তেরো বছর বয়সের দিকেই বালকেরা শিক্ষা নেয় হিংস্রতার, তখন বিকাশ ঘটে তাদের আক্রমণাত্মকতার, দেখা দেয় ক্ষমতালাভের ইচ্ছে, প্রতিযোগিতাপ্রীতি; আর এ-সময় বালিকা ছেড়ে দেয় রূঢ়খেলাধুলোগুলো। তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয় ঘুরে দেখা, উদ্যোগ নেয়া, সম্ভবপরতার সীমা বাড়ানো। বিশেষভাবে, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তরুণদের কাছে, তা মেয়েদের কাছে প্রায়-অজানা। এটা ঠিক, নারীরা তুলনা করে নিজেদের মধ্যে, তবে প্রতিযোগিতা, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারেই ভিন্ন জিনিশ এসব অক্রিয় তুলনা থেকে : দুটি স্বাধীন সত্তা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিশ্বের ওপর তাদের যে-অধিকার আছে, তা বাড়ানোর জন্যে; খেলার সাথীর থেকে বেশি ওপরে আরোহণ করা, একটা হাতকে জোরে চাপ দিয়ে বাঁকা করা হচ্ছে সাধারণভাবে বিশ্বের ওপর তার সার্বভৌমত্ব দাবি করা। এমন কর্তব্যঞ্জক আচরণ মেয়েদের জন্যে নয়, বিশেষ করে যখন তার সাথে জড়িত থাকে হিংস্রতা।
একইভাবে, যে-কিশোরকে অনুমতি দেয়া হয়েছে তার অস্তিত্বকে কর্তৃত্বব্যঞ্জকভাবে জ্ঞাপন করতে এবং যে-কিশোরীর আবেগানুভূতির কোনো অব্যবহিত কার্যকারিতা নেই, বিশ্ব তাদের কাছে একই রকমে দেখা দেয় না। একজন নিরন্তর প্রশ্ন করে বিশ্বকে; সে যে-কোনো মুহূর্তে রুখে দাঁড়াতে পারে; তাই সে অনুভব করে সে যখন কিছু মেনে নিচ্ছে তখন সক্রিয়ভাবে সেটিকে সংশোধন করছে। অন্যজন করে বশ্যতাস্বীকার; বিশ্ব সংজ্ঞায়িত হয় তার প্রতি নির্দেশ না করেই, এবং বিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলো ততোখানি অপরিবর্তনীয়, যতোখানি সে জড়িত বিশ্বের সাথে। শারীরিক শক্তির এ-অভাব তাকে ঠেলে দেয় আরো বেশি সার্বিক ভীরুতার দিকে : তার বিশ্বাস নেই সে-শক্তির ওপর, যা সে নিজের দেহে বোধ করে নি; সে সাহস করে না উদ্যোগী হতে, বিদ্রোহ করতে, আবিষ্কার করতে; বশ মানতে, হালছাড়া ভাব পোষণ করার জন্যে নির্দিষ্ট হয়ে সে সমাজে নিতে পারে সে-স্থান, যা ইতিমধ্যেই তার জন্যে তৈরি করা হয়েছে। সে বর্তমান অবস্থাকে চিরস্থায়ী বলে মনে করে।
যুবকের কামপ্রবর্তনা শরীর নিয়ে তার গর্বকেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে; এতে সে দেখতে পায় তার সীমাতিক্ৰমণতা ও ক্ষমতার লক্ষণ। যুবতী তার কামনা মেনে নিতে পারে, তবে তাতে লেগে থাকে লজ্জাবোধ। তার সারা দেহই অস্বস্তির এক উৎস। ছোটো শিশুরূপে তার ‘অভ্যন্তরভাগ’ বিষয়ে সে বোধ করেছে যে-আস্থাহীনতা, তা-ই ঋতুস্রাবের সংকটকে দেয় সন্দেহজনক চরিত্র, যা একে ঘৃণ্য করে তোলে তার কাছে। নারীর শরীর—বিশেষ করে যুবতীর শরীর–এক স্নায়ুবিকারগ্রস্ত শরীর, এ-অর্থে যে বলা যায় এতে মনোজীবন ও তার শারীর বাস্তবায়নের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। যেহেতু