নারী হতে হলে হতে হবে দুর্বল, অপদার্থ, বশমানা। তরুণীকে শুধু সুসজ্জিত থাকলেই চলবে না, শুধু চটপটে হলেই হবে না, তাকে দমন করতে হবে তার স্বতস্ফূর্ততা এবং তার বদলে তার থাকতে হবে তার গুরুজনদের শেখানো শোভা ও। সৌন্দর্য। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যে-কোনো উদ্যোগই কমাবে তার নারীত্ব ও আবেদন। নিজের অস্তিত্বের ভেতরে ভ্রমণ যুবকের পক্ষে আপেক্ষিকভাবে সহজ, কেননা মানুষ হিশেবে তার বৃত্তি ও তার পুরুষ হওয়ার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; আর এ-সুবিধাটি সূচিত হয় শৈশবেই। স্বাধীনতা ও মুক্তির মধ্যে নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে সে একই সময়ে অর্জন করে তার সামাজিক মূল্য এবং পুরুষ হিশেবে তার মর্যাদা : উচ্চাভিলাষী পুরুষেরা, বালজাকের রাস্তিনাকের মতো, একই কাজের মধ্য দিয়ে চায় অর্থ, খ্যাতি, ও নারী; একটি ছক, যা তরুণকে কাজে উদ্দীপ্ত করে, তা হচ্ছে ক্ষমতাশালী ও বিখ্যাত পুরুষের ছক, নারীরা মার অনুরাগিণী।
কিন্তু, উল্টোভাবে, তরুণীর জন্যে একজন প্রকৃত মানুষ হিশেবে মর্যাদা লাভ ও নারী হিশেবে তার বৃত্তির মধ্যে আছে বিরোধ। এবং এখানেই মিলবে সে-কারণটি কেননা বয়ঃসন্ধি নারীর জন্যে খুবই কঠিন ও নিষ্পত্তিকারক মুহুর্ত। এ-সময় পর্যন্ত সে থেকেছে এক স্বায়ত্তশাসিত ব্যক্তি। এখন তাকে অস্বীকার করতে হবে সার্বভৌমত্ব। তার ভাইদের মতোই, তবে অনেক বেশি বেদনাদায়কভাবে, তাকে শুধু ছিন্ন করা হয়অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে, কিন্তু এর সাথে দেখা দেয় একটা বিরোধ, সেটি হচ্ছে তার কর্তা হওয়া, সক্রিয়, স্বাধীন হওয়ার মূল দাবি এবং তার কাম প্রবর্তনা ও নিজেকে একটি অক্রিয় বস্তুরূপে মেনে নেয়ার জন্যে সামাজিক চাপের মধ্যে বিরোধ। তার স্বতস্ফূর্ত প্রবণতা হচ্ছে নিজেকে অপরিহার্যরূপে গণ্য করা : কী করে সে মনস্থির করবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার জন্যে? অভিলাষ ও ঘৃণা, আশা ও ভয়ের মধ্যে আন্দোলিত হয়ে সন্দেহের সাথে সে বিলম্ব করতে থাকে শৈশবের স্বাধীনতার কাল ও নারীসুলভ বশ্যতাস্বীকারের মধ্যে।
তার আগের প্রবণতা অনুসারে এ-পরিস্থিতিতে নানা প্রতিক্রিয়া ঘটে তরুণীর মধ্যে। ‘ছোটো মাতা’, ভবিষ্যৎ-মাতৃ, সহজেই আত্মসমর্পণ করতে পারে তার রূপান্তরের কাছে; তবে ‘ছোটো মাতা’ হিশেবে হয়তো সে পেয়েছে কিছুটা কর্তৃত্বের স্বাদ, এটা তাকে পুরুষের অধীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে : সে একটা মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রস্তুত, কামসামগ্রী ও দাসী হওয়ার জন্যে নয়। বড়ো বোনেরা, যারা ছোটোবেলায়ই বহন করে অতিরিক্ত দায়িত্বভার, তাদের ক্ষেত্রে এটা ঘটে মাঝেমাঝেই। গারর্স মাঁক যখন আবিষ্কার করে সে নারী, তখন কখনো কখনো সে বোধ করে