অধিকাংশ বয়স্ক মেয়ে, তা তারা কঠোর পরিশ্রমই করুক বা যাপন করুক চপল জীবন, তারা বাড়িতে বদ্ধই থাকুক বা উপভোগ করুক কিছুটা স্বাধীনতা, তাদের জন্যে একটি স্বামী পাওয়া–বা, কমপক্ষে একটি স্থির প্রেমিক পাওয়া ক্রমশ হয়ে ওঠে খুবই জরুরি ব্যাপার। এটা প্রায়ই নষ্ট করে বান্ধবীদের সাথে সম্পর্ক। শ্রেষ্ঠ বান্ধবী হারিয়ে ফেলে তার সম্মানজনক স্থান। তরুণী তার সঙ্গিনীদের মধ্যে মিত্রের বদলে দেখতে পায় প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি এমন একজনকে চিনতাম, যে ছিলো বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান, সে কবিতা ও সাহিত্যিক প্রবন্ধে নিজের বর্ণনা দিতে সুদূরের রাজকুমারী রূপে; আন্তরিকভাবেই সে ঘোষণা করেছিলোযে শৈশবসাথীদের জন্যে তার মনে কোনো ভালোবাসা নেই : তারা সাদামাটা ও নির্বোধ হলে তাদের তার মনে হতো বিরক্তিকর; আর সুন্দর হলে সে ভয় পেতো তাদের। একটি পুরুষের জন্যে অধীর ব্যগ্রতা, যাতে প্রায়ই থাকে কৌশলী পরিচালনা, ঠকানোর কৌশল, ও অবমাননা, তা সংকীর্ণ করে তরুণীর দিগন্ত : সে হয়ে ওঠে অহমিকাপরায়ণ ও বিচেতন। আর যদি সুদর্শন রাজকুমার দেখা দিতে দেরি করে, তাহলে মনে জমে ক্লান্তি ও তিক্ততা।
তরুণীর চরিত্র ও আচরণ তার পরিস্থিতিরই ফল : এটা বদলালে তরুণী মেয়েও ধরবে আরেক রূপ। আজকাল তার পক্ষে নিজের ভাগ্যের ভার কোনো পুরুষের হাতে দেয়ার বদলে নিজের হাতে নেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে। যদি সে নিয়োজিত থাকে পড়াশুনোয়, খেলাধুলোয়, পেশাগত প্রশিক্ষণে, বা কোনো সামাজিক বা রাজনীতিক ক্রিয়াকর্মে, সে মুক্তি পায় পুরুষভাবনার আবিষ্টতা থেকে, তার ভাবাবেগ ও কামের বিরোধ নিয়ে সে অনেক কম ব্যস্ত থাকে। তবুও, একজন স্বাধীন মানুষ হিশেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভে যুবকের থেকে তার অসুবিধা অনেক বেশি। আমি দেখিয়েছি যে তার পরিবার বা লোকাচার এদিকে তার উদ্যোগের অনুকূল নয়।
অধিকন্তু, যখন সে স্বাধীনতাও বেছে নেয় নিজের জন্যে তখনও তার জীবনে একটি স্থান থাকে পুরুষের জন্যে, প্রেমের জন্যে। সে ভয় পেতে পারে যে যদি সে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োগ করে কোনোকাজে, তাহলে সে হয়তো হারিয়ে ফেলবে তার নারীসুলভ নিয়তি। প্রায়ই এ-বোধটা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয় না, কিন্তু এটা আছে; এটা দুর্বল করে তোলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে, এটা বেঁধে দেয় সীমানা। যাই হোক, যে-নারী কোনো কাজ করে সে তার পেশাগত সাফল্যকে খাপ খাওয়াতে চায় তার একান্ত নারীসুলভ সিদ্ধির সাথে; এটা শুধু বোঝায় না যে বেশ খানিকটা সময়। তাকে দিতে হবে তার রূপের জন্যে, যা আরোগুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে তার প্রাণশক্তিগত আগ্রহগুলো ভেঙে পড়ে নানা ভাগে। তাকে ভাবতে হয় তার দৈহিক রূপ সম্বন্ধে, পুরুষ সম্পর্কে, প্রেম সম্পর্কে; সে ততোটুকুই মনোযোগ দেয় পড়াশুনোয়, পেশায় যতোটা না দিলেই চলে না। এটা মানসিক দুর্বলতার, বা মনোযোগের অসামর্থ্যের ব্যাপার নয়, বরং এটা আগ্রহগুলোর মধ্যে এমনভাবে খণ্ডখন্ড হয়ে যাওয়ার ব্যাপার, যেগুলোর মধ্যে সঙ্গতিবিধান খুবই কঠিন। গড়ে ওঠে একটা দুষ্টচক্র এবং প্রায়ই এটা দেখে স্তম্ভিত হতে হয় যে যখন নারী একটি স্বামী পায় তখন কতো তাড়াতাড়ি সে ছেড়ে দিতে পারে সঙ্গীতচর্চা, পড়াশুনো, পেশা। সব কিছু দল বাধে তার ব্যক্তিগত আকাঙ্খ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে, এবং বিয়ের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্যে তার ওপর এখনো পড়ে বিপুল সামাজিক চাপ। এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করা হয় যে সে বিশ্বে নিজের জন্যে স্থান সৃষ্টি জন্যে নিজের চেষ্টায় কিছু করবে না বা করবে ভীরুভাবে। যতদিন না সমাজে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবে আর্থিক সাম্য আর যতোদিন লোকাচার স্ত্রী বা রক্ষিতা হিশেবে পুরুষের কাছে থেকে সুযোগসুবিধা নেয়াকেই অনুমোদন করবে নারীর জন্যে, ততোদিন টিকে থাকবে তার অনর্জিত স্বপ্ন এবং ব্যাহত হবে তার নিজের সিদ্ধি।
