পুরুষ ও নারীতে ‘দেহসংস্থানগত নিয়তি’ তাই সুগভীরভাবে ভিন্ন, এবং তাদের নৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতেও কম ভিন্ন নয়। পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতা নারীকে উত্সর্গ করেছে সতীত্বের কাছে; এবং কম-বেশি প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিয়েছে পুরুষের কামস্বাধীনতা, আর নারীকে আবদ্ধ করা হয়েছে বিবাহে। যৌনকর্মকে যদিও বিধানের দ্বারা পবিত্র বলে পৃথক করে রাখা হয় নি, তবু একটি সংস্কার বলে এটা নারীর জন্যে একটি দোষ, একটি পতন, একটি পরাজয়, একটি দুর্বলতা; নারীকে রক্ষা করতে হয় তার সতীত্ব, তার সম্মান; যদি সে ‘আত্মসমর্পণ করে’, যদি সে ‘পতিত হয়’, তাহলে তাকে তিরস্কার করা হয়; তার সম্ভোগকারীকে কিছুটা দোষী করা হলেও তাতে মিশে থাকে প্রশস্তিবোধ। আদিম কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত সব সময়ই সঙ্গমকে গণ্য করা হয়েছে একটি ‘সেবাদান’ বলে, যার জন্যে উপহার দিয়ে বা তার ভরণপোষণের অঙ্গীকার করে পুরুষ ধন্যবাদ জানায় নারীকে; কিন্তু সেবাদান হচ্ছে নিজেকে একটি প্রভুর কাছে দান করা; এ-সম্পর্কের মধ্যে কোনো পারস্পরিকতা নেই। বিয়ের প্রকৃতি, এবং তার সাথে বেশ্যাদের অস্তিত্ব থাকা, এর প্রমাণ : নারী নিজেকে দান করে, পুরুষ তাকে টাকা দেয় এবং তাকে ভোগ করে। কিছুই পুরুষকে প্রভুর ভূমিকা নিতে, নিকৃষ্ট প্রাণীদের ভোগ করতে নিষেধ করে না। দাসীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক মেনে নেয়া হয়েছে সব সময়ই, আর সেখানে যদি কোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারী দেহ দান করে গাড়ির চালককে বা বাগানের মালিকে, তাহলে সে হয় শ্রেণীচ্যুত। লোকাচার সব সময়ই বর্বরভাবে জাতিবিদ্বেষী আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের পুরুষদের অনুমতি দিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গিনীদের সাথে শুতে, গৃহযুদ্ধের আগে যেমন তেমনি আজো, এবং তারা। প্রভুসুলভ স্পর্ধার সাথে এ-অধিকারটি ভোগ করে; কিন্তু দাসপ্রথার কালে যদি কোনো শ্বেতাঙ্গিনী দেহসম্পর্ক করতো কোনো কৃষ্ণকায় পুরুষের সাথে, তাহলে তাকে দেয়া হতো মৃত্যুদণ্ড, এবং আজ সম্ভবত তাকে বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝুলোনো হবে।
একটি নারীর সাথে সে সঙ্গম করেছে, একথা বলার জন্যে পুরুষ বলে যে সে নারীটিকে ‘দখল’ করেছে, বা সে তাকে ‘পেয়েছে’; যে-নারী কোনো পুরুষকে জানে নি গ্রিকরা তাকে বলতো অপরাভূতা কুমারী; রোমানরা মেসালিনাকে বলতো ‘অপরাজিতা’ কেননা তার কোনো প্রেমিকই তাকে পুরো সুখ দেয় নি। তাই প্রেমিকের কাছে। প্রণয়কর্ম হচ্ছে জয়, বিজয়। পুরুষদের কামবিষয়ক শব্দসম্ভার নেয়া হয়েছে সামরিক পরিভাষা থেকে : প্রেমিকের আছে সৈনিকের তেজ, তার লিঙ্গ ধনুকের মতো টানটান, বীর্যপাত হচ্ছে ‘গুলি ছোঁড়া’; সে বলে আক্রমণ, হামলা, বিজয়ের কথা। তার যৌন উত্তেজনায় আছে বীরত্বের কিছুটা স্বাদগন্ধ। ‘প্রজননকর্মে,’ ল্য রাপর দুরিএ-তে বেন্দা লিখেছেন :
