এটা এক চূড়ান্ত বিকার, তবে প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক। নারী হওয়ার জন্যে যে-সব পরিস্থিতি তাকে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনে বাধা দিতো, সে-সব পরিস্থিতিতে নিজের অহমিকা উন্নত রাখার বাসনায় মারি বাশকির্তসেভ এক কাল্পনিক ভাবাবেগপূর্ণ সম্পর্ক লালন করতেন এক অগম্য সামন্তপুরুষের সাথে। তিনি হতে চেয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কেউ, কিন্তু স্কার্ট পরে তা কী করে হওয়া যায়? তাঁর দরকার পড়ে একটি পুরুষের, তবে পুরুষটিকে হতে হবে শ্রেষ্ঠতম। ‘পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের কাছে নিজেকে নত করা হচ্ছে উৎকৃষ্টতর নারীদের শ্রেষ্ঠতম গর্ব,’ লিখেছেন তিনি। তাই আত্মরতি নিয়ে যায় মর্ষকামের দিকে। অন্যদের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ লীন করা হচ্ছে অন্যদেরকে নিজের মধ্যে ও নিজের জন্যে বাস্তবায়িত করা। নিরোর প্রেম পেয়ে মারি বাশকির্তসেভ হয়ে উঠবেন নিরো। বস্তুত, শূন্যতার এ-স্বপ্ন হচ্ছে হয়ে ওঠার এক গর্বিত ইচ্ছে; সত্য হচ্ছে তিনি কখনো এমন কোনো অসাধারণ পুরুষের দেখা পান নি যে তার মধ্যে হারিয়ে ফেলবেন নিজেকে। নিজের তৈরি দেবতা, যে সব সময় সুদূরে থাকে, তার সামনে নতজানু হওয়া এক কথা, আর কোনো রক্তমাংসের পুরুষের কাছে নত হওয়া অন্য কথা। অনেক তরুণী বাস্তবতার জগতেও টিকিয়ে রাখে এ-স্বপ্ন; তারা খোঁজে এমন একজন পুরুষ, যে সব কিছুতে সকলের থেকে উৎকৃষ্ট, যার আছে ধন ও খ্যাতি, সে এক পরম কর্তা, যে তার প্রেমে তাদের ভূষিত করবে তার মহিমা ও অপরিহার্যতায়। এ-স্বপ্ন তাদের প্রেমকে আদর্শায়িত করে সে পুরুষ বলে নয়, বরং সে সেই মহিমান্বিত সত্তা বলে। ‘আমি চাই দানব, কিন্তু শুধু পুরুষ দেখতে পাই,’ এক বান্ধবী বলেছিলো আমাকে।
এ-আত্মরতিমূলক আত্মসমর্পণের বাইরে কিছু তরুণী বাস্তবসম্মতভাবেই বোধ করে যে তাদের একজন পথপ্রদর্শক, একজন শিক্ষক দরকার। পিতামাতার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেয়ে এ-অনভ্যস্ত স্বাধীনতাকে তাদের মনে হয় অস্বস্তিকর; তারা লঘুচপলতা ও অসংযমে পতিত হয়ে এর নেতিবাচক প্রয়োগ ছাড়া আর কিছু করে উঠতে পারে না; তারা ছেড়ে দিতে চায় তাদের মুক্তি। জনপ্রিয় উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের একটি মান ছক হচ্ছে অস্থিরমতি, রাগী, বিদ্রোহী, ও দুঃসহ তরুণীর গল্প, যে প্রেমের মাধ্যমে বশ মানে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কোনো পুরুষের কাছে : এটা এমন এক শস্তা জিনিশ, যা একই সাথে শ্লাঘা জাগায় পুরুষ ও নারীর। মার্কিন নারীদের জেদি গর্ববোধ সত্ত্বেও হলিউডের চলচ্চিত্র বারবার দেখিয়েছে স্বামী বা প্রেমিকদের শুভ নিষ্ঠুরতা কীভাবে বশ মানায় বেপরোয়া তরুণীদের : একটি বা দুটো চড়, তার চেয়ে ভালো পাছায় বেশ কয়েকটা ঘা, এটাই তাদের সঙ্গমে সম্মত করার সুনিশ্চিত পদ্ধতি।
