সারা শৈশব ভরে বালিকা ভোগ করেছে শাসানো এবং সক্রিয়তা খর্বকরণ; তবুও সে নিজেকে মনে করেছে একটি স্বায়ত্তশাসিত মানুষ। পরিবারের ও বন্ধুদের সাথে তার সম্পর্কে, তার বিদ্যালয়ের পাঠে ও খেলাধুলোয়, তাকে মনে হয়েছে এক সীমাতিক্রমী সত্তা : তার ভবিষ্যৎ অক্রিয়তা ছিলো একটি স্বপ্নমাত্র। বয়ঃসন্ধির সাথে ভবিষ্যৎ শুধু এগিয়েই আসে না : এটা তার দেহে বাসা বাঁধে; এটা ধারণ করে চরম মূর্ত বাস্তবতা। এটা বজায় রাখে তার সব সময়ের ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য। কিশোর যখন সক্রিয়ভাবে এগোয় প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে, তখন কিশোরী প্রতীক্ষা করে এ নতুন, অপূর্বপরিজ্ঞেয় পর্বের সূচনার জন্যে, যার গল্পের ছকবোনা হবে এখন থেকে এবং সময় তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে-দিকে। সে ইতিমধ্যেই মুক্ত হয়েছে তার শৈশবের অতীত জীবন থেকে, এবং বর্তমানকে মনে হয় এক ক্রান্তিকাল এর কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য নেই, আছে শুধু অবসরকালীন কাজকর্ম। তার যৌবন নিঃশেষ হয় প্রতীক্ষায়, যা একটু কম বা বেশি ছদ্মবেশধারী। সে থাকে পুরুষের প্রতীক্ষায়।
কিশোরও নিঃসন্দেহে নারীর স্বপ্ন দেখে : সে নারী কামনা করে; কিন্তু নারী তার জীবনে একটা উপাদানের বেশি কিছু নয় : নারী তার নিয়তির সারসংক্ষেপ ধারণ করে। কিন্তু বালিকা, সে নারীত্বের সীমার মধ্যেই থাকতে চাক বা সীমা পেরিয়েই যেতে চাক, শৈশব থেকেই পূর্ণতা ও মুক্তির জন্যে সে তাকিয়ে থাকে পুরুষের দিকেই; পুরুষ ধারণ করে পার্সিউস বা সেইন্ট জর্জের দীপ্ত মুখমণ্ডল; পুরুষ ত্রাতা; সে ধনী ও ক্ষমতাশালী, তার হাতে আছে সুখের চাবি, সে সুদর্শন রাজকুমার। বালিকা মনে করে ওই রাজকুমারের আদরে তার মনে হবে যেনো সে ভেসে যাচ্ছে জীবনের বিশাল স্রোতে : আলিঙ্গন ও দৃষ্টিপাতের যাদু আবার তাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এক মূর্তিরূপে। সব সময়ই সে দৃঢ় বিশ্বাস করেছে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বে; পুরুষের মর্যাদা কোনো শিশুসুলভ মরীচিকা নয়; এর আছে আর্থিক ও সামাজিক ভিত্তি; পুরুষেরা অবশ্যই বিশ্বের প্রভু। সব কিছুই তরুণীকে বলে তার নিজের স্বার্থেই তার শ্রেষ্ঠ কাজটি হচ্ছে পুরুষের দাসী হওয়া : তার পিতামাতা তাকে তাড়া দেয় ওদিকে যেতে; তার পিতা গর্ব বোধ করে কন্যার সাফল্যে, তার মা এতে দেখতে পায় এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ, বন্ধুরা তাকে ঈর্ষা ও প্রশংসা করে যে বেশি পায় পুরুষের মনোযোগ; আমেরিকার মহাবিদ্যালয়গুলোতে কোনো সহপাঠিনীর সামাজিক মর্যাদা পরিমাপ করা হয় তার ‘অভিসারী’র সংখ্যা দিয়ে।
