সে গর্ব বোধ করে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, পুরুষের অনুরাগ জাগিয়ে, কিন্তু যা তাকে ক্ষুব্ধ করে, তা হচ্ছে ধরা পড়ে যাওয়া। বয়ঃসন্ধির সঙ্গে সে পরিচিত হয়েছে লজ্জাবোধের সাথে; এবং এটা চলতে থাকে তার ছেনালিপনা ও অহমিকার সাথে মিলেমিশে। পুরুষের দৃষ্টি তাকে একই সঙ্গে খুশি ও আহত করে; সে চায় সে যেটুকু দেখাতে চায় সেটুকুই দেখতে পাক : চোখ সব সময়ই অতি অন্তর্ভেদী। তাই দেখা দেয় অসামঞ্জস্য, যা পুরুষের কাছে ব্রিতকর : তরুণী প্রদর্শন করে তার দেকলতে, তার পা, এবং যখন সেগুলোর দিকে কেউ তাকায় তার মুখ লাল হয়ে ওঠে, সে বিব্রত বোধ করে। সে পুরুষকে প্রজ্জ্বলিত করে সুখ পায়, কিন্তু সে যদি দেখে যে সে জাগিয়েছে পুরুষের কামনা, সে ঘেন্নায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়। পুরুষের কামনা যতোখানি প্রশংসাসূচক ঠিক ততখানিই মনোকষ্টদায়ক; সে নিজের মোহনীয়তার জন্যে নিজেকে যতোটা দায়ী মনে করে বা মনে করে সে এটা প্রদর্শন করছে নিজের ইচ্ছেয়, সে ততখানি সুখ পায় নিজের বিজয়ে, কিন্তু তার মুখ, তার দেহগঠন, তার মাংস এতে যতোটা ভূমিকা পালন করে সে ততোখানি এদের লুকোতে চায় এ-স্বাধীন অপরিচিতের কাছে থেকে যে এগুলোকে ভোগের কামনা বোধ করে।
এখানেই আছে এ প্রাথমিক বিনয়ের গভীরতর অর্থ, যা ব্রিতকরভাবে ব্যাহত করে সাহসীতম ছেনালিপনাগুলোকে। একটা ছোটো মেয়ে বিস্ময়করভাবে দুঃসাহসী হতে পারে, কেননা সে বোঝে না যে উদ্যোগ গ্রহণ করে সে প্রকাশ করছে তার অক্রিয়তা : যখনই সে এটা দেখতে পায়, সে ভীত ও বিরক্ত বোধ করে। কিছুই। তাকানোর থেকে বেশি দ্ব্যর্থবোধক নয়; এটা থাকে দূরে, দূরে থাকা অবস্থায় একে মনে হয় সশ্রদ্ধ, কিন্তু এটা অচেতনভাবেই দখল করে নেয় দেখা মূর্তিকে। অপরিণত নারী লড়াই করে এ-প্রলোভনের মধ্যে। সে শুরু করে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে টানটান করে তোলে এবং দমন করে তার জেগে ওঠা কামনা। তার এখনো-অস্থির দেহে আদরকে একবার মনে হয় একটা কোমল চাপ বলে, তারপরই মনে হয় একটা অস্বস্তিকর কাতুকুতু বলে; একটি চুমো প্রথমে তাকে আলোড়িত করেতোলে, তারপরই তাতে সে হেসে ওঠে; প্রতিটি সমর্পণের পরই দেখা দেয় বিদ্রোহ; সে পুরুষকে চুমো খেতে দেয়, কিন্তু সে তার ঠোট মোছার অভিনয় করে; সে সুস্মিত হাসে ও প্রীতিময় থাকে, কিন্তু তারপরই হয়ে ওঠে শ্লেষপূর্ণ ও শত্রুতামূলক; সে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবেই সেগুলো ভুলে যায়।
