এবং তার ঋতুস্রাব দেখা দেয়াই একলা বালিকার কাছে তার নারীসুলভ নিয়তি ঘোষণা করে না। তার মধ্যে দেখা দিতে থাকে আরো নানা সন্দেহজনক প্রপঞ্চ। এপর্যন্ত তার কামানুভূতি ছিলো ভগাঙ্কুরীয়। মেয়েদের মধ্যে হস্তমৈথুন ছেলেদের থেকে কম কি না তা বের করা কঠিন; বালিকা তার প্রথম দু-বছর ধরে এর চর্চা করে। থাকে, এমনকি এটা সে শুরু করে সম্ভবত তার জীবনের প্রথম মাসগুলোতেই; মনে হয়দু-বছর বয়সের দিকে সে এটা ছেড়ে দেয়, পরে আবার শুরু করার জন্যে। একটা গুপ্ত শ্লেষ্মল এলাকা ছোঁয়ার থেকে পুরুষের দেহে স্থাপিত ওই বৃন্তটির দেহসংস্থানগত অবয়ব অনেক বেশি প্ররোচিত করে ওটিকে ছোঁয়ার জন্যে; তবে হঠাৎ সংস্পর্শমেয়েটি দড়ি বা গাছ বেয়ে উঠছে, বা সাইকেল চালাচ্ছে–জামাকাপড়ের ঘষা, খেলার সময় ছোঁয়াছুঁয়ি, বা এমনকি খেলার সাথীদের, বয়স্কতর শিশুদের, বা প্রাপ্তবয়স্কদের দীক্ষাদান বালিকাকে প্রায়ই সচেতন করে তুলতে পারে সে-অনুভূতি সম্পর্কে, যা সে আবার জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে হাতের সাহায্যে।
তা যা-ই হোক, যখন পাওয়া যায় এ-সুখ, তখন তা থাকে একটি স্বাধীন অনুভূতিরূপে : সব শিশুসুলভ চিত্তবিনোদনের মতোই এর থাকে লঘু ও নিস্পাপ চরিত্র। বালিকা কখনো তার এসব গোপন উপভোগকে তার নারীসুলভ নিয়তির সাথে সম্পর্কিত করে না; ছেলেদের সাথে যদি তার যৌনসম্পর্ক ঘটে থাকে, তাহলে তা ঘটেছে মূলত ঔৎসুক্যবশত। আর সে এখন নিজেকে ধাবিত দেখে এমন এলোমেলোআবেগের মধ্যে, যার মধ্যে সে নিজেকে চিনতে পারে না। বাড়ছে কামানুভূতিপরায়ণ অঞ্চলগুলোর স্পর্শকাতরতা, এবং নারীতে এগুলো এতো অসংখ্য যে তার সম্পূর্ণ শরীরটিকেই গণ্য করা যেতে পারে কামানুভূতিপরায়ণ বলে। এ-সত্যটি তার কাছে প্রকাশ পায় পারিবারিক আদরের মধ্য দিয়ে, নিরীহ চুম্বনে, দর্জির, ডাক্তারের, বা নরসুন্দরের উদাসীন স্পর্শে, তার চুলের ওপর বা গ্রীবার পেছনে বন্ধুসুলভ হাতের ছোঁয়ায়; সে অনুভব করে, এবং অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে চায়, খেলার সম্পর্কের মধ্যে একটা গভীরতর শিহরণ, ছেলে বা মেয়েদের সাথে কুস্তি করে।
তরুণী মেয়ের উদ্বেগ প্রকাশ পায় নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক দুঃস্বপ্নে ও প্রেতের মতো আনাগোনা করা অলীক মূর্তিতে : যে-মুহূর্তে সে তার নিজের ভেতরে একটা ছলনাপর স্বেচ্ছাপ্রণোদনা বোধ করে, ঠিক তখনই অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষিত হওয়ার ভাবনা তার। সমস্ত মনকে আবিষ্ট করে রাখে। এ-ভাবনাটি কম-বেশি নির্দিষ্ট অজস্র প্রতীকের মধ্য দিয়ে দেখা দিতে থাকে স্বপ্নে ও আচরণে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে মেয়ে তার খাটের নিচে ভালোভাবে চায়, তার মনে হয় সন্দেহজনক অভিসন্ধি নিয়ে সেখানে লুকিয়ে আছে কোনো ডাকাত; তার মনে হয় বাড়িতে সে চোরের শব্দ পাচ্ছে; জানালা দিয়ে, ছোরা হাতে, তাকে ছোরা মারার জন্যে ঢুকছে আক্রমণকারী। পুরুষ তাকে কম-বেশি ভীত করে। বাবার প্রতি সে বোধ করে এক রকম বিরক্তি; তার তামাকের গন্ধ অসহ্য লাগে, তার পর স্নানাগারে যেতে তার ঘেন্না লাগে; এমনকি সে যদিও এখনো প্রীতিপূর্ণ, এ-শারীরিক অপছন্দের ভাব সে প্রায়ই বোধ করে। মনোচিকিৎসকেরা বলেন যে তাদের তরুণী রোগীরা প্রায়ই দেখে বিশেষ একটি স্বপ্ন : তারা কল্পনা করে তারা ধর্ষিত হয়েছে এক বয়স্ক মহিলার সামনে, যে কাজটিকে অনুমতি দিয়েছে। এটা স্পষ্ট যে তাদের কামনার কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্যে তারা প্রতীকী রীতিতে অনুমতি চাচ্ছে তাদের মায়ের কাছে।
একটা চাপ, যা তাদের ওপর অতিশয় কদর্য প্রভাব ফেলে, তা হচ্ছে কপটতা। তরুণী মেয়ে নিবেদিত ‘শুদ্ধতা’ ও ‘নিষ্পাপতা’র কাছে, আর ঠিক তখনি সে তার। নিজের ভেতরে ও চারপাশে আবিষ্কার করতে থাকে জীবন ও কামের রহস্যপূর্ণ। উত্তেজনা। মনে করা হয় সে হবে তুষারের মতো শুভ্র, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, তাকে পরানো হয় অত্যন্ত মিহি মসলিন-বস্ত্র, তার কক্ষটি মুড়ে দেয়া হয় সুরুচিসম্পন্ন রঙের কাগজে, তাকে আসতে দেখলে কথা বলা হয় নিচুস্বরে, তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়। অশ্লীল বই। এখন, এমন কোনো ‘ভালো ছোট্ট মেয়ে’ নেই, যে সাধ মেটায় না ‘জঘন্য’ ভাবনায় ও কামনায়। সে এগুলোলুকোতে চেষ্টা করে তার অন্তরঙ্গতম বন্ধুর কাছেও, এমনকি নিজের কাছেও; সে নিয়ম মেনেই বাঁচতে ও চিন্তা করতে চায়; নিজের প্রতি তার অবিশ্বাস তাকে দেয় একটা প্রতারণাপূর্ণ, অসুখী, অসুস্থ ভাবভঙ্গি;এবং পরে এসব প্রবৃত্তির প্রতি সংকোচ কাটানোর থেকে তার জন্যে অন্য কিছুই বেশি কঠিন হয় না। এবং তার সমস্ত অবদমন সত্ত্বেও, সে বোধ করে সে বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে অকথ্য এক সীমালঙ্ঘনের ভারের নিচে। তার নারীতে রূপান্তরণ ঘটে শুধু লজ্জার মধ্যে নয়, বরং গভীর অনুশোচনার মধ্যে।
আমরা এখন পরিচিত সে-নাটকীয় সংঘাতের সাথে, যা বয়ঃসন্ধিকালে বিদীর্ণ করে কিশোরী মেয়ের মর্ম : তার নারীত্বকে মেনে না নিয়ে সে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ হতে পারে না; এবং সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে তার লিঙ্গ তাকে দণ্ডিত করেছে একটি বিকলাঙ্গ ও নিশ্চল অস্তিত্বে, এ-সময়ে তার সামনে দেখা দেয় একটা অশুচি অসুস্থতা ও অস্পষ্ট অপরাধবোধরূপে। তার নিকৃষ্টতা প্রথমে মনে হয়েছিলো নিতান্তই একটি বঞ্চনা; কিন্তু একটা শিশ্নের অভাব এখন হয়ে উঠেছে একটা কলুষ ও সীমালঙ্ঘন। এভাবেই ক্ষতবিক্ষত, লজ্জিত, শাস্তিযোগ্য সে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে।
তরুণী
ভাগ ৪ – গঠনের বছরগুলো। পরিচ্ছেদ ২ – তরুণী
