অনেক সময়, যাকে বলা যেতে পারে প্রাক-বয়ঃসন্ধিপর্ব, তার ঋতুস্রাব দেখা দেয়ার আগে, মেয়ে তার দেহ নিয়ে লজ্জা পায় না; নারী হয়ে উঠতে সে গর্ব বোধ করে এবং সন্তোষের সাথে দেখে তার স্তনের বেড়ে ওঠা, রুমাল দিয়ে সে তার ড্রেসে প্যাড লাগায় এবং বয়স্কদের সামনে এটি নিয়ে গর্ব বোধ করে; সে তখনও তার ভেতরে কী ঘটছে, তার তাৎপর্য বুঝে ওঠে না। তার প্রথম ঋতুস্রাব প্রকাশ করে এই অর্থ, এবং দেখা দেয় তার লজ্জাবোধ। তার-যদি আগে থেকেই থাকে লজ্জাবোধ, তাহলে এ-সময় থেকে তা প্রবলতর ও অতিশায়িত হতে থাকে। সব সাক্ষ্যপ্রমাণ একযোগে দেখায় যে মেয়েটিকে থেকে সতর্ক করা হয়েথাক বা না থাক, এঘটনাটি সব সময়ই তার কাছে মনে হয় অপছন্দনীয় ও অবমাননাকর। প্রায়ই মা তাকে এটা অবহিত করতে ব্যর্থ হয়; দেখা গেছে যে ঋতুস্রাবের ঘটনার থেকে সানন্দে মায়েরা তাদের মেয়েদের কাছে ব্যাখ্যা করে গর্ভধারণ, সন্তানপ্রসব, এবং এমনকি যৌনসম্পর্কের রহস্য। মনে হয় নারীদের এ-বোঝটিকে তারা নিজেরাই এমন এক বিভীষিকার সাথে ঘৃণা করে যে তাতে প্রতিফলিত হয়পুরুষদের প্রাচীন অতীন্দ্রিয় ভীতি এবং মায়েরা যা সঞ্চারিত করে যায় তাদের সন্তানদের মধ্যে। যখন মেয়ে তার কাপড়ে দেখতে পায় সন্দেহজনক দাগগুলো, সে বিশ্বাস করে সে আক্রান্ত হয়েছে উদরাময়ে, বা মারাত্মক কোনো রক্তক্ষরণে বা কোনো লজ্জাজনক রোগে। আত্মহত্যার উদ্যোগ নেয়ার ঘটনাও অজানা নয়, এবং সত্যিই কিশোরী মেয়ের পক্ষে ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক, কেননা মনে হয় যেনো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তার জীবনশোণিত, হয়তো আভ্যন্তর অঙ্গে কোনো ক্ষতের ফলে। এমনকি সুবিবেচিত শিক্ষাদানের ফলে যদি তার তীব্র উদ্বেগ কেটেও যায়, তবু মেয়ে লজ্জা বোধ করে, মনে করে সে ময়লা হয়ে। গেছে; এবং সে দৌড়ে যায় স্নানঘরে, সে চেষ্টা করে তার নোংরা জামাকাপড় পরিষ্কার করতে বা লুকিয়ে ফেলতে।
ডঃ ডব্লিউ লিপমান তরুণতরুণীদের যৌনতাসম্পর্কে গবেষণা করার সময় এবিষয়ে, জোনস এ সেক্সিয়ালিতেতে, আরো বহু কিছুর সাথে সগ্রহ করেছেন নিচের মন্তব্যগুলো :
যোলো বছর বয়সে, যখন আমি প্রথমবারের মতো অসুস্থ হই, আমি খুব ভয় পাই যখন ভোরবেলা আমি এটা আবিষ্কার করি। সত্যি বলতে কী, আমি জানতাম এটা ঘটবে; তবে আমি এতো লজ্জাবোধ করি যে সারাটা সকাল বিছানায় পড়ে থাকি এবং সব প্রশ্নের উত্তরে বলতে থাকে যে আমি উঠতে পারছি না।
আমি বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম যখন বারো বছর বয়সে প্রথম আমার ঋতুস্রাব দেখা দেয়। আমি সন্ত্রস্ত বোধ করি, এবং আমার মা যখন শুধু বলে যে এটা প্রতিমাসেই দেখা দেবে, আমি একে গণ্য করি একটা বড়ো অশ্লীলতা বলে এবং পুরুষদেরও এটা হয় না, তা মেনে নিতে অস্বীকার করি।
আমার মা আমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে আগেই বলেছিলো, এবং আমি খুব হতাশ হয়েছিলাম যখন, অসুস্থ হয়ে, আনন্দে ছুটে গিয়ে মাকে জাগিয়ে বলি : মা, আমার এটা হয়েছে। আর সে শুধু বলে : এবং এর জন্যে তুমি আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়েছে! এসত্ত্বেও এ-ঘটনাকে আমি আমার জীবনের একটি প্রকৃত বিপ্লব বলে গণ্য করেছি।
আমার মা আমাকে সতর্ক করে নি। তার বেলা এটা শুরু হয়েছিলো উনিশ বছর বয়সে, এবং তার নিচের অন্তর্বাস নোংরা করার জন্যে গালি খাওয়ার ভয়ে সে বাইরে গিয়ে একটি ক্ষেতের মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলো তার জামাকাপড়।
এ-সংকট দেখা দেয় অল্প বয়সে; বালক বয়ঃসন্ধিতে পৌছে পনেরো-ষোলোতে; বালিকা নারীতে পরিবর্তিত হয় তেরো-চোদ্দোতে। তবে তাদের বয়সের পার্থক্য থেকে তাদের অভিজ্ঞতার মৌলিক পার্থক্য জন্মে না; এটা উপস্থিত থাকে না শারীরবৃত্তিক প্রপঞ্চেও, যা বালিকার অভিজ্ঞতার ওপর প্রয়োগ করে তার মর্মঘাতী বল : বয়ঃসন্ধি দু-লিঙ্গে পরিগ্রহ করে আমূলভাবে ভিন্ন তাৎপর্য, কেননা তা উভয়ের জন্যে একই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত করে না।
ছোটো মেয়েকে, এর বিপরীতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হয়ে ওঠার জন্যে বন্দী হয়ে থাকতে হয় তার ওপর তার নারীত্বের চাপিয়ে দেয় সীমার ভেতরে। বালক তার দেহে গজিয়ে ওঠা পশমে বিস্ময়ের সাথে দেখতে পায় যা ঘটতে যাচ্ছে যা ঘটবে; যে ‘নৃশংস ও নির্ধারিত নাটক’ স্থির করে বালিকার নিয়তি, তার মুখোমুখি বালিকা দাঁড়ায় ব্ৰিতভাবে। শিশ্নটি যেমন তার বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত মূল্যায়ন লাভ করে সামাজিক পরিস্থিতি থেকে, ঠিক তেমনি সামাজিক পরিস্থিতিই ঋতুস্রাবকে পরