পরিশেষে, আছে আরো একটি ব্যাপার, যা পুরুষকে দেয় একটি বৈরীবৈশিষ্ট্য এবং যৌনক্রিয়াকে করে তোলে এক ভয়ঙ্কর বিপদ : এটা হচ্ছে গর্ভধারণের ঝুঁকি। অবিবাহিত নারীর জন্যে একটি অবৈধ সন্তান এমন এক সামাজিক ও অর্থনীতিক প্রতিবন্ধকতা যে মেয়েরা যখন বুঝতে পারে তারা গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, তখন তারা আত্মহত্যা করতে পারে, এবং কিছু তরুণী মা হত্যা করে তাদের নবজাতক শিশুদের। এমন বিশাল মাত্রার একটা বিপদ অনেক মেয়েকে বাধ্য করে লোকাচারের নির্দেশিত বিবাহপূর্ব সতীত্ব বজায় রাখার জন্যে কামকে নিয়ন্ত্রিত করতে। যখন এ-নিয়ন্ত্রণ অপ্রতুল হয়ে ওঠে, তখন তরুণী মেয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে সে-ভয়ে, যা ওত পেতে আছে তার প্রেমিকের শরীরে। স্টেকেল এমন সব ঘটনার উল্লেখ করেছেন যাতে সচেতনভাবে বোধ করা হয়েছে এ-ত্রাস এবং প্রকাশ করা হয়েছে সঙ্গমের সময়েই এসব উক্তিতে : ‘কিছু যেনো না ঘটে! এটা কি নিরাপদ!’ এবং বিয়ের মধ্যেও শারীরিক ও আর্থিক কারণে একটি শিশু বাঞ্ছিত নাও হতে পারে।
নারীটি যদি তার সঙ্গীটির ওপর পূর্ণ আস্থা পোষণ না করে, সে প্রেমিকই হোক বা হোক স্বামী, তাহলে তার সতর্কতাবোধের জন্যে বিবশ হয় তার কামানুভূতি। সে। হয়তো উদ্বেগের সাথে চোখ রাখবে পুরুষটির কর্মকাণ্ডের ওপর, বা সঙ্গমের পরপরই উঠে যাবে এবং রেহাই পাওয়ার ব্যবস্থা নেবে সে-জীবন্ত বীজাণু থেকে, তার সঙ্গীটি যা তার ভেতরে জমা করেছে। এ-স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা রূঢ়ভাবে বিপরীত স্পর্শাদরের ইন্দ্রিয়াতুর যাদুর; যে-দেহ দুটি সম্প্রতি সংযুক্ত হয়েছিলো পারস্পরিক সুখের মধ্যে, এটা তাদের সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে। এ-সময়ে পুরুষটির শুক্রগুলোকে অশোভন। বস্তুর মতোই ক্ষতিকর জীবাণু বলে মনে হয়; একটা নোংরা পাত্র বোয়ার মতো সে নিজেকে পরিষ্কার করে, আর তখন চরম অখণ্ডতার মধ্যে বিশ্রাম করে পুরুষটি। এক তরুণী বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারী আমাকে বলেছিলেন তাঁর বিরক্তির কথা, বিয়ের রাতের দ্বিধাগ্রস্ত সুখের পর যখন তাঁকে যেতে হয়েছিলো স্নানাগারে, তখন তাঁর স্বামী নির্লিপ্তভাবে টানছিলো সিগারেট : তার মনে হয় যেনো ওই মুহূর্তেই নিশ্চিত হয়ে যায় তার বিয়ের বিপর্যয়। যান্ত্রিক জন্মনিরোধ প্রক্রিয়ার প্রতি প্রবল অনীহাও নিঃসন্দেহে প্রায়সই হয়ে থাকে নারীর কামশীলতার কারণ।
জন্মনিরোধের অধিকতর নিশ্চিত ও কম অস্বস্তিকর পদ্ধতি নারীর যৌনমুক্তির দিকে একটি মহাপদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে, যেখানে উন্নততর পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত, সেখানে বিয়ের সময়কুমারী মেয়ের সংখ্যা ফ্রান্সের থেকে কম। নিঃসন্দেহে এসব পদ্ধতি যৌনক্রিয়ার সময় মনকে ভাবনাহীন রাখে। তবে এখানেও আবার নিজের দেহটিকে একটি বস্তুরূপে ব্যবহারের