গৃহস্থালির দৈনন্দিন টুকিটাকি কাজগুলো ও নীরস একঘেয়ে প্রাত্যহিক খাটুনি, মায়েরা যা বিদ্যালয়ের ছাত্রী বা শিক্ষানবিশ কন্যার ওপর চাপিয়ে দ্বিধা করে না, সেগুলো তাদের খাটিয়ে খাটিয়ে নিঃশেষ করে ফেলে। যুদ্ধের সময় সেভরেতে আমার ক্লাশে আমি ছাত্রীদের দেখেছি, বিদ্যালয়ের কাজের সঙ্গে যাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো গার্হস্থ্য কাজের অতিরিক্ত ভার : একজন হঠাৎ পড়ে যায় পটের রোগে, আরেকজন মেনিনজাইটিসে। মা, যেমন আমরা দেখতে পাবো, গোপনে গোপনে তার মেয়ের মুক্তির বিরোধী, এবং সে তার কন্যাকে কম-বেশি স্বেচ্ছাকৃতভাবে পীড়ন করে; কিন্তু পুরুষ হওয়ার জন্যে পুত্রের চেষ্টাকে শ্রদ্ধা করা হয়, এবং তাকে দেয়া হয় প্রচুর স্বাধীনতা। কন্যাকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়, চোখ রাখা হয় তার আসা-যাওয়ার ওপর : তার নিজের হাস্যকৌতুক ও আনন্দোপতভাগের অধিকার তাকে দেয়া হয় না। এটা দেখতে পাওয়া খুবই অস্বাভাবিক যে নারীরা নিজেরা আয়োজন করেছে দীর্ঘ পথযাত্রার বা পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে প্রমোদভ্রমণের, বা তারা নিজেদের নিয়োজিত করেছে বিলিয়ার্ডজ বা বাউলিংয়ের মতো খেলায়।
নারীর শিক্ষার জন্যে যতোখানি উদ্যোগ নেয়া দরকার, তা তো নেয়াই হয় না, এছাড়াও প্রথা স্বাধীনতাকে তাদের জন্যে কঠিন করে তোলে। যদি তারা পথে ঘোরাঘুরি করে, তাদের দিকে সবাই তাকায়এবং লোকজন এগিয়ে আসে তাদের সাথে গায়ে পড়ে আলাপ করতে। কিছু তরুণীকে আমি চিনি, যারা একেবারেই ভীতু নয়, তবুও তারা প্যারিসের পথে একলা হেঁটে কোনো আনন্দ পায় না, কেননা নিরন্তর তারা ডাক পায় দেহদানের জন্যে, এজন্যে তাদের সব সময় থাকতে হয় সতর্ক, এতে নষ্ট হয় তাদের সুখ। বিদ্যালয়ের মেয়েরা যদি দলবেঁধে রাস্তায় দৌড়োদৌড়ি করে, যেমন ছেলেরা করে, তাহলে তারা অবতারণা করে একটি প্রদর্শনীর; দীর্ঘ পা ফেলে হাঁটা, গান গাওয়া, কথা বলা, বা উচস্বরে হাসা, বা একটা আপেল খাওয়া হচ্ছে প্ররোচনা দেয়া; যারা এটা করে তাদের অপমান করা হয় বা তাদের পিছে লাগা হয় বা তাদের সাথে কথা বলার জন্যে এগিয়ে আসে লোকজন। চপল আমোদপ্রমোদ এমনিতেই খারাপ আচরণ; যে-আত্মসংযম চাপিয়ে দেয়া হয় নারীদের ওপর এবং যা দ্বিতীয় স্বভাব হয়ে ওঠে ‘সুশিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণী’র মধ্যে, তা নষ্ট করে স্বতস্ফূর্ততা; চূর্ণ করা হয় তার প্রাণোচ্ছলতা। এর ফল হচ্ছে উত্তেজনা ও অবসাদ।
এ-অবসাদ সংক্রামক : তরুণীরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে ওঠে পরস্পরকে দিয়ে; তারা নিজেদের কারাগারে পরস্পরের উপকারের জন্যে দলবদ্ধ হয় না; এবং ছেলেদের সঙ্গ তাদের কেনো দরকার হয়, এটাই তার একটি কারণ। স্বাবলম্বী হওয়ার অযোগ্যতা জন্ম দেয় এমন এক ভীরুতা, যা ছড়িয়ে পড়ে তাদের সমগ্র জীবনে এবং তা ধরা। পড়ে তাদের কাজেও। তারা বিশ্বাস করে অসামান্য সাফল্য শুধু পুরুষদের জন্যেই; তারা উচ্চাভিলাষ পোষণ করতে ভয় পায়। আমরা দেখেছি চোদ্দ বৃছরের বালিকারা ছেলেদের সাথে নিজেদের তুলনা করে ঘোষণা করেছে ‘ছেলেরাই উৎকৃষ্ট’। এটা এক দুর্বলকারী বিশ্বাস। এটা ঠেলে দেয় আলস্য ও মাঝারিত্বের দিকে। এক তরুণী, যার। কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই অধিকতর শক্তিমান লিঙ্গের প্রতি, সে একটি পুরুষকে বকাবকি করছিলো তার ভীরুতার জন্যে; তখন তাকে বলা হয় সে নিজেই তো ভীরু। সে আত্মতুষ্টির সাথে ঘোষণা করে, ‘ওহ্, নারী, তা তো ভিন্ন!’