প্রবঞ্চিত হওয়ার প্রচণ্ড জ্বালা, যা তাকে নিয়ে যেতে পারে সমকামিতার দিকে; তবে স্বাধীনতা ও হিংস্রতার মধ্যে সে যা চেয়েছে, তা হচ্ছে বিশ্বকে অধিকার করা : সাধারণত সে চাইতে পারে না তার নারীত্বের, মাতৃত্বলাভের অভিজ্ঞতার, তার নিয়তির এক সার্বিক এলাকার, ক্ষমতা ছেড়ে দিতে। সাধারণত, কিছুটা প্রতিরোধের সাথে হলেও, তরুণী মেনে নেয় তার নারীত্ব; তার পিতার সাথে, তার শৈশবের ছেনালিপনার সময়, তার যৌন স্বল্পপ্রয়াণে, সে এর মাঝেই জানতে পেরেছে অক্রিয়তার মোহনীয়তা; সে দেখতে পায় এর ক্ষমতা; তার দেহের জাগানো লজ্জার সাথে মিলেমিশে যায় গর্ববোধ। সেই হাত, সেই দৃষ্টি, যা আলোড়িত করেছে তার অনুভূতি, সেটা ছিলো এক আবেদন, এক প্রার্থনা; তার দেহকে মনে হয় ঐন্দ্রজালিক গুণসমৃদ্ধ; এটি একটি সম্পদ, একটি অস্ত্র; সে এর জন্যে গর্বিত। তার যে-ছেনালিপনা হারিয়ে গিয়েছিলো শৈশবের স্বাধীন বছরগুলোতে, তা আবার দেখা দেয়। সে নেয় নতুন প্রসাধন, চুল বাধার নতুন ঢঙ; স্তন লুকিয়ে রাখার বদলে সে ওগুলো বাড়ানোর জন্যে মর্দন করে, সে আয়নায় দেখে তার নিজের হাসি।
তরুণীর জন্যে যৌন সীমাতিক্ৰমণতার মধ্যে থাকে একটি জিনিশ, তার নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে নিজেকে তার হয়ে উঠতে হয় শিকার। সে হয়ে ওঠে একটি বস্তু, এবং নিজেকে সে দেখে বস্তুরূপে; সে বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করে তার সত্তার এনতুন দিকটি : তার মনে হয় সে দ্বিগুণ হয়ে গেছে; নিজের সাথে সম্পূর্ণ খাপ খাওয়ানোর বদলে সে এখন শুরু করে বাইরে অস্তিত্বশীল থাকার। আমরা রোজাদ লেহমানের ইনভিটেশন টু দি রোলস-এ দেখি অলিভিয়া আয়নায় আবিষ্কার করে একটি নতুন শরীর : বস্তু-রূপে-সে হঠাৎ মুখোমুখি হয় নিজের। এটা জন্ম দেয় এক অস্থায়ী, তবে বিহ্বলকর আবেগ।
কিছু মেয়ে পরস্পরকে দেখায় তাদের নগ্ন দেহ, তারা তুলনা করে তাদের স্তনের : আমাদের মনে পড়ে ম্যাটশন ইন ইউনিফর্ম-এর সে-দৃশ্যটি, যাতে আঁকা হয়েছে আবাসিক বিদ্যালয়ের বালিকাদের এসব দুঃসাহসিক আমোদপ্রমোদ; তারা সাধারণ বা বিশেষ ধরনের শৃঙ্গার পর্যন্ত করে থাকে। অধিকাংশ তরুণীর মধ্যেই রয়েছে সমকামী প্রবণতা, যাকে আত্মরতিমূলক সুখানুভূতিবোধ থেকে পৃথক করা যায় না : প্রত্যেকেই অন্যের মধ্যে কামনা করে তার নিজের ত্বকের কোমলতা, তার নিজের দেহের বাকগুলো। পুরুষ, কামগতভাবে, কর্তা, এবং তাই পুরুষেরা সাধারণত পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এমন কামনায়, যা তাদের চালিত করে তাদের থেকে ভিন্ন এক বস্তুর দিকে। কিন্তু নারী হচ্ছে কামনার ধ্রুব কর্ম, এবং এজন্যেই বিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয়ে, স্টুডিওতে গড়ে ওঠে এতো ‘বিশেষ বন্ধুত্ব’; ওগুলোর কিছু বিশুদ্ধভাবেপ্লাতোয়ী এবং অন্যগুলো স্থূলভাবেই দৈহিক।
