তরুণী যদি নিজেকে এলোমেলো অশোভনভাবে ছুঁতে বা চুমো খেতে দেয়, তাহলে সে এর প্রতিশোধ নেয় তার নাচের সঙ্গীটির মুখের ওপর বা তার সঙ্গীদের সাথে উচ্চহাস্যে ফেটে পড়ে। দুটি তরুণীর কথা আমার মনে পড়ছে, রেলগাড়ির কামরায় একরাতে, যাদের একজনের পর আরেকজনকে ‘আদর’ করে চলছিলো এক ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী, যে স্পষ্টভাবেই উপভোগ করছিলো তার সৌভাগ্য; মেয়ে দুটি থেকে থেকে উন্মত্ত উচ্চহাস্য করে উঠছিলো, কাঁচা বয়সের বৈশিষ্ট্যসূচক আচরণ অনুসারে তারা আবর্তিত হচ্ছিলো কাম ও লজ্জার মিশ্রণের মধ্যে।
এ-তরুণ বয়সে মেয়েরা যেমন ব্যবহার করে রূঢ় ভাষা তেমনি হাসে উন্মত্ত হাসি : তাদের কারো কারো আছে এমন শব্দভাণ্ডার, যা তাদের ভাইদের গাল রাঙিয়ে দিতে পারে; সন্দেহ নেই এ-ভাষা তাদের কাছে অনেক কম জঘন্য মনে হয়, কেননা, আধাঅজ্ঞতার মধ্যে তারা যে-সব প্রকাশভঙ্গি ব্যবহার করে, সেগুলো তাদের মনে কোনো যথাযথ ছবি জাগায় না; তাছাড়া এসব ছবি জাগিয়ে তোলা নয়, বরং তাদের অভিপ্রায় এগুলো রোধ করা, কমপক্ষে এগুলো স্নান করা। বিদ্যালয়ের মেয়েরা একে-অন্যকে বলে যে-সব নোংরা গল্প, সেগুলোর উদ্দেশ্য তাদের যৌনকামনা পরিতৃপ্ত করা নয়, বরং কাম অস্বীকার করা; তারা দেখতে চায় যান্ত্রিক বা দৃশ্যত-শল্যকর্মরূপে এর কৌতুককর দিকটা। তবে উচ্চহাস্যের মতো, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার নিতান্তই একটি যুদ্ধের কৌশল নয় : এটা এক রকমের বয়স্কদের বিরুদ্ধাচারণ, এক ধরনের পবিত্রবস্তুকে অসম্মানকরণ, একটা স্বেচ্ছাকৃত ভ্ৰষ্ট আচরণ। প্রকৃতি ও সমাজকে অবজ্ঞা করে তরুণী মেয়ে নানা অদ্ভুত উপায়ে তাদের যুদ্ধে আহ্বান করে ও নিভীকভাবে তাদের সম্মুখীন হয়। প্রায়ই দেখা যায়খেয়ালি খাদ্যাভ্যাস : সে খায় পেন্সিলের সীসা, গালার চাকতি, কাঠের টুকরো, জ্যান্ত চিংড়ি; সে গেলে ডজন ডজন অ্যাসপিরিন টেবলেট; সে এমনকি খায় মাছি আর মাকড়সা। যা ‘ঘেন্না জাগায়’, তা প্রায়ই তাকে আকৃষ্ট করে।
এ-মনোভাব আরো স্পষ্টতবে প্রদর্শিত হয় নিজের অঙ্গ নিজে ছেদনে, যা এবয়সে বেশ দেখা যায়। তরুণী মেয়ে ক্ষুর দিয়ে গভীর করে কাটতে পারে তার উরু, নিজের গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁক দিতে পারে, নিজের চামড়া ছুলে ফেলতে পারে; একটা ক্লান্তিকর উদ্যান পার্টি এড়ানোর জন্যে আমার তরুণ বয়সের এক বান্ধবী একটি ছোটো কুড়াল দিয়ে মারাত্মকভাবে কেটে ফেলেছিলো তার পা, যার জন্যে তাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিলো ছ-সপ্তাহ। এ-ধর্ষ-মর্ষকামী কাজগুলো একই সঙ্গে যৌন অভিজ্ঞতার পূর্বাভাস এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সে নিজেকে কঠিন