এখানেই আমরা আসি নারীর কামের সংকটপূর্ণ সমস্যায় : নারীর কামজীবনের সূচনায় তীক্ষ ও নিশ্চিত উপভোগের মধ্য দিয়ে তার আত্মসমর্পণের ক্ষতিপূরণ ঘটে। সে সানন্দে তার সংযম ও তার অহমিকা বিসর্জন করবে, যদি এটা করে সে খুলতে পারে তার স্বর্গের পথ। কিন্তু ছদছিন্নকরণ, আমরা যেমন দেখেছি, তরুণী প্রেমিকার কাছে প্রীতিকর ব্যাপার নয়; প্রীতিকর হওয়াই বরং অত্যন্ত অস্বাভাবিক;যোনীয় সুখ অবিলম্বে পাওয়া যায় না। স্টেকেলের পরিসংখ্যান অনুসারে অসংখ্য যৌনবিজ্ঞানী ও মনোবিশ্লেষক যা সমর্থন ও অনুমোদন করেছেন–খুব বেশি হলে চার শতাংশ নারী শুরু থেকেই পায় পুলকসুখ; পঞ্চাশ শতাংশ যোনীয় পুলক লাভ করে বহু সপ্তাহ, মাস, এমনকি বছরের পর।
এতে মানসিক ব্যাপার পালন করে অপরিহার্য ভূমিকা। নারীদেহ বিশিষ্টরূপেই মননাদৈহিক : অর্থাৎ প্রায়ই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে মানসিকের সঙ্গে দৈহিকের। নারীর নৈতিক সংবাধ বাধা দেয় কামাবেগ জেগে উঠতে; সুখে সেগুলোর সমতাবিধান না ঘটলে সেগুলো চিরস্থায়ী হতে থাকে এবং সৃষ্টি করে ক্রমশক্তিশালী প্রতিবন্ধকতা। বহু ক্ষেত্রে গড়ে ওঠে একটা দুষ্টচক্র : প্রথম দিকে পুরুষটির কোনো বিশ্রী আচরণ, একটা কথা, একটা স্কুল ভঙ্গি, একটা শ্রেষ্ঠত্বের হাসির প্রতিক্রিয়া ঘটতে থাকে মধুচন্দ্রিমা, এমনকি সারা বিবাহিত জীবন ভরে। অবিলম্বে সুখ না পেয়ে হতাশ হয়ে তরুণী বোধ করে চিরস্থায়ী বিরক্তি, যা পরে কোনোসুখকর সম্পর্কের প্রতিকূল হয়ে ওঠে।
স্বাভাবিক পরিতৃপ্তির অভাবে, একথা সত্য, পুরুষটি সব সময়ই ভগাঙ্কুরটিকে উদ্দীপিত করার উদ্যোগ নিতে পারে, যা, নীতিবাদী মিথ্যে বিবরণ সত্ত্বেও, এমন সুখ যোগাতে পারে যাতে নারীটি লাভ করতে পারে কামপুলক ও শমন। তবে বহু নারী এটা প্রত্যাখ্যান করে, কেননাকে এটাকে তাদের কাছে যোনীয় সুখের মতো মনে না হয়ে মনে হয় আরোপিত বলে, তাই নারী যেমন কষ্ট পায় যখন পুরুষ ব্যগ্র থাকে শুধু তার নিজের স্বস্তিলাভের জন্যে, তেমনি তাকে সোজাসুজি সুখ দেয়ার চেষ্টাতেও সে কষ্ট পায়। ‘অন্যকে সুখের অনুভূতি দেয়ার অর্থ হচ্ছে,’ স্টেকেল বলেন, ‘অন্যের ওপর আধিপত্য করা; নিজেকে অন্যের কাছে সমর্পণ করা হচ্ছে নিজের ঈপ্সার দাবি ত্যাগ করা’। নারী কামসুখকে তখনি নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে যখন তা স্বাভাবিকভাবে বয়ে হয়ে আসে পুরুষটির অনুভূত কামসুখ থেকে, যেমন ঘটে সফল স্বাভাবিক সঙ্গমে। স্টেকেল আবার যেমন বলেছেন : ‘নারীরা তখনই সানন্দে নিজেদের সমর্পণ করে যখন তারা বোধ করে যে তাদের সঙ্গীরা তাদের পরাভূত করার ইচ্ছে পোষণ করে না’; অন্য দিকে, যখন তারা বোধ করে যে তারা ওই ওই ইচ্ছে পোষণ করছে, তখন বিদ্রোহ করে নারীরা। হাতের সাহায্যে উত্তেজিত হওয়াকে অনেকে অপছন্দ করে, কেননা হাত এমন একটি হাতিয়ার, সেটি যে-সুখ দেয় তাতে সেটি অংশ নেয় না, এটি মাংস নির্দেশ না করে নির্দেশ করে কর্মপরায়ণতা। এমনকি পুরুষের যৌনাঙ্গটিকেও যদি এটি কামনাময় মাংস বলে মনে না হয়ে একটি দক্ষভাবে ব্যবহৃত হাতিয়ার বলে মনে হয়, তাহলেও নারী বোধ করবে একই বিকর্ষণ। বহু পর্যবেক্ষণের পর স্টেকেল সিদ্ধান্তে পৌচেছেন যে কামশীতল বলে কথিত নারীদের সমগ্র কামনার লক্ষ্য হচ্ছে। স্বাভাবিকতা : ‘তারা কামপুলক বোধ করতে চায় (যাকে তারা গণ্য করে) স্বাভাবিক নারীর রীতিতে, অন্যান্য রীতি তাদের নৈতিক দাবিগুলো তৃপ্ত করে না’।
