কোনো পুরুষ যখন সঙ্গিনীটির ওপর চাপিয়ে দেয় তার ছন্দোস্পন্দ বা সময়সীমা এবং তাকে একটা কামপুলক দেয়ার জন্যে প্রাণপণে খাটে, তখন সে অত্যন্ত ভুল করে : নারীটি নিজের যে-বিশেষ রীতিতে পুলকের যে-রূপের দিকে এগোচ্ছিলো, তখন সে সফল হয় শুধু তা চুরমার করে দিতে। এটা এমন এক নমনীয় রূপ যে এর শর্তগুলো নির্ধারণ করা কঠিন : মংসপেশির কিছু খিচুনি যোনিতে সীমিত থেকে বা সমগ্রভাবে কামসংশ্রয়ের ভেতরে, বা সারা শরীরে জড়িত থেকে ঘটাতে পারে সমাপ্তি; কিছু নারীতে এগুলো খুবই তীব্র এবং নিয়মিতভাবে ঘটে যে এগুলোকে গণ্য করা যায় কামপুলক বলে; তবে প্রণয়িনী নারী তার পুরুষটির কামপুলকের মধ্যেও পৌছোতে পারে উপসংহারে, যা দেয় প্রশমন ও পরিতৃপ্তি। এবং এও সম্ভব যে কামের অবস্থাটি প্রশমিত হতে পারে ধীরশান্তভাবে, হঠাৎ রাগমোচন ছাড়াই। সাফল্যের জন্যে অনুভূতির গাণিতিক এককালবর্তীকরণ দরকার পড়ে না, যেমন আছে খুঁটিনাটির প্রতি অতিযত্নশীল বহু পুরুষের অতি-সরলীকৃত বিশ্বাসে, এর জন্যে দরকার একটা জটিল কামবিন্যাস প্রতিষ্ঠা। অনেকে মনে করে যে নারীদের কামসুখের অনুভূতি দেয়া একটা সময় ও কৌশলের ব্যাপার মাত্র, এটা এক হিংস্র কর্ম বটে; তারা বোঝে না নারীর কাম কতোটা মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত হয় সমগ্র পরিস্থিতি দিয়ে।
নারীর কামসুখ, আমি আগেই বলেছি, এক ধরনের যাদুমন্ত্র; এটা চায় প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমপূর্ণ; কোনো কথা বা নড়াচড়া স্পর্শাদরের যাদুর বিপক্ষে যায়, তাহলে ভেঙে যায় মন্ত্রটি। এটাই অন্যতম কারণ কেননা নারী চোখ বোজ; শারীরবৃত্তিকভাবে এটা চোখের মণির প্রসারণের ক্ষতিপূরণ করার জন্যে একটি প্রতিবর্তী ক্রিয়া; কিন্তু এমনকি অন্ধকারেও নারীর চোখের পাতা নেমে আসে। সে লুপ্ত করে দিতে চায় সমগ্র পরিপার্শ্ব, লুপ্ত করে দিতে চায় ওই মুহূর্তের, তার নিজের, এবং তার প্রেমিকের এককত্ব, সে হারিয়ে যেতে চায় মাতৃগর্ভের মতো ছায়াচ্ছন্ন মাংসের রাত্রির ভেতরে। আরো বিশেষভাবে সেলোপ করে দিতে চায় তার ও পুরুষটির মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্নতা; সে চায় পুরুষটির সাথে গলে এক হয়ে যেতে।
দুটি শরীরের বিচ্ছিন্ন হওয়ার মুহূর্তটি কেননা প্রায় সব সময়ই নারীর জন্যে বেদনাদায়ক, এটাই ব্যাখ্যা করে তার কারণ। প্রকৃতির ছল বা নারীর বিজয়ী পুরুষ সঙ্গমে সুখ পাক বা হতাশ হোক, সঙ্গমের পর সে সব সময়ই বর্জন করে দেহ; সে আবার হয়ে ওঠে একটি সৎ শরীর, সে ঘুমোতে চায়, স্নান করতে চায়, সিগারেট খেতে চায়, মুক্ত বায়ুর জন্যে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু নারী বিলম্বিত করতে চায় মাংসের সংস্পর্শ যতোক্ষণ না পুরোপুরি কাটে সে-যাদুমন্ত্র, যা তাকে মাংসে পরিণত করেছিলো; বিচ্ছিন্ন হওয়া তার জন্যে নতুন করে মায়ের দুধ ছাড়ার মতো এক বেদনাদায়ক মূলোৎপাটন; যে-প্রেমিক তাকে ছেড়ে হঠাৎ উঠে যায়, তার ওপর তার রাগ হয়। তবে সে আরো বেশি আহত বোধ করে সে-সব কথায়, যা বিপক্ষে যায় তার সে-মিলনের, যাতে সে মুহূর্তের জন্যে হলেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছে। ‘ওটা যথেষ্ট হয়েছে? আরোলাগবে? ওটা ভালো লেগেছে?’