এভাবেই একটি শিশুসুলভ ও যুক্তির বিপরীতধর্মী চরিত্র প্রদর্শন করে ‘অপক্ক ফল’টি নিজেকে রক্ষা করে পুরুষের থেকে। তরুণী মেয়েকে প্রায়ই বর্ণনা করা হয় এমন অর্ধ-বন্য অর্ধ-পোষমানা প্রাণীরূপে। কলেৎ, উদাহরণস্বরূপ, একে চিত্রিত করেছেন তার ক্লদিন অ লেকল-এ এবং ব্লে এ এরব-এও সম্মোহিনী ভিকারূপে। সে তার বিশ্বের প্রতি বোধ করে একটা তীব্র আগ্রহ এবং সার্বভৌম রীতিতে শাসন করে তাকে; তবে ঔৎসুক্য বোধ করে পুরুষের প্রতিও এবং তার জন্যে বোধ করে ইন্দ্রিয়াতুর ও রোম্যান্টিক কামনা। কাঁটাগাছের ঝোপে ছিড়েফেড়ে যায় ভিকা, সে বাগদাচিংড়ি ধরে, গাছে চড়ে, তবুও শিউরে ওঠে যখন তার খেলার সাথী ফিল তার হাত ছোঁয়; সে অনুভব করে সে-উত্তেজনা, যাতে দেহ পরিণত হয় মাংসে এবং নারী প্রথম প্রকাশ পায় নারীরূপে। কামনা জাগার পর, সে চায় রূপসী হতে : কখনো কখনো সে তার কেশবিন্যাস করে, প্রসাধন করে, পরে মিহিমসৃণ অর্গান্ডি, সে নিজে নিজে মজা পায় ছেনাল ও মনোমোহিনী হয়ে উঠে; তবে সে যেনো চায় অন্যদের জন্যে নয়, নিজের জন্যে বাঁচতে, তাই কখনো কখনোপরে অমার্জিত পোশাক বা অশোভন ট্রাউজার্স; তার একটা বড়ো অংশ মেনে নেয় না ছেনালিপনা এবং একে মনে করে নীতিবিসর্জন। তাই সে ইচ্ছাকৃতভাবে নখে কালি মাখে, চুল আঁচড়ায় না এবং থাকেনোংরা ও অসংবৃত। এ-বিদ্রোহী আচরণ তাকে করে তোলে এমন বেঢপ, যাতে তার বিরক্তি লাগে; এতে সে রুষ্ট হয়, লজ্জা লাগে, আবার দ্বিগুণ করে তোলে তার অমার্জিততা, এবং মনোমমাহিনী হওয়ার জন্যে তার ব্যর্থ প্রয়াসের কথা ভেবে ঘৃণায় কেঁপে ওঠে। এ-পর্যায়ে তরুণী মেয়ে আর শিশু হতে চায় না, তবে সে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াকেও মেনে নেয় না, এবং নিজেকে ফিরে ফিরে তিরষ্কার করে তার বালসুলভতা ও তার নারীসুলভ দাবিত্যাগের জন্যে। সে আছে এক অবিরাম প্রত্যাখ্যানের অবস্থায়।
এটা সে-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা বিশিষ্টতা দেয় তরুণীকে এবং আমাদের দেয় তার অধিকাংশ আচরণের জট খোলার চাবি; তার জন্যে প্রকৃতির ও সমাজের নির্ধারিত নিয়তি সে মেনে নেয় না; তবে সে তা পুরোপুরি অস্বীকারও করে না; সে নিজের বিরুদ্ধে এতে বিভক্ত যে বিশ্বের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে না; সে নিজেকে। সীমাবদ্ধ রাখে বাস্তবতা থেকে পলায়নের বা তার বিরুদ্ধে একটা প্রতীকী যুদ্ধের মধ্যে। তার প্রতিটি বাসনার আছে সেটির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উদ্বেগ : সে ব্যগ্র তার ভবিষ্যৎকে অধিকার করতে, কিন্তু সে ভয় পায় অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে; সে একটি পুরুষ অধিকার করতে চায়, তবে সে চায় না যে পুরুষটি তাকে অধিকার করুক তার শিকাররূপে। এবং প্রতিটি ভয়ের পেছনে ওত পেতে থাকে একটি করে বাসনা : বলাকার তাকে আতঙ্কিত করে, তবে সে ব্যাকুল হয়ে ওঠে অক্রিয়শীলতার জন্যে। এভাবে সে দণ্ডিত হয় আন্তরিকতাহীনতায় ও তার সমস্ত ছলচাতুরিতে; সে উন্মুখ থাকে সব রকম নেতিবাচক আবিষ্টতার প্রতি, যা প্রকাশ করে উদ্বেগ ও বাসনার পরস্পরবিপরীত মূল্যের বিদ্যমানতা।