বিয়ে শুধু একটি সম্মানজনক পেশাই নয় এবং অন্যগুলো থেকে শুধু কম ক্লান্তিকরই নয় : এটাই শুধু নারীকে অক্ষত রাখতে দেয় তার সামাজিক মর্যাদা এবং প্রিয়া ও মা হিশেবে একই সাথে চরিতার্থ করতে দেয় কাম। এরূপেই তার সহচররা দেখতে পায় তার ভবিষ্যৎ যেমন সে নিজে দেখে। এ-ব্যাপারে সর্বসম্মত মতৈক্য হচ্ছে একটি স্বামী পাওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ‘রক্ষক’ পাওয়া তার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সে নিজেকে মুক্ত করে নেবে পিতৃগৃহ থেকে, মায়ের কর্তৃত্ব থেকে, সে খুলবে তার ভবিষ্যৎ, কোনো সক্রিয় বিজয়ের মাধ্যমে নয়, বরং অক্রিয় ও বশীভূতরূপে একটি নতুন প্রভুর হাতে নিজেকে অর্পণ করে।
মাঝেমাঝেই দাবি করা হয় যে যদি সে এভাবে হালছাড়া ভাবে মেনে নেয় বশ্যতা, তাহলে এর অর্থ হচ্ছে সে ছেলেদের থেকে বস্তুগত ও নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট এবং তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য : একটা আশাহীন প্রতিযোগিতা ছেড়ে দিয়ে উচ্চবর্ণের এক সদস্যের ওপর সে দেয় তার সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ভার। কিন্তু সত্য হচ্ছে তার হালছাড়া ভাবের উৎপত্তি কোনো পূর্বনির্ধারিত নিকৃষ্টতা থেকে ঘটে নি : সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে, এটাই জন্ম দেয় তার সমস্ত ন্যূনতার; এ-হালছাড়া ভাবের উৎস রয়েছে কিশোরী মেয়ের অতীত জীবনে, তার চারপাশের সমাজে, এবং বিশেষ করে, তার জন্যে ধার্য ভবিষ্যতের মধ্যে।
খুবই সত্য যে বয়ঃসন্ধি রূপান্তরিত করে দেয় বালিকার দেহ। এটা এ-সময় আগের থেকেও ভঙ্গুর; নারীপ্রত্যঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাপূর্ণ, এবং কাজকর্মে সুকুমার; তার অদ্ভুত ও বিরক্তিকর স্তন দুটি একটা বোঝা, তীব্র ব্যায়ামের সময় বেদনাদায়কভাবে আন্দোলিত হয়ে ওগুলো মনে করিয়ে দেয় ওগুলোর উপস্থিতি। ভবিষ্যতে তার পেশিশক্তি, সহিষ্ণুতা ও ক্ষিপ্রতা হবে পুরুষের ওই গুণগুলোর থেকে নিকৃষ্ট। তার হরমোনগুলোর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে স্নায়বিক ও বেসো-নিয়ামক অস্থিতি। ঋতুস্রাব যন্ত্রণাকর। মাথাধরা, অতি-অবসাদ, তলপেটের ব্যথা স্বাভাবিক কাজকর্মকে করে তোলে পীড়াদায়ক বা অসম্ভব; মাঝেমাঝেই দেখা দেয় মানসিক যন্ত্রণা; স্নায়ুদৌর্বল্য ও বিরক্তিতে নারী অস্থায়ীভাবে হয়ে উঠতে পারে আধ-পাগল। এসব অসুবিধা ও অক্ৰিয় দেহের মাধ্যমে বুঝতে গিয়ে সারা বিশ্বকে তার মনে হয় এক দুর্বহ ভার। অতিভারাক্রান্ত, নিমজ্জিত, সে নিজের কাছে নিজে হয়ে ওঠে অচেনা, কেননা সে অচেনা বাকি বিশ্বের কাছে। সংশ্লেষণ ভেঙে পড়ে, সময়ের মুহূর্তগুলো আর সম্পর্কিত থাকে না, অন্য মানুষজনকে অন্যমনস্কভাবে চেনা চেনা লাগে; আর যুক্তিশীলতা অটুট থাকলেও, যেমন থাকে বিষাদচিন্তাগ্রস্ত উন্মাদরোগে, তবু ওগুলো বাড়িয়ে তোলে জৈবিক বৈকল্য থেকে উদ্ভূত আবেগগুলোকে।
