স্বত্বাধিকারী তার জমির ওপর মালিকানা জ্ঞাপন করে, গৃহস্থ জ্ঞাপন করে তার বসতবাড়ির ওপর ‘অনধিকার প্রবেশ নিষেধ!’ তার সীমাতিক্ৰমণতার ব্যর্থতার হতাশা থেকে নারী বিশেষ করে তার নিজের জিনিশপত্র রক্ষা করার ব্যাপারে হয় খুবই ঈর্ষাকাতর; তার ঘর, বস্ত্রের আলমারি, তার বাক্সপত্র পবিত্র। এক বৃদ্ধা বেশ্যা একদা কলেৎকে বলেছিলো : ‘মাদাম, কোনো পুরুষ কখনো আমার ঘরে ঢোকে নি; পুরুষদের সাথে আমাকে যা করতে হয়, তার জন্যে প্যারিস বেশ বড়ো’। দেহটিকে না হলেও, সে একটি ছোটো জায়গা রেখেছে, যা অন্যদের জন্যে নিষিদ্ধ।
কিন্ত তরুণীর নিজের দেহটি ছাড়া নিজের বলতে আর কিছু নেই : এটা তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ; যে-পুরুষ তার ভেতরে ঢোকে সে এটি নিয়ে নেয় তার কাছে থেকে; সাধারণ ভাষারীতিটির সত্যতা প্রতিপন্ন হয়বাস্তব অভিজ্ঞতাটিতে। যে-অবমাননা সে আশঙ্কা করেছিলো, তা ঘটে গেছে : তাকে পরাভূত করা হয়েছে, জোর করে রাজি করানো হয়েছে, জয় করা হয়েছে। অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রীলিঙ্গের মতোই, সঙ্গমের সময়নারী থাকে পুরুষটির নিচে। এর ফলে যে-হীনম্মন্যতাবোধ জন্মে, অ্যাডলার একে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে গ্রহণ করেছেন। শৈশব থেকেই শ্ৰেষ্ঠতা ও নিকৃষ্টতার ধারণাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ; গাছের অনেক ওপরে ওঠা কৃতিত্বের কাজ; স্বর্গ পৃথিবীর ওপরে, নরক নিচে; পড়া, পিছলে পড়া, হচ্ছে ব্যর্থ হওয়া, এবং ওপরে ওঠা হচ্ছে সাফল্য; কুস্তিতে জেতার জন্যে প্রতিপক্ষের কাঁধ ভূমিতে চেপে ধরে রাখতে হয়। নারীটি পড়েথাকে পরাজিতের ভঙ্গিতে; এর চেয়েও খারাপ হচ্ছে পুরুষটি এমনভাবে ওঠে নারীটির ওপরে যেভাবে সে লাগাম লাগিয়ে বলগা ধরে উঠতো কোনো পশুর ওপর। নারী সব সময় বোধ করে অক্রিয়তা : তাকে আদর করা হয়, তাকে বিদ্ধ করা হয়; তাকে রমণ করা হয়, আর সেখানে পুরুষ নিজেকে জ্ঞাপন করে সক্রিয়ভাবে। এটা সত্য, পুরুষের প্রত্যঙ্গটি কোনো রেখাঙ্কিত, স্বেচ্ছাচালিত পেশি নয়; এটা লাঙ্গলের ফালও নয় তলোয়ারও নয়, এটা শুধুই মাংস; তবুও, পুরুষ এতে সঞ্চালিত করে এমন গতিশীলতা, যা স্বতপ্রবৃত্ত; এটা সামনের দিকে যায় পেছনের দিকে যায়, থামে, আবার হয়ে ওঠে গতিশীল, তখন নারী একে গ্রহণ করে অনুগতভাবে। পুরুষটিই ঠিক করে কামে নেয়া হবে কোন আসন–বিশেষ করে নারীটি যদি এ-খেলায় নতুন হয় এবং সে-ই ঠিক করে কাজটির সময়কাল এবং পৌঁনপুনিকতা। নারীটি বোধ করে যে সে।একটি উপকরণ মাত্র; স্বাধীনতা পুরোপুরি অন্যজনের। একেই কাব্যিকভাবে বলা হয় নারী হচ্ছে বেহালা, আর পুরুষ হচ্ছে ছড়, যা স্পন্দিত করে নারীকে। ‘শৃঙ্গারে,’ বালজাক বলেছেন, ‘আত্মার কথা ছেড়ে দিলে, নারী হচ্ছে বীণা-যে তার গুপ্তকথা জানায় শুধু তাকে, যে জানে এটি কীভাবে বাজাতে হয়’। পুরুষ নারীকে সম্ভোগ করে, পুরুষ নারীকে সুখ দেয়, এ-শব্দগুলোই বোঝায় পারস্পরিকতার অভাব।
