নারীর বাধ্যতা, অধিকন্তু, একটি খুবই দ্ব্যর্থক ধারণা। আমরা দেখেছি যে তরুণী সাধারণত কল্পনায় মেনে নেয় কোনো নরদেবতার, কোনো বীরের, কোনো পুরুষের আধিপত্য; তবে এটা আত্মরতিমূলক খেলার থেকে বেশি কিছু নয়। বাস্তবে তরুণীকে এটা কোনোভাবেই এমন কোনো প্রভুর দৈহিক চর্চার কাছে সমর্পণ করে না। এর বিপরীতে, প্রায়ই সে প্রত্যাখ্যান করে সে-পুরুষটিকে, যাকে সে পছন্দ ও শ্রদ্ধা করে, এবং নিজেকে দান করে এমন কোনো পুরুষের কাছে, যার নেই কোনো বিশিষ্টতা। উদ্ভট কল্পনার মধ্যে বাস্তব আচরণের চাবি খোজা ভুল; কেননা উদ্ভট কল্পনাগুলো সৃষ্টি ও পোষণ করা হয় উদ্ভট কল্পনারূপেই। আমরা আবার উদ্ধৃত করতে পারি মারি বাশকিসেভকে : ‘সারাজীবন আমি নিজেকে কোনো প্রাতিভাসিক আধিপত্যের কাছে সমর্পণ করতে চেয়েছি, কিন্তু যে-সব পুরুষ নিয়ে আমি এ-চেষ্টা করেছি, তারা আমার তুলনায় এতো তুচ্ছ যে আমি শুধু ঘৃণা বোধ করেছি’।
তবু, ঠিক যে কামে নারীর ভূমিকা প্রধানত অক্রিয়; তবে পুরুষের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ যতোটা ধর্ষকামী ওই অক্রিয়া ভূমিকার বাস্তবিক রূপায়ণ তার থেকে বেশি মর্ষকামী নয়; সুখ পাওয়ার জন্যে প্রণয়স্পর্শ, উত্তেজনা, ও বিদ্ধকরণকে অতিক্রম করে গিয়ে নারী রক্ষা করতে পারে তার ব্যাক্তিতা, নারী তার প্রেমিকের সাথে সম্মিলন চাইতেও পারে এবং নিজেকে দানও করতে পারে তার কাছে, এটাবোঝায় অহংয়ের সীমাতিক্ৰমণতা, দাবি ছেড়ে দেয়া নয়। তখনই থাকে মর্ষকাম, যখন কেউ চায় যে অন্যদের সচেতন ইচ্ছেয় সে হয়ে উঠবে একটি যথার্থ বস্তু, যখন সে নিজেকে দেখতে চায় বস্তুরূপে, বস্তু হওয়ার ভান করে। ‘মর্ষকাম আমার বস্তুতন্ত্রতা দিয়ে অন্যকে মুগ্ধ করার কোনো উদ্যোগ নয়, তবে এটা হচ্ছে অপরের দৃষ্টিতে নিজেকে নিজে হয়ে ওঠার উদ্যোগ, যা আমার বস্তুতন্ত্রতায় মুগ্ধ’ (জে,পি, সার্ত, ল’এতর এৎ ল্য নিআ)।
এটা এক পুরোনো কুটভাষ যে পুরুষ বাস করে এক ইন্দ্রিয়ানুভূতির জগতে, যেখানে আছে মধুরতা, প্রীতি, দ্রতা, এক নারীসুলভ জগতে, আর সেখানে নারী ঢোকে পুরুষের জগতে, যা কঠিন ও কর্কশ; নারীর হাত এখনো কামনা করে কোমল, মসৃণ মাংসের সংস্পর্শ : কিশোর, নারী, পুষ্প, পশম, শিশু; তার ভেতরের একটি সম্পূর্ণ এলাকা থেকে যায় অনধিষ্ঠিত এবং সে কামনা করে এমন সম্পদ অধিকার করতে, যা সে দেয় পুরুষকে। বহু নারীর মধ্যে যে বিদ্যমান থাকে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট সমকামিতার প্রবণতা, এটা ব্যাখ্যা করে এ-ব্যাপারটি। এক ধরনের নারী আছে, বহু জটিল কারণে, যাদের মধ্যে এ-প্রবণতা প্রকাশ পায় অস্বাভাবিক শক্তিতে। সব নারী। তাদের যৌন সমস্যাগুলো মানবদ্ধ রীতিতে, সমাজ কর্তৃক অনুমোদিত একমাত্র পদ্ধতিতে, সমাধান করতে সমর্থও নয় এবং ইচ্ছুকও নয়। আমরা এখন মনোযোগ দেবো তাদের দিকে, যারা বেছে নেয় নিষিদ্ধ পথ।