করে তোলে সম্ভাব্য সব অগ্নিপরীক্ষার জন্যে এবং হ্রাস করে সেগুলোর কঠোরতা, এমনকি বিয়ের রাতের অগ্নিপরীক্ষার কঠোরতাও। যখন সে তার স্তনের ওপর রাখে একটা শামুক, গিলে ফেলে এক কৌটো অ্যাসপিরিন টেবলেট, নিজেকে আহত করে, তখন তরুণী অবজ্ঞা ছুঁড়ে দেয় তার ভবিষ্যৎ প্রেমিকের প্রতি-‘আমি নিজের ওপর যা করি তুমি তার থেকে বেশি ঘৃণ্য কিছু করতে পারবে না’। এগুলো হচ্ছে কামদীক্ষার প্রতি গর্বিত ও চাপা ক্রোধযুক্ত ইশারা।
পুরুষের অক্রিয় শিকার হওয়ার জন্যে নির্ধারিত হয়ে এমনকি যন্ত্রণা ও ঘৃণার মধ্যেও মেয়ে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে তার স্বাধীনতার অধিকার। যখন সে নিজেকে কাটে বা ঘঁাক দেয়, সে প্রতিবাদ জানায়তার যোনিচ্ছদছিন্নকরণরূপ শূলবিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে : রদ করার মাধ্যমে সে জানায় প্রতিবাদ। সে মর্ষকামী, এতে যে তার আচরণ তাকে যন্ত্রণা দেয়, কিন্তু সর্বোপরি সে ধর্ষকামী : একটি স্বাধীন কর্তারূপে সে চাবুক মারে, অবজ্ঞা করে, পীড়ন করে এ-পরনির্ভর মাংসকে, এ-মাংস, যা দণ্ডিত হয়েছে আনুগত্যে, যা সে ঘৃণা করে। তবে নিজেকে সে এর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করে না। কেননা সব কিছু সত্ত্বেও, সত্যিকারভাবে সে তার নিয়তি বর্জন করাকে বেছে নেয়। তার ধর্ষ-মর্ষকামী বিকৃতির আছে একটা প্রাথমিক আন্তরিকতাহীনতা : মেয়েটি যদি নিজেকে তা চর্চা করতে দেয়, তাহলে বোঝায় যে রদ করার মাধ্যমে সে মেনে নিচ্ছে সেই নারীসুলভ ভবিষ্যৎ, যা রক্ষিত তার জন্যে; সে তার মাংসকে ঘৃণাভরে বিকৃত করতো না যদি না সে প্রথমে নিজেকে মাংস হিশেবে স্বীকার করে নিতো।
যে-মিথ্যাচারে দণ্ডিত তরুণী, তা হচ্ছে তাকে ভান করতে হবে যে সে একটি বস্তু, এবং একটি আকর্ষণীয় বস্তু; নিজের ত্রুটিগুলো সম্পর্কে সচেতন থেকেই সে নিজেকে বোধ করতে থাকে একটি অনিশ্চিত, বিচ্ছিন্নকৃত সত্তারূপে। প্রসাধন, নকল চুল, কোমরবন্ধ, এবং ‘দৃঢ়ীভূত’ বক্ষবন্ধনি সবই মিথ্যাচার। তার মুখটিই হয়ে ওঠে মুখোশ : স্বতস্ফূর্ত অভিব্যক্তিগুলোকে চতুরতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, ভান করা হয়। কৌতূহলজাগানো অক্রিয়তার; হঠাৎ কোনো তরুণীর মুখাবয়ব আবিষ্কারের থেকে কিছুই বেশি বিস্ময়কর নয়, যখন এটি নারীসুলভ ভূমিকাগুলো পালন করে তখন এটি সুপরিচিত; সীমাতিক্ৰমণতাকে বর্জন করে এটি অনুকরণ করে সীমাবদ্ধতার চোখ আর অন্তর্ভেদ করে না, প্রতিফলিত করে; দেহটি আর জীবন্ত নয়, এটা প্রতীক্ষা করে; প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ও হাসি হয়ে ওঠে আবেদন। নিরস্ত্র, বর্জনীয়, তরুণী এখন একটি নিবেদিত ফুল মাত্র, এমন একটি ফল, যাকে ছিঁড়ে নিতে হবে।