–এ-ধরনের জিজ্ঞাসা জোর দেয় বিচ্ছিন্নতার ওপর, সঙ্গমের কাজটিকে রূপান্তরিত করে পুরুষের পরিচালিত একটি যান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে। নারীর অনেক বিপদ দূর হতো যদি পুরুষ তার চিন্তাধারায় না বইতো অজস্র গূঢ়ৈষা, যার ফলে সে সঙ্গমকে যুদ্ধ হিশেবে গণ্য করে; তাহলে নারীও শয্যাকে আর যুদ্ধক্ষেত্র বলে মনে করতো না।
তবু দেখা যায় আত্মরতি ও গর্ববোধের সাথে তরুণীর মধ্যে আছে শাসিত হওয়ার বাসনা। কিছু মনোবিশ্লেষকের মতে মর্ষকাম নারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এবং এটাই তাকে তার কামনিয়তির সাথে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। তবে মর্ষকামের ধারণাটি অতি গোলমেলে, এবং ব্যাপারটি ভালোভাবে বিচার করে দেখা দরকার।
ফ্রয়েডের অনুসরণে মনোবিশ্লেষকেরা তিন প্রকার মর্ষকাম নির্ণয় করেন : একটিতে আছে যন্ত্রণা ও কামসুখের সম্মিলন, আরেকটি হচ্ছে নারীর কামগত পরনির্ভরশীলতা মেনে নেয়া, আর তৃতীয়টি নির্ভরশীল আত্মপীড়নের এক কার্যসাধনপদ্ধতির ওপর। এ-দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী মর্ষকামী, কেননা তার মধ্যে সুখ ও বেদনা মিলিত হয় সতীত্বমোচন ও সন্তানপ্রসবে, এবং যেহেতু সে মেনে নেয় অক্রিয় ভূমিকা।
সর্বপ্রথম আমাদের লক্ষ্য করতে হবে যে বেদনার ওপর একটা কামগত মূল্য আরোপ আদৌ বোঝায় না যে আচরণটি অক্রিয়ভাবে আত্মসমর্পণমূলক। বেদনা প্রায়ই বাড়ায় পেশির সংকোচনপ্রসারণ, কামোত্তেজনা ও কামসুখের হিংস্রতার ফলে ভোতা হয়ে যাওয়া স্পর্শকাতরতাকে আবার জাগিয়ে তোলে; এটা মাংসের রাত্রির ভেতর দিয়ে ছুটে যাওয়া একটা তীক্ষ্ণ আলোকরশ্মি; যাতে তাকে আবার নিক্ষেপ করা যায়, তাই এটা প্রেমিককে উঠিয়ে আনে সে-বিস্মৃত অবস্থা থেকে, যেখানে সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে ছিলো। বেদনা সাধারণত কামোন্মত্ততার একটা অংশ। কামজ প্রেমে সব সময়ই থাকে নিজের থেকে ছিঁড়ে আনা, আবেগে আত্মহারা হওয়া, পরমানন্দ; বেদনাভোগ ভেঙেচুড়ে ফেলে অহংয়ের সীমানাও, এটা সীমাতিক্ৰমণতা, আবেগের আকস্মিক বিস্ফোরণ; বেদনা সব সময়ই বড়ো ভূমিকা পালন করেছে বন্য-আনন্দোৎসবে, এবং এটা সুপরিজ্ঞাত যে তীব্র সুখ ও বেদনা খাপ খায় পরস্পরে সাথে : প্রণয়স্পর্শ হয়ে উঠতে পারে পীড়ন, যন্ত্রণা দিতে পারে সুখ। আলিঙ্গন সহজেই নিয়ে যায় দংশন, নখাঘাত, আঁচড় দেয়ার দিকে; এমন আচরণ সাধারণত ধর্ষকামী নয়; এটা মিলেমিশে যাওয়ার বাসনা, ধ্বংস করার নয়; এবং যে-ব্যক্তিটি এটা ভোগ করে সে প্রত্যাখ্যান ও অবমাননা খোঁজে না, খোঁজে মিলন; এছাড়া, এটা বিশেষভাবে পুরুষের আচরণ নয়আদৌ তা নয়। প্রকৃতপক্ষে তখনই বেদনার থাকে মর্ষকামী তাৎপর্য, যখন একে গ্রহণ করা হয় ও চাওয়া হয় দাসত্বের প্রমাণ হিশেবে। সতীত্বমোচনের বেদনা সুখের সাথে পরস্পরসম্পর্কিত নয়; এবং সন্তানপ্রসবের বেদনাকে ভয় পায় সব নারীই এবং তারা আনন্দিত যে আধুনিক ধাত্রীবিদ্যার পদ্ধতি এটা দূর করছে। নারীর কামে বেদনার ভূমিকা পুরুষের থেকে বেশিও নয়, কমও নয়।