নারীসমকামী
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৪ –গঠনের বছরগুলো। পরিচ্ছেদ ৪
নারীসমকামীর কথা ভাবতে গিয়ে আমরা সাধারণত ভাবি এমন এক নারীর কথা, যে পরে একটা সাদাসিধে ফেল্ট হ্যাট, যার ছোটো চুল, ও পরে একটা নেকটাই; তার পুরুষধরনের আকৃতি যেনো নির্দেশ করে হরমোনের কোনো অস্বাভাবিকতা। বিপর্যস্তকে ‘পুরুষালি’ নারীর সঙ্গে এভাবে তালগোল পাকিয়ে ফেলার থেকে কিছুই আর বেশি ভ্রান্তিপূর্ণ হতে পারে না। হারেমের বাসিন্দা, বেশ্যা, স্বেচ্ছাকৃতভাবে ‘নারীধর্মী’ নারীদের মধ্যে আছে বহু সমকামী; এর বিপরীতে বিপুল সংখ্যক ‘পুরুষালি’ নারী বিষমকামী। যৌনবিজ্ঞানী ও মনোবিশ্লেষকেরা এ সাধারণ পর্যবেক্ষণকে দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করেছেন যে অধিকাংশ নারী ‘হোমো’ই ধাতে অন্য নারীদের মতোই। তাদের কাম কিছুতেই কোনো দেহসংস্থানগত ‘নিয়তি’ দ্বারা নির্ধারিত নয়।
তবে সন্দেহ নেই যে শারীরবৃত্তিক বৈশিষ্ট বিশেষ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। দুটি লিঙ্গের মধ্যে কোনো কঠোর জৈবিক স্বাতন্ত্র নেই : কিছু হরমোন ক্রিয়াকরে একটি অভিন্ন দেহের ওপর, যার অভিমুখ–পুরুষত্ব বা নারীত্বের দিকে নির্ধারিত হয় জিনসত্তা দিয়ে, তবে ভ্রূণের বিকাশের সময় এর গতিপথ কম-বেশি পাল্টে দেয়াসম্ভব, যার ফলে দেখা দেবে এমন ব্যক্তিরা, যারা কিছু কিছু ব্যাপারে পুরুষ ও নারীর মাঝামাঝি। কিছু পুরুষের মধ্যে থাকে নারীর বৈশিষ্ট্য, কেননা তাদের পুরুষাঙ্গ বিকাশে বিলম্ব ঘটেছিলো : এজন্যেই আমরা মাঝেমাঝে দেখতে পাই মেয়ে বলে গণ্য কিছু মেয়ে তাদের অনেকে বিশেষভাবে জড়িত থাকে খেলাধুলোয়-পরিবর্তিত হয়ে ছেলে হয়েওঠে। হেলেন ডয়েটশ এক তরুণী মেয়ের রোগের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, যে ব্যথভাবে প্রেম নিবেদন করে এক বিবাহিত নারীর কাছে, হরণ করে নিয়ে তার সাথে জীবন যাপন করতে চায়। পরে দেখা যায় সে আসলে ছিলো উভলিঙ্গ, এবং সে ওই নারীটিকে বিবাহবিচ্ছেদের পর বিয়ে করতে পেরেছিলো এবং অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থা স্বাভাবিক পুরুষের অবস্থা হয়ে উঠলে সে সন্তানও জন্ম দিতে পেরেছিলো। তবে কিছুতেই এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে প্রতিটি বিপর্যস্ত নারীই জৈবিকভাবে পুরুষ, যে উড়িয়ে চলছে প্রতারণামূলক পতাকা। উভলিঙ্গ, যার আছে উভয় লিঙ্গেরই কামপ্রত্যঙ্গ সংয়ের উপাদান, দেখাতে পারে নারীসুলভ কাম : আমি নিজেই চিনতাম এক নারীকে, নাটশিদের দ্বারা যে বহিষ্কৃত হয়েছিলো ভিয়েনা থেকে, তার দুঃখ ছিলো বিষমকামী পুরুষেরা বা সমকামীরা তার দিকে আকৃষ্ট হতো না, তবে সে নিজে আকর্ষণ বোধ করতো শুধু পুরুষদের প্রতি।