কামদীক্ষা
দ্বিতীয় খণ্ড । ভাগ ৪ –গঠনের বছরগুলো। পরিচ্ছেদ ৩
এক অর্থে, নারীর কামদীক্ষা, পুরুষের মতোই, শুরু হয় তার আদি শৈশবে। মৌখিক, পায়ুগত, ও কামপ্রত্যঙ্গগত পর্ব থেকে বয়ঃপ্রাপ্তি পর্যন্ত একটা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষাগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে চলতেই থাকে। তবে তরুণীর কামের অভিজ্ঞতাগুলো শুধুই তার আগের যৌন কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ নয়; প্রায়ই সেগুলো অপ্রত্যাশিত ও বিসদৃশ; এবং সেগুলোর সব সময়ই থাকে নতুন ঘটনার প্রকৃতি, অতীতের সাথে ঘটায় বিচ্ছিন্নতা। যখন সে বাস্তবিকভাবে যেতে থাকে এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, তখন তরুণীর সমস্ত সমস্যা লাভ করে তীক্ষ্ণ ও জরুরি প্রতীকরূপ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহজেই কেটে যায় এ-সংকট, কিন্তু আছে নানা বিয়োগান্তক উদাহরণ যেগুলোতে পরিস্থিতির সমাধান ঘটে শুধু মৃত্যুতে উন্মত্ততায়। সব ক্ষেত্রেই এসময়ে তার মধ্যে জাগে যে-প্রতিক্রিয়া, তা দিয়ে তীব্রভাবে প্রভাবিত হয় নারীর ভবিষ্যৎ। নারীর প্রথম কামাভিজ্ঞতার চরম গুরুত্ব সম্পর্কে সব মনোচিকিৎসকই একমত : সেগুলোর প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয় নারীর বাকি জীবন ভরে।
বিবেচ্য পরিস্থিতিটি—জৈবিক, সামাজিক, ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে–গভীরভাবে ভিন্ন। পুরুষ ও নারীর বেলা। পুরুষের জন্যে শৈশব কাম থেকে প্রাপ্তবয়স্কতায় উত্তরণ আপেক্ষিকভাবে সহজ:এতে কামসুখ হয়বস্তু-আশ্রিত, কেননা কামনা নিজের সীমার মধ্যে বাস্তবায়িত না করে চালনা করা হয় আরেকটি ব্যক্তির দিকে। লিঙ্গের দাঁড়ানো হচ্ছে এ-প্রয়োজনের অভিব্যক্তি; শিশ্ন নিয়ে, হাত, মুখ, তার সারা শরীর নিয়ে পুরুষ এগোয় তার সঙ্গিনীর দিকে, তবে সে নিজে থাকে এ-কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে, সব কিছু। মিলিয়ে সে থাকে কর্তা, এর বিপরীতে থাকে কর্মগুলো, যেগুলোকে সে উপলব্ধি করে এবং যে-করণগুলোকে সে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে; সে নিজের স্বাধীনতা না হারিয়ে নিজেকে প্রক্ষেপ করে অপরের দিকে তার কাছে নারীর দেহ একটি শিকার, এবং এটির মাধ্যমে সে প্রবেশাধিকার পায় তার কাম্য গুণাবলিতে, যেমন পায়প্রতিটি বস্তুতে। একথা সত্য যে সে নিজের জন্যে বাস্তবিকভাবে সফল হয় না ওগুলো। অধিকার করতে, তবে অন্তত সে ওগুলোকে আলিঙ্গন করে। প্রণয়স্পর্শ, চুমমা বোঝায় একটা আংশিক পরীক্ষা; তবে এ-পরীক্ষা নিজেই এক ধরনের উদ্দীপক ও আনন্দ। সঙ্গমের কাজটি সম্পূর্ণতা লাভ করে কামপুলকে, যা সঙ্গমের স্বাভাবিক পরিণতি। সঙ্গমের আছে এক নির্দিষ্ট জৈবিক পরিণতি ও লক্ষ্য; বীর্যপাতের ফলে পুরুষ মুক্তি পায় কিছু অস্বস্তিকর নিঃসরণ থেকে; কামোত্তেজনার পর সে লাভ করে সম্পূর্ণ উপশম, যাতে সব সময়ই থাকে চরম সুখ। একথা সত্য যে এ-সুখই একমাত্র লক্ষ্যবস্তু নয়; প্রায়ই এর পর থাকে হতাশা : প্রয়োজনটা মিটে গেছে, যদিও পুরুষটি সব দিকে তৃপ্তি পায় নি। যা-ই ঘটুক না কেননা, একটি সুনির্দিষ্ট কর্ম সম্পন্ন হয়েছে। এবং পুরুষটির দেহ টিকিয়ে রেখেছে তার সংহতি : প্রজাতির প্রতি তার দায়িত্ব পালনের সাথে মিলেছে তার ব্যক্তিগত সুখ।
