পুরুষ হরমোনের প্রভাবে ‘পুরুষালি’ বলে কথিত নারীদের মধ্যে দেখা দেয় পুরুষের অপ্রধান লিঙ্গ বৈশিষ্ট্য, যেমন মুখে পশম গজায়; বালধর্মী নারীদের মধ্যে উনতা থাকতে পারে স্ত্রী হরমোনের এবং তাই তাদের বিকাশ সম্পূর্ণতা লাভ করে না। এসব বিশিষ্টতা কম-বেশি সরাসরিভাবে বিকাশ ঘটাতে পারে নারীসমকামী প্রবণতার।তেজস্বী, আক্রমণাত্মক, প্রাণোচ্ছল জীবনশক্তিসম্পন্ন নারী পছন্দ করে নিজেকে সক্রিয়ভাবে প্রদর্শন করতে এবং সাধারণত অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করে অক্রিয়তা; অনুগ্রহবঞ্চিত, বিকলাঙ্গ কোনো নারী তার নিকৃষ্টতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে পুরুষধর্মী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে; যদি তার কামানুভূতি অবিকশিত থাকে, তাহলে সে পুরুষেরস্পর্শাদর কামনা করে না।
তবে দেহসংস্থান ও হরমোন শুধু প্রতিষ্ঠা করে একটি পরিস্থিতি এবং কোন দিকে পরিস্থিতিটির সীমাতিক্রমণ ঘটাতে হবে, তার লক্ষ্য নির্দেশ করে না। হেলেন ডয়েটশ প্রথম মহাযুদ্ধের পোলীয় অনীকিনীর এক তরুণ সৈনিকের কথা উল্লেখ করেছেন, যে আহত হয়ে তার কাছে আসে চিকিৎসার জন্যে এবং যে আসলে ছিলোসুস্পষ্টভাবে পুরুষের অপ্রধান লিঙ্গ-বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক মেয়ে। সেবিকা হিশেবে সে যোগ দেয় সৈন্যবাহিনীতে, এবং তারপর সে সফল হয় তার লিঙ্গ গোপন করে সৈনিক হতে। তবে সে প্রেমে পড়ে এক সঙ্গীর, এবং পরে সে সম্পন্ন করে এক অনুকূল উপযোজন। তার আচরণে তার সঙ্গীদের মনে হয় যে সে এক পুরুষ সমকামী, তবে বাস্তবিকভাবে তার পুরুষধর্মী জাক সত্ত্বেও তার নারীত্ব আবার দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে নিজেকে। পুরুষ অবধারিতভাবে নারী কামনা করে না; পুরুষ সমকামীর যে থাকতে পারে একটি সুগঠিত পুরুষের দৈহিক গঠন, এটাই বোঝায় যে পুরুষধর্মী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো নারী সমকামিতার জন্যে অবধারিতভাবে দণ্ডিত নয়।
কখনো কখনো দাবি করা হয় যে বেশ স্বাভাবিক শারীরবৃত্তসম্পন্ন নারীদের মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে ‘ভগাঙ্গুরীয়’ ও ‘যোনীয়’ ধরনের নারী, এদের প্রথমটির নিয়তি সমকামী প্রেম। তবে আমরা দেখেছি সমস্ত শৈশব কামই ভগাঙ্কুরীয়; এটা এ-স্তরেই স্থিত হয়ে থাকুক বা রূপান্তরিত হোক, তা অঙ্গসংস্থানের ব্যাপার নয়; প্রায়ই যা বলা হয়ে থাকে যে শৈশবের হস্তমৈথুনের ফলে পরে প্রধান হয়ে ওঠে ভগাঙ্কুর, তাও সত্য নয় : আজকাল যৌনবিজ্ঞান শিশুর হস্তমৈথুনকে বেশ স্বাভাবিক ও ব্যাপক প্রপঞ্চ বলেই গণ্য করে। নারীর কামের বিকাশ, আমরা দেখেছি, একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা প্রভাবিত হয় শারীরবৃত্তিক ব্যাপার দিয়ে, তবে এটা নির্ভর করে অস্তিত্বের প্রতি ব্যক্তির মনোভাবের ওপর। মারানো মনে করতেন যে কাম এক সম্মিলিত গুণ এবং পুরুষের মধ্যে এটা যেখানে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে, সেখানে নারীর মধ্যে এটা থাকে অর্ধবিকশিত স্তরে; শুধু একটি নারীসমকামীরই থাকতে পারে পুরুষের মতো সমৃদ্ধ একটি লিবিডো, এবং সুতরাং সে নির্দেশ করে এক ‘শ্রেষ্ঠতর’ নারী-ধরন। তবে সত্য হচ্ছে যে নারীর কামের আছে এক নিজস্ব সংগঠন, এবং তাই পুরুষের ও নারীর লিবিডো প্রসঙ্গে শ্রেষ্ঠতা বা নিকৃষ্টতার কথা বলা নিরর্থক; কামের সামগ্রিরূপে সে কী বেছে নেবে, তা কিছুতেই নারীটির কর্মশক্তির ওপর নির্ভর করে না।