তার দেহকে তার কাছে মনে হয় সন্দেহজনক, এবং যেহেতু সে একে দেখে আতঙ্কের সাথে, একে তার মনে হয় অসুস্থ : এটা অসুস্থ। আমরা দেখেছি যে আসলে এ-শরীরটি কমনীয়, এবং এতে ঘটে প্রকৃত দৈহিক ব্যাধি; তবে স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞরা একমত যে তাদের রোগীদের দশজনের মধ্যে ন-জনই কল্পিত রোগী; অর্থাৎ, হয়তো তাদের অসুস্থতার আদৌ কোনো শারীরবৃত্তিক সত্যতা নেই বা একটা মানসিক অবস্থার ফলেই ঘটে এ-দৈহিক বিশৃঙ্খলা; এটা মনোদৈহিক। নারী হওয়ার মধ্যে আছে যে-উদ্বেগ, তা-ই অনেকাংশে ধ্বংস করে নারীর শরীর।
এটা স্পষ্ট যে যদি জৈবিক অবস্থা নারীর জন্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকেই, তবে তা ঘটে তার সার্বিক পরিস্থিতির জন্যেই। স্নায়বীয় ও রক্তবাহনিয়ামক স্থিতিহীনতা যদি বিকারধর্মী না হয়, তবে তা তাকে কোনো পেশার অযোগ্য করে তোলে না : পুরুষের মধ্যেও আছে বিচিত্র ধরনের ধাত। মাসে এক বা দু-দিনের অসুস্থতা যন্ত্রণাদায়ক হলেও সেটা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; বহু নারীই এর সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়, এবং বিশেষ করে তারা, যাদের কাছে এ-মাসিক। অভিশাপটিকে মনে হতে পারে অতিশয় বিব্রতকর : খেলোয়াড়, ভ্রমণকারী, নর্তকী, যে-নারীরা গুরুভার কাজ করে। অধিকাংশ পেশার জন্যেই এতো বেশি শক্তি লাগে না যা নারীর নেই। এটা ঠিক যে নারীর শারীরিক দুর্বলতার ফলে নারী হিংস্রতার পাঠ। নেয় না; কিন্তু সে যদি নিজের শরীর দিয়ে দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করতে পারতো নিজেকে এবং বিশ্বের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারতো অন্য কোনো ধরনে, তাহলে সহজেই এঅভাবের ক্ষতিপূরণ ঘটতো। তাকে দেয়া হোক সাঁতার কাটতে, পর্বতের চুড়োয় উঠতে, বিমান চালাতে, প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে, ঝুঁকি নিতে, রোমাঞ্চের জন্যে বাইরে যেতে, তাহলে সে ভীরুতা বোধ করবে না বিশ্বের মুখোমুখি। একটি সার্বিক অবস্থা, যা নারীকে বিশেষ কোনো বহিঃপ্রকাশের সুযোগ দেয় না, তার ভেতরেই নারীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো লাভ করে গুরুত্ব–সরাসরি নয়, বরং শৈশবে গড়ে ওঠা হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষাকে প্রমাণ করে।
অধিকন্তু, এ-গূঢ়ৈষা ভারি হয়ে চেপে থাকবে তার মননবৃত্তিক সিদ্ধির ওপর। প্রায়ই বলা হয় যে বয়ঃসন্ধির পর বালিকা মননগত ও শৈল্পিক এলাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। এর আছে অনেক কারণ। একটা অতিসাধারণ কারণ হচ্ছে কিশোরীকে তার ভাইদের মতো উৎসাহ দেয়া হয় না। বরং ঘটে তার উল্টোটা। তার কাছে চাওয়া হয় সে নারীও হবে, এবং তার পেশাগত পাঠের দায়িত্ব যুক্ত করতে হবে তার নারীত্বের দায়িত্বের সাথে।
