তাকে যেহেতু পুরুষের ভূমিকা নিতে হবে, তাই প্রিয়া অবিবাহিতা হলেই ভালো হয়: বিয়ে সব সময় তরুণী অনুরাগিণীকে হতোদ্যম করে না, তবে এটা তাকে বিরক্ত করে; সে পছন্দ করে না যে তার অনুরাগের বস্তুটি থাকবে কোনো স্বামী বা প্রেমিকের অধীনে। অধিকাংশ সময়ই এ-সংরাগগুলো দেখা দেয় গোপনে, বা কমপক্ষে এক প্রাতোয়ী স্তরে। ম্যাটশন ইন ইউনিফর্ম-এ যখন ডরোথি ভিয়েক চুমো খায়হেটা থিলের ঠোটে, তখন চুমোটি একই সাথে মাতৃধর্মী ও কামময়। নারীদের মধ্যে রয়েছে এমন দুষ্কর্মের সহযোগিতা, যা নষ্ট করে শালীনতাবোধ; তারা একজন আরেকজনের মধ্যে জাগায় যে-উত্তেজনা, তা সাধারণত হিংস্রতাহীন; সমকামী শৃঙ্গারে থাকে না সতীচ্ছদছিন্নকরণ বা বিদ্ধকরণ : নতুন ও উদ্বেগজাগানো পরিবর্তন না চেয়ে তারা তৃপ্ত করে শৈশবের ভগাঙ্কুরীয় কাম। তরুণী নিজেকে গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ না করে অক্রিয় বস্তুরূপে বাস্তবায়িত করতে পারে তার বৃত্তি। রেনি ভিভিয়ে এটাই প্রকাশ করেছেন কোনো কোনো কবিতায়, যাতে তিনি গেয়েছেন তাদের লঘু স্পর্শ ও কমনীয় চুম্বনের গান, যারা একই সাথে প্রেমিকা ও বোন, যাদের শৃঙ্গার ঠোটে বা স্তনে কোনো ছাপ ফেলে না।
ওষ্ঠ ও স্তন শব্দের কাব্যিক অনৌচিত্যের মধ্যে সে তার বান্ধবীকে যে-প্রতিশ্রুতি দেয়, স্পষ্টভাবে তা হচ্ছে যে সে বান্ধবীকে বলাৎকার করবে না। এবং আংশিকভাবে হিংস্রতার, বলাক্তারের ভয়েই কিশোরী মেয়ে অনেক সময় তার প্রথম প্রেম দান করে কোনো পুরুষের বদলে কোনো বয়স্ক নারীকে। বালিকার চোখে ওই পুরুষধর্মী নারীটি হয়ে ওঠে তার বাবা ও মা উভয়ের প্রতিমূর্তি : তার আছে বাবুর কর্তৃত্ব ও সীমাতিক্ৰমণতা, সে হচ্ছে মূল্যবোধের উৎস ও মানদণ্ড, সে অতিক্রম করে যায় বিদ্যমান বিশ্বকে, সে অপার্থিব; তবে সে এক নারীও। শিশু অবস্থায় মেয়েটি মায়ের স্পর্শাদর কমই পেয়ে থাক, এর বিপরীতে, তার মা তাকে দীর্ঘ কাল ধরে লাই-ই দিক, ভাইদের মতোই সে স্বপ্ন দেখে উষ্ণ বুকের; তার সাথে ঘনিষ্ঠ এ-মাংসে এখন সে আবার ফিরে পায় জীবনের সাথে সেই ভাবনাহীন, সরাসরি একীভবন, যা সে একদা হারিয়ে ফেলেছিলো দুধ ছাড়ার সময়; এবং যে-বিচ্ছিন্নতা তাকে করে তুলেছিলো একটি একাকী ব্যক্তিসত্তা, তা পরাভূত হয় আরেকজনের এই পূর্ণতর স্থিরদৃষ্টিতে। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি মানবিক সম্পর্ক জ্ঞাপন করে বিরোধ, সব প্রেমই জন্ম দেয় ঈর্ষা। তবে কুমারী মেয়ে ও তার প্রথম পুরুষ প্রেমিকের মধ্যে দেখা দেয় যে-সব বাধা, সেগুলো এখানে মুক্ত হয়। সমকামী অভিজ্ঞতা নিতে পারে একটি প্রকৃত প্রেমের রূপ; এটা তরুণী মেয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে পারে এমন এক সময়োপযোগী ভারসাম্য যে সে চাইবে একে চিরস্থায়ী করে রাখতে বা পুনরাবৃত্তি করতে, সে বইবে এর আবেগভারাতুর স্মৃতি; সত্যিই, এটা প্রকাশ করতে বা জন্ম দিতে পারে একটি নারীসমকামী প্রবণতা।