এমন পরাজয়বাদী মনোভাবের মৌল কারণ হচ্ছে কিশোরী তার ভবিষ্যতের জন্যে নিজেকে দায়ী মনে করে না; সে নিজের কাছে বেশি চাওয়ার মধ্যে কোনো লাভ দেখতে পায় না, কেননা পরিশেষে তার ভাগ্য তার কাজের ওপর নির্ভর করবে না। সে নিজের নিকৃষ্টতা বুঝতে পারে বলে পুরুষের কাছে নিজেকে ন্যস্ত করে না, বরং তাকে যে ন্যস্ত করা হয় পুরুষের কাছে, সেজন্যেই সে মেনে নেয় তার নিকৃষ্টতার ধারণা, এবং প্রমাণ করে এর সত্যতা।
এবং, আসলেই, নিজের যোগ্যতা বাড়িয়ে সে মানুষ হিশেবে পুরুষের কাছে মূল্য পাবে না, বরং মূল্য পাবে নিজেকে তাদের স্বপ্নের আদলে তৈরি করে। যখন তার। অভিজ্ঞতা কম, তখন সে এ-ব্যাপারটি সম্বন্ধে সব সময় সচেতন থাকে না। সে হতে পারে ছেলেদের মতোই আক্রমণাত্মক; কিন্তু এ-মনোভাব তাকে নিষ্ফল করে তোলে। অতিশয় দাসীস্বভাবসম্পন্ন মেয়ে থেকে সবচেয়ে উদ্ধত মেয়েটি পর্যন্ত সব মেয়েই এক সময় বুঝতে পারে যে অন্যদের খুশি করার জন্যে তাদের অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে। অধিকার। তাদের মায়েরা তাদের আদেশ দেয় যেননা তারা আর ছেলেদের সঙ্গী মনে করে, যেনো নিজেরা উদ্যোগ না নেয়, যেনো তারা অক্রিয় ভূমিকা নেয়। বন্ধুত্ব বা ফষ্টিনষ্টি শুরু করতে চাইলেও তাদের যত্নশীল হতে হবে, যাতে এমন মনে না হয় যে তারাই উদ্যোগ নিচ্ছে; পুরুষেরা গারর্স শাঁক, বা নীলমুজো বা মেধাবী নারী পছন্দ। করে না; অতি বেশি সাহস, সংস্কৃতি, বা বুদ্ধি, অতি বেশি চরিত্র, তাদের ভীত করবে। অধিকাংশ উপন্যাসে, যেমন জর্জ এলিয়ট মন্তব্য করেছেন, স্বর্ণকেশী ও বোকাটে নায়িকারাই শেষে জয়ী হয় পুরুষস্বভাবের শ্যামাঙ্গীদের ওপর; এবং দি মিল অন দি ফ্লস-এ ম্যাগি নিষ্ফলভাবে চেষ্টা করে ভূমিকা দুটি পাল্টে দিতে; কিন্তু শেষে সে মারা যায় এবং স্বর্ণকেশী লুসির বিয়ে হয় স্টিফেনের সাথে। দি লাস্ট অফ দি মোহিকান্স-এ সাহসী ক্লারা নয়, নায়কের হৃদয় জয় করে নিষ্প্রাণ এলিস; লিটল উইমেন-এ। মনোরম জো লরির বাল্যকালের খেলার সাথী মাত্র : জোর প্রেম রক্ষিত থাকে নিষ্প্রাণ অ্যামি ও তার কোঁকড়ানো কেশরাজির জন্যে।