একজন মানুষ অধিকার করে আরেকজন মানুষকে, এটা একদিকে আরোপ করে একজন বিজয়ীর ধারণা, অন্যদিকে কোনো কিছু জয় করার ধারণা। বস্তুত, তাদের প্রেমের সম্পর্কের কথা বলার সময়চরম সভ্যরা বলে জয়, আক্রমণ, হামলা, অবরোধ, এবং প্রতিরোধ, পরাজয়, আত্মসমর্পণের কথা, তারা স্পষ্টভাবেই প্রেমের ধারণাটিকে রূপায়িত করে যুদ্ধের ধারণার আদলে। এ-কর্মটিতে একজন দূষিত করে আরেকজনকে, এবং এতে দূষণকারীকে ভূষিত করা হয় কিছুটা গৌরবে, এবং দূষিতকে কিছুটা অবমাননায়, এমনকি যখন সে সম্মতি দেয়।
এ-ভাষাশৈলি সূচনা করে একটি নতুন কিংবদন্তির : যথা, পুরুষটি নারীটির ওপর চাপিয়ে দেয় একটা কলুষ। বাস্তবিকপক্ষে, বীর্য বিষ্ঠাপ্রকৃতির নয়; ‘স্বপ্নদোষ’-এর কথা বলা হয়, কেননা এতে স্বাভাবিক উদ্দেশ্য সাধিত হয় না; কিন্তু কফি যদিও দাগ ফেলে হাল্কা-রঙের পোশাকে, তবু একে কেউ ময়লা বলে না, বলে না যে পাকস্থলিকে এটা ময়লা করবে। বরং, উল্টোভাবে, মনে করা হয় যে নারীই অশুচি, কেননা তার থেকে বেরোয় ‘নোংরা স্রাব’ এবং সে দূষিত করে পুরুষকে। যে কলুষিত করে, এমন একজন হওয়া একটা অত্যন্ত সন্দেহজনক শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে, পুরুষ তার বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত অবস্থান লাভ করে তার জৈবিকভাবে আক্রমণাত্মক ভূমিকার সঙ্গে নেতা বা প্রভু হিশেবে তার সামাজিক কর্মকাণ্ডকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার মধ্য দিয়ে; তার এ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্যেই শারীরবৃত্তিক পার্থক্যগুলো লাভ করে সব তাৎপর্য। বিশ্বে পুরুষ যেহেতু শাসনকর্তা, সে মনে করে যে তার কামনাগুলোর হিংস্রতা হচ্ছে তার সার্বভৌমত্বের একটি লক্ষণ; অতিশয় কামশক্তিসম্পন্ন পুরুষকে মনে করা হয় শক্তিশালী, বীর্যবান–এ-অভিধাগুলো নির্দেশ করে সক্রিয়তা ও সীমাতিক্ৰমণতা। অন্য দিকে, নারী যেহেতু একটি বস্তু, তাই তাকে বর্ণনা করা হয় উষ্ণ বা শীতল বলে, এর অর্থ হচ্ছে সে কখনো অক্রিয় গুণাবলি ছাড়া আর কোনো গুণ প্রকাশ করবে না।
যে-পরিবেশে, যে-আবহাওয়ায় জেগে ওঠে নারীর কাম, তা তাই বেশ ভিন্ন তার থেকে, যাতে পরিবৃত থাকে বয়ঃসন্ধির পুরুষ। তাছাড়া, নারী যখন প্রথমবার মুখোমুখি হয় পুরুষের, তখন নারীর কামের মনোভাব থাকে খুবই জটিল। অনেক সময় যে মনে করা হয় কুমারী মেয়ে কামবাসনার সাথে অপরিচিত এবং তাই পুরুষকে জাগাতে হবে তার কামাবেগ, তা ঠিক নয়। এ-কিংবদন্তিটি আবার প্রকাশ করে ফেলে পুরুষের আধিপত্য করার নৈপুণ্যের সত্য, যার মধ্যে পুরুষ প্রকাশ করে যে নারী কোনো উপায়েই, এমনকি তার জন্যে আকুলতার মধ্যেও, স্বাধীন হবে না। কিন্তু সত্য হচ্ছে যে বিপরীত লিঙ্গের সাথে সংস্পর্শই জাগায় প্রথম কামনা, এবং উল্টোভাবে কোনো কামনাপরায়ণ হাতের ছোঁয়া পাওয়ার অনেক আগে থেকেই অধিকাংশ তরুণী স্পর্শাদরের জন্যে বোধ করে উত্তেজিতভাবে আকুলতা।
