভূত নারীদের প্রতি ততোটা ঘেন্না বোধ করে একজন পৌরুষসম্পন্ন পুরুষ যতোটা ঘেন্না বোধ করে এটি অক্রিয় বালকসংসর্গকারীর প্রতি। এ-ধরনের নারীর সাথে দুষ্কর্মে তার সহযোগিতা আছে আংশিকভাবে এ-ধারণা অস্বীকার করার জন্যে সে নেয় পুরুষধর্মী মনোভাব; সে নেয় পুরুষের পোশাক, আচরণ, ভাষা; নারীধর্মী কোনো নারীসাথীর সঙ্গে সে গড়ে তোলে যুগল, যাতে সে নেয় পুরুষ মানুষের ভূমিকা : সত্যিই সে অভিনয় করে ‘পুরুষধর্মী প্রতিবাদ’-এর। কিন্তু এটা এক গৌণ প্রপঞ্চ; যা মুখ্য তা হচ্ছে মাংসল শিকারে রূপান্তরিত হওয়ার কথা ভাবতেই বিজয়ী ও সার্বভৌম কর্তা বোধ করে এক লজ্জাপূর্ণ প্রবল অনীহা। বহু নারী ক্রীড়াবিদ সমকামী, শরীর জ্ঞাপন করে পেশি, সক্রিয়তা, সাড়াদানপ্রবণতা, প্রচণ্ড বেগে ধারণ, তারা ওই শরীরকে অক্রিয় মাংস বলে গণ্য করে; এটা ঐন্দ্রজালিকভাবে প্রণয়পর্শ জাগায় না, এটা বিশ্বের সাথে কাজের একটি উপায়, বিশ্বে এটি নিতান্তই একটি বস্তুধর্মী জিনিশ নয় : নিজের-জন্যে-দেহ ও অন্যদের-জন্যে-দেহের মাঝখানে আছে যে-বিরাট ব্যবধান, এক্ষেত্রে তা দুস্তর মনে হয়। সদৃশ প্রতিরোধ দেখতে পাওয়াযাবে নির্বাহী ও মননশীল ধরনের নারীদের মধ্যে, যাদের পক্ষে সমর্পণ, এমনকি দেহও, অসম্ভব।