ফ্রয়েডের মতে, নারীর কামের পরিপক্বতার জন্যে ভগাঙ্কুরীয় স্তর থেকে যোনীয় স্তরে বদল দরকার, এ-পরিবর্তনটি শিশুর মায়ের প্রতি ভালোবাসা পিতার প্রতি ভালোবাসায় পরিবর্তিত করার সাথে প্রতিসম। নানা কারণে এ-বিকাশপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে; নারীটি তার ‘খোজা’ অবস্থা মেনে নাও নিতে পারে, তার শিশ্নের অভাবগোপন করে রাখতে পারে নিজের কাছেও এবং স্থিত হয়ে থাকতে পারে মায়ের ওপর, যার বিকল্প সে নিরন্তর খুঁজে চলে।
অ্যাডলারের মতে, এ-বিকাশ স্থগিত হওয়া অক্রিয়ভাবে ভোগ-করা দুর্ঘটনা নয় : এটা কামনা করেছে ব্যক্তিটিই, ক্ষমতাপ্রয়োগের ইচ্ছের মাধমে যে স্বেচ্ছায়প্রত্যাখ্যান করে তার অঙ্গহানি এবং পুরুষটির অধীনতা না মেনে অভিন্ন হয়ে উঠতে চায় তার সাথে। শিশুসুলভ সংবন্ধনের ব্যাপারই হোক বা হোক পুরুষালি প্রতিবাদের ব্যাপার, সমকামকে গণ্য করা হয় বিকাশরুদ্ধতার ব্যাপার বলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমকামী নারী ‘উৎকৃষ্টতর’ নারীর থেকে অধিকতর ‘অবিকশিত’ নারী নয়। ব্যক্তির ইতিহাস কোনো নিয়তিনির্ধারিত অগ্রসরণ নয়। সমকামিতা নারীর কাছে হতে পারে তার পরিস্থিতি থেকে পলায়নের একটি রীতি বা একে স্বীকার করে নেয়ার ধরন। প্রথাগত নৈতিকতা অনুসরণের ফলে মনোবিশ্লেষকদের মহাভুলটি হচ্ছে সর্মমকে কখনোই একটি অস্বাভাবিক প্রবণতা ছাড়া অন্য কিছু বলে গণ্য না করা।
নারী এমন এক অস্তিত্বশীল সত্তা, যার প্রতি আহ্বান জানানো হয় নিজেকে একটি বস্তু করে তোলার জন্যে; কর্তা হিশেবে তার কামে আছে আক্রমণাত্মক উপাদান, যা পুরুষের শরীর দিয়ে পরিতৃপ্ত হয় না : তাই দেখা দেয় বিরোধ, যা কোনো উপায়ে মিটমাট করতে হয় তার কামের। সে-রীতিটিকেই স্বাভাবিক বা ‘প্রাকৃতিক’ বলে গণ্য করা হয় যেটি, তাকে কোনো পুরুষের কাছে শিকার হিশেবে ছেড়ে দিয়ে, তার কোলে একটা শিশু তুলে দিয়ে পুনরুদ্ধার করে তার সার্বভৌমত্ব : তবে এ-কল্পিত স্বাভাবিকত্ব তৈরি হয় কম-বেশি স্পষ্টভাবে উপলব্ধ সামাজিক স্বার্থে। এমনকি বিষম কামেও থাকে আরো নানা উপায়। নারীর সমকামিতা হচ্ছে তার মাংসের অক্রিয়তার সাথে তার স্বায়ত্তশাসলের বিরোধের মীমাংসা করার অন্যতম উদ্যোগ। এবং যদি প্রকৃতিকেই আবাহন করা হয়, তাহলে বলা যায় যে সব নারীই প্রাকৃতিকভাবে সমকামী। নারীসমকামীকে, প্রকৃতপক্ষে, চিহ্নিত করা হয় সে পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করে বলে এবং সে নারীদেহ পছন্দ করে বলে; তবে প্রতিটি তরুণী ভয় পায় বিদ্ধকরণ ও পুরুষাধিপত্য, এবং পুরুষের দেহের প্রতি বোধ করে এক রকম ঘৃণা; অন্যদিকে, নারীদেহ, তার কাছে, যেমন পুরুষের কাছে, এক কামনার বস্তু।