কিন্তু আদর্শায়িত প্রেম থেকে যৌন প্রেমে উত্তরণ বাস্তবে এতো সহজ নয়। অনেক নারী সযত্নে এড়িয়ে যায় তাদের প্রিয় জিনিশের কাছাকাছি আসা, তারা ভয় পায় যে তারা প্রতারিত হতে পারে। যদি বীরটি, দানবটি, নরদেবতাটি সাড়া দেয় তার। জাগানো প্রেমের ডাকে এবং একে রূপান্তরিত করে কোনো সত্যিকার অভিজ্ঞতায়, তাতে ভয় পায় তরুণী; তার দেবতা হয়ে ওঠে একটি পুরুষ, যার থেকে সে ঘেন্নায়সরে আসে। অনেক ছেনাল মেয়ে আছে, যারা তাদের কাছে যে-পুরুষকে আকর্ষণীয় বা মনোহর মনে হয়, তাদের আকৃষ্ট করতে গিয়ে তারা কিছুতেই থামে না, কিন্তু তারা অসঙ্গতভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যখন সে পুরুষ তাদের প্রতি প্রাণবন্তভাবে। মনোযোগ দেয়; সে অগম্য বলেই পুরুষটি তাদের মনে আবেদন জাগায় : প্রেমিক হিশেবে তাকে মনে হয় খুবই সাদামাটা- ‘অন্যদের মতোই সে একটি পুরুষমাত্র’। মেয়েটি তার মর্যাদাহানির জন্য দোষ দেয় পুরুষটিকে, একে সে অজুহাতরূপে। ব্যবহার করে এড়িয়ে যায় দৈহিক সম্পর্ক, যা ভীত করে তার কুমারী সংবেদনশীলতাকে। যখন সে ধরা দেয় তার ‘আদর্শ’-এর কাছে, তার বাহুবন্ধনে সে থাকে শীতল, এবং স্টেকেল যেমন বলেছেন, ‘কখনো কখনো এমন ঘটনার পর অহঙ্কারী মেয়ে আত্মহত্যা করে, বা ধসে পড়ে তার প্রণয়াকুল কল্পনার সমগ্র সৌধ, কেননা সে-আদর্শটির প্রকাশ ঘটে একটি “বর্বর জন্তু”রূপে’।
অসম্ভবের জন্যে এ-বাসনা প্রায়ই তরুণীকে ঠেলে দেয় সে-পুরুষের প্রেমে পড়ার দিকে, যে আগ্রহী তার কোনো বান্ধবীর প্রতি, এবং প্রায়ই সে হয় বিবাহিত পুরুষ। ডন জোয়ানকে দিয়ে সে নির্দ্বিধায় মুগ্ধ হয়; সে পরাভূত ও অধীন করতে চায় এরমণীবল্লভকে, যাকে কোনো নারীই দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারে নি; সে লালন করতে থাকে তাকে সংশোধনের বাসনা, যদিও জানে সে ব্যর্থ হবে, এবং তার পছন্দের এটাই একটি কারণ। কিছু মেয়ে চিরকালের জন্যে অসমর্থ হয়ে ওঠে প্রকৃত ও সম্পূর্ণ প্রেমের। জীবনভর তারা চায় এক আদর্শ অসম্ভবকে বাস্তবায়িত করতে।
মেয়ের আত্মরতি এবং তার কাম দিয়ে যে-অভিজ্ঞতার জন্যে সে নির্ধারিত, তার মধ্যে রয়েছে স্পষ্টত বিরোধ। নারী শুধু তখনই নিজেকে মেনে নেবে অপ্রয়োজনীয় বলে যদি সে নিজেকে আবিষ্কার করে দাবিত্যাগের কর্মে। নিজেকে একটি বস্তু হতে দিয়ে সে রূপান্তরিত হয় একটি প্রতিমায় এবং সগর্বে নিজেকে দেখে এ-রূপে; তবে সে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এ-নিষ্করুণ যুক্তি, যা তাকে আরো অপ্রয়োজনীয় করেতোলে। একটি বস্তু মনে করা নয়, তার ভালো লাগতো একটা মুগ্ধকর আকর্ষণীয় সম্পদ হতে পারলে। সে ভালোবাসে ঐন্দ্রজালিক প্রবাহসম্পন্ন এক বিস্ময়কর প্রেতাশ্রিত-বস্তুরূপে প্রতিভাত হতে, সে নিজেকে দেখতে চায় না মাংসরূপে, যা দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, ক্ষতার্ত করা যায় : পুরুষ এভাবেই শিকার হিশেবে পছন্দ করে নারীকে, তবে পালিয়ে যায় মানুষখেকো রাক্ষসী দিমিতার।