আগে তরুণীকে জয় করতে হয়কিছু অনীহা : পুরুষ দিয়ে বিদ্ধ হওয়ার ভাবনাকে সে সানন্দে মেনে নেয় না, আর। হাসিমুখে সে মেনে নেয় না পুরুষটির সুখের জন্যে ‘ছিপিবদ্ধ’ হওয়াকে। তার জরায়ু সে রুদ্ধই করুক বা ভেতরে একটা শুক্রনাশক ট্যাম্পন ঢুকুক, যে-নারী দেহ ও কামের অনিশ্চিত মূল্য সম্পর্কে সচেতন, সে অসুবিধায় পড়বে এরকম ঠাণ্ডা পূর্বপরিকল্পনায়এবং বহু পুরুষও আছে, যারা এমন রক্ষাকবচ অপছন্দ করে। সম্পূর্ণ কামপরিস্থিতি যাথার্থ্য প্রতিপাদন করে প্রতিটি ভিন্ন উপাদানের : এক বিশ্লেষণে যে আচরণকে মনে হবে আপত্তিকর, তাকেই মনে হয় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যখন লিপ্ত দেহ দুটি রূপান্তরিত হয় তাদের কামবৈশিষ্ট্য দিয়ে; তবে বিপরীতভাবে, যখন দেহ আচরণকে বিশ্লিষ্ট করা হয় পৃথক ও নিরর্থক উপাদানে, তখন এ-উপাদানগুলো হয়ে ওঠে অমার্জিত, অশ্লীল। যে-বিদ্ধকরণকে গণ্য করা হয় মিলন বলে, দয়িতের সাথে একীভবন বলে, যা প্রণয়িনী নারীকে সুখ দেয়, তা-ই আবার পরিগ্রহ করে তার অস্ত্রোপচারধর্মী, অমার্জিত বৈশিষ্ট্য, যদি তা ঘটে কামোত্তেজনা, বাসনা, ও সুখ ছাড়া, যেমন ঘটতে পারে নিরোধকের পরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে। তা যাই হোক, এ-নিরোধকগুলো সব নারীর কাছে সুলভ নয়; বহু তরুণীই গর্ভধারণের বিপদ থেকে আত্মরক্ষার কোনো উপায় সম্পর্কে অজ্ঞ, এবং তীব্র উদ্বেগের সাথে তারা মনে করে তাদের নিয়তি নির্ভরশীল ওই পুরুষটির সদিচ্ছার ওপর, যাকে তারা দান করেছে দেহ।
এটা মনে করা ঠিক হবে না যে অতিশয় আকুল ধরনের নারীদের ক্ষেত্রে হ্রাস পায় সব রকম বিপদের তীব্রতা। ঘটতে পারে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। নারীর কামোত্তেজনা পৌঁছোতে পারে এতো তীব্রতায়, যা পুরুষের অজানা। পুরুষের কামোত্তেজনা তীক্ষ্ণ তবে বিশেষ স্থানে সীমিত, এবং সম্ভবত শুধু পুলকলাভের মুহূর্তে ছাড়া পুরুষ রক্ষা করে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ; নারী, এর বিপরীতে, প্রকৃতপক্ষেই হয়ে ওঠে আত্মহারা; অনেকের জন্যে এটি হচ্ছে দৈহিক প্রেমের সবচেয়ে নির্দিষ্ট ও ইন্দ্রিয়সুখাবহ মুহুর্ত, তবে এরও আছে একটি যাদুধর্মী ও ভীতিকর বৈশিষ্ট্য। পুরুষ কখনো কখনো ভয় পেতে পারে তার আলিঙ্গনাবদ্ধ নারীটিকে, তাকে মনে হতে পারে আপন বিকৃতির শিকার; পুরুষটির আক্রমণাত্মক ক্ষিপ্ততা পুরুষটিকে যতোটা রূপান্তরিত করে তার থেকে অনেক বেশি আমূলভাবে রূপান্তরিত হয় নারীটি তার বিশৃঙ্খল অভিজ্ঞতা দিয়ে। এ-জ্বর তাকে মুহূর্তের জন্যে রেহাই দেয় লজ্জা থেকে, কিন্তু পরে এর কথা ভাবতেও সে লজ্জা ও বিভীষিকা বোধ করে। এটা যদি সে সাদরে গ্রহণ করতে চায় অথবা এমনকি সগর্বে–তাহলে সুখের উষ্ণতার মধ্যে তাকে থাকতে হয় আনন্দিত চিত্তে; সে তার কামনাবাসনাকে শুধু তখনি স্বীকার করে নিতে পারে যদি তা পরিতৃপ্ত হয় উপভোগ্যভাবে : নইলে সে ওগুলোকে ক্রোধের সাথে অস্বীকার করে।