নারী পুরোপুরি প্রতিবুদ্ধ সে-সব প্রচলিত ধারণায়, যা পুরুষের সংরাগকে করে তোলে মহিমান্বিত এবং লজ্জাজনকভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য করে নারীর কামানুভূতির দাবি : নারীর অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতা দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করে এ-অপ্রতিসমতার ঘটনাটি। ভুললে চলবে না যে কিশোর ও কিশোরী তাদের দেহ সম্পর্কে সচেতন হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন রীতিতে : কিশোর তার কামনার মধ্যে একে গ্রহণ করে সহজে ও সগর্বে; কিশোরীর জন্যে, তার আত্মরতি সত্ত্বেও, এটা এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজাগানো বোঝা। পুরুষের যৌনাঙ্গটি একটি আঙুলের মতো সরল ও পরিচ্ছন্ন; এটা স্পষ্ট দেখা যায় এবং প্রায়ই সগর্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এটা প্রদর্শন করা হয় সঙ্গীদের কাছে; কিন্তু নারীর যোনিটি এমনকি নারীর কাছেও রহস্যময়, এটা লুকোনো, শ্লেষ্মল, ও আর্দ্র প্রতিমাসে এটা থেকে রক্ত বেরোয়, এটা প্রায়ই গুমোট হয়ে থাকে দেহের তরল পদার্থে, এটির নিজেরই আছে একটা গোপন ও বিপজ্জনক জীবন। নারী এটির মধ্যে নিজেকে চিনতে পারে না, এবং এটাই অনেকাংশে ব্যাখ্যা করে কেনো নারী এটির কামনাকে নিজের। কামনা বলে বুঝতে পারে না। এসব দেখা দেয় ব্রিতকরভাবে। পুরুষ ‘শক্ত হয়’, কিন্তু নারী ‘ভিজে যায়’; এ-শব্দটিতেই ধরা আছে শৈশবের বিছানা ভেজানোর, প্রস্রাবের কাছে অপরাধ ও অনিচ্ছার মধ্যে ধরা দেয়ার স্মৃতি। পুরুষও একই রকম ঘেন্নাবোধ করে স্বপ্নদোষের প্রতি একটা তরল পদার্থ, প্রস্রাব হোক বা ধাতু হোক, নির্গত করা লজ্জাজনক নয় : এটা এক সক্রিয় কর্ম; কিন্তু তরল পদার্থটি যদি। অক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসে, তখন তা লজ্জাজনক, কেননা শরীরটি তখন আর থাকে না মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রিত ও এক সচেতন কর্তার প্রকাশরূপ পেশি ও স্নায়ুসম্বলিত জীব, বরং সেটি হয়ে ওঠে জড়বস্তুতে গঠিত একটি পাত্র, একটি আধার, যা খামখেয়ালি যান্ত্রিক শক্তিরাশির ক্রীড়নক। যদি কোনো শরীরের ছিদ্র দিয়ে বেরোয় তরল পদার্থ যেমন তরল পদার্থ বেরোতে পারে একটা প্রাচীন দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে বা মৃতদেহ থেকেতখন মনে হয় যেনো এটি তরল পদার্থ নির্গত করছে না, বরং তরল হয়ে যাচ্ছে : এটা একটা বিকট পচন।
নারীর কামবাসনা হচ্ছে মলাস্কের কোমল ধপধপানো। পুরুষ যেখানে প্রবৃত্তিতাড়িত, নারী সেখানে অধৈর্য মাত্র; নারীর প্রত্যাশা অক্রিয় থেকেও হয়ে উঠতে পারে ব্য; পুরুষ ইগল ও বাজপাখির মতোঝাঁপিয়ে পড়ে তার শিকারের ওপর; নারী প্রতীক্ষায় পড়ে থাকে মাংসাশী উদ্ভিদের মতো, জলাভূমির মতো, যাতে গ্রস্ত হয় পতঙ্গ ও শিশুরা। নারী হচ্ছে শোষণ, চোষণ, উদ্ভিজ্জমৃত্তিকা, পিচ ও আঠা, এক অক্রিয়অন্তঃপ্রবাহ, ধীরেধীরে-সুকৌশলে প্রবেশকারী ও চটচটে : অন্তত অস্পষ্টভাবে নারী নিজেকে অনুভব করে এভাবেই। তাই তার ভেতরে পুরুষের অধীনতাকরণের অভিপ্রায়কে প্রতিরোধ করার ইচ্ছেই শুধু নেই, বিরোধ আছে তার নিজের ভেতরেও। তার শিক্ষা ও সমাজ তার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে-ট্যাবু ও সংবাধ, তার সাথে অতিরিক্ত যুক্ত হয় কামানুভূতির অভিজ্ঞতা থেকে আগত বিরক্তি ও অস্বীকৃতি : এপ্রভাবগুলো পরস্পরকে এতো দূর বাড়িয়ে তোলে যে প্রথম সঙ্গমের পর প্রায়ই নারী তার কামনিয়তির বিরুদ্ধে অনেক বেশি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে আগের থেকে।