পুরুষ তার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তবু পুরুষ তাকে ভীত করে। পুরুষের প্রতি সে পোষণ করে যে-বিরোধী অনুভূতি, তাদের খাপ খাওয়ানোর জন্যে সে পৃথক করে নেয় তার ভেতরের সে-পুরুষকে, যে তাকে ভীত করে এবং সে-উজ্জ্বল স্বর্গীয় দেবতাকে, যাকে সে ধার্মিকের মতো পুজো করে। তার পুরুষ সঙ্গীদের কাছে সে রূঢ় ও লাজুক হলেও সে আরাধনা করে কোনো সুদূর সুদর্শন রাজকুমারের : কোনোচিত্রতারকার, যার ছবি সে লাগিয়ে রাখে তার খাটে, কোনো বীরের, মৃত বা এখনো জীবিত, কিন্তু সব সময়ই অগম্য, এমন এক অপরিচিতের, যাকে সে হঠাৎ দেখেছে। এবং জানে তাকে সে আর কখনো দেখতে পাবে না। কিছু প্রেম সমস্যা সৃষ্টি করে না। অধিকাংশ সময়ই সে হয় সামাজিক বা মননগত মর্যাদার কোনো পুরুষ, কোনো দৈহিক কামনা ছাড়াই তরুণী আকৃষ্ট হয় তার প্রতি; মনে করা যাক কোনো বুড়ো ও হাস্যকর অধ্যাপকের প্রতি। এসব বুড়ো পুরুষ আছে কিশোরীর জগতের বাইরে, এবং সে সংগোপনে তাদের অনুরাগী হতে পারে, যেমন কেউ নিজেকে সমর্পণ করে বিধাতার কাছে; এটা অবমাননাকর নয়, কেননা এতে নেই কোনো দৈহিক কামনা। এমনকি মনোনীত ব্যক্তিটি হতে পারে নগণ্য বা মামুলি, কেননা এ-ক্ষেত্রে সে আরো নিরাপদ বোধ করে। যাকে পাওয়া যাবে না, এমন কাউকে বাছাই করে সে প্রেমকে করে তুলতে পারে একটি বিমূর্ত মন্ময় অভিজ্ঞতা, যা তার সততার প্রতি হুমকি নয়; সে বোধ করে আকুলতা, আশা, তিক্ততা, কিন্তু বাস্তবিকভাবে সে জড়িয়ে পড়ে না। বেশ মজার ব্যাপার হচ্ছে, আরাধ্য দেবতাটি থাকে যতো দূরে, সে হয় ততো দীপ্ত; প্রতিদিনের পিয়ানো শিক্ষককে আবর্ষণহীন হলেও চলে, কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরের নায়ককে হতে হবে সুদর্শন ও পৌরুষসম্পন্ন। গুরুত্বপূর্ণ জিনিশটি হচ্ছে যে কামের উপাদানটিকে একভাবে বা অন্যভাবে রাখা হয় এর বাইরে, এভাবে দীর্ঘায়িত করা হয় অন্তর্নিহিত কামের আত্মরতিমূলক প্রবণতা।
এভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এড়িয়ে কিশোরী প্রায়ই গড়ে তোলে এক তীব্র কাল্পনিক জীবন, কখনো কখনো অবশ্য সে তার স্বপ্নের ছায়ামূর্তিগুলোকে গুলিয়ে ফেলে বাস্তবের সাথে। হেলেন ডয়েটশ বর্ণনা করেছেন এক তরুণীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যে তার থেকে বড়ো এক বালকের সাথে কল্পনা করেছে তার নিবিড় সম্পর্ক, যার সাথে সে কখনো কথাই বলে নি। সে ডায়েরি লিখেছে কাল্পনিক ঘটনাগুলোর, অশ্রুপাত ও আলিঙ্গনের, বিদায় নেয়ার ও ভুল বোঝাবুঝি অবসানের, এবং তাকে চিঠি লিখেছে, যা কখনো পাঠানো হয় নি, কিন্তু সেগুলোর উত্তর সে নিজেই লিখেছে। এগুলো স্পষ্টতই সে-বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যেগুলোকে সে ভয় পেতো।