পুরুষটির মনোভাব তাই অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষটির কামনা যদি হয় প্রচণ্ড ও নৃশংস, তাহলে তার সঙ্গিনীটির মনে হয় যে পুরুষটির আলিঙ্গনের মধ্যে সে হয়ে উঠছে নিতান্তই একটি বস্তু; তবে পুরুষটি যদি হয় অতিরিক্ত আত্মসংযমী, অতিরিক্ত নির্বিকার, তখন তাকে আর মাংস বলে মনে হয় না; সে চায় যে নারীটি নিজেকে করে তুলবে একটি বস্তু, তবে এর বিনিময়ে তার ওপর নারীটির থাকবে না কোনোঅধিকার। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর অহমিকা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে; কেননা নিজেকে একটি রক্তমাংসের বস্তুতে রূপান্তরণ ও নিজের ব্যক্তির দাবির মধ্যে মিটমাট করার জন্যে তার দরকার পড়ে যে পুরুষটিকেও সে করে তুলবে তার শিকার, যখন সে নিজে হয়ে উঠছে পুরুষটির শিকার। এ-কারণেই নারীরা এতো ঘন ঘন থাকে একগুয়েভাবে। কামশীতল। যদি তার প্রেমিকটি মনোমোহনের শক্তিহীন হয়, যদি সে হয় নিরুত্তাপ, তাচ্ছিল্যপরায়ণ, অদক্ষ, তাহলে সে নারীটির কাম জাগাতে ব্যর্থ হয়, বা সে তাকে রাখে অতৃপ্ত; তবে যদি সে পৌরুষপূর্ণ এবং দক্ষও হয়, তাহলেও জাগাতে পারে প্রত্যাখ্যান করার প্রতিক্রিয়া; নারীটি ভয় পায়তার আধিপত্যকে : অনেক নারী কামসুখ পায় শুধু সে-সব পুরুষের সাথে, যারা ভীরু, নির্গুণ, অথবা এমনকি আধা নপুংসক এবং যাদের থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এটা নিশ্চিত সত্য যে নারীর কামসুখ পুরুষের কামসুখের থেকে বেশ ভিন্ন। আমি ইতিমধ্যেই বলেছি যে যোনীয় অনুভূতি কোন নির্দিষ্ট কামপুলক জাগায় কি না, তা অনিশ্চিত : এ-ব্যাপারে নারীদের মত খুবই বিরল, এবং যখন যথাযথভাবে ব্যাপারটি বর্ণনার চেষ্টা করা হয়, তখনও তা থাকে খুবই অস্পষ্ট; দেখা যায় যে বিভিন্ন ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবে ভিন্ন। কিন্তু সন্দেহ নেই যে পুরুষের কাছে সঙ্গমের আছে এক সুনির্দিষ্ট জৈবিক উপসংহার; বীর্যপাত। এবং নিশ্চয়ই এ-লক্ষ্যের সাথে জড়িত থাকে। আরো নানা জটিল অভিপ্রায়; কিন্তু একবার এটা ঘটলে একেই মনে হয় একটি নির্দিষ্ট ফলাফল বলে; এবং এতে যদি কামনার পূর্ণ পরিতৃপ্তি নাও ঘটে, তবে কিছু সময়ের জন্যে কামনার সমাপ্তি ঘটে। নারীর মধ্যে, উল্টোভাবে, শুরু থেকেই লক্ষ্য অনিশ্চিত, এবং এটা যতোটা শারীরবৃত্তিক তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক প্রকৃতির; সাধারণভাবে নারী কামনা করে কামোত্তেজনা ও সুখ, কিন্তু তার দেহ এ-রমণের কোনো যথাযথ পরিসমাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেয় না; এবং এজন্যেই তার জন্যে সঙ্গম কখনোই সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয় না : এটা কোনো সমাপ্তি মানে না। পুরুষের কামানুভূতি তীরের মতো। জেগে ওঠে, যখন এটা পৌঁছে বিশেষ উচ্চতায় বা সীমায়, এটা পূর্ণতা লাভ করে এবং কামপুলক লাভের মধ্যে হঠাৎ মারা যায়; তার রমণকর্মের ভঙ্গিটি সসীম ও ধারাবাহিকতাহীন। নারীর সুখ বিকিরিত হয় সারা শরীর জুড়ে; এটা সব সময় যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোতে কেন্দ্রীভূত হয় না; এমনকি যখন হয়ও, যোনীয় সংকোচন একটি প্রকৃত কামপুলক সৃষ্টির বদলে তৈরি করে একটা তরঙ্গসংশ্রয়, যা জেগে ওঠে। ছন্দস্পন্দনে, বিলীন হয় ও পুনর্গঠিত হয়, থেকে থেকে লাভ করে এক আকস্মিক বিস্ফোরণের অবস্থা, হয়ে ওঠে অস্পষ্ট, এবং কখনোই লুপ্ত না হয়ে স্তিমিত হয়। যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত নেই, নারীর কামানুভূতি সম্প্রসারিত হয় অনন্তের দিকে; কোনো বিশেষ পরিতৃপ্তিবশত নয়, বরং প্রায়ই স্নায়ুতন্ত্রের বা হৃৎপিণ্ডের অবসাদের ফলে বা মানসিক পূর্ণপরিতৃপ্তির ফলেই সীমায়িত হয় নারীর কামের সম্ভাবনা; এমনকি সে যখন অভিভূত, অবসন্ন, তখনও সে কখনো পরিপূর্ণভাবে নিস্তার লাভ করে না : লাসাতা ননদুম সাতিয়াতা, যেমন বলেছেন জুভেনাল।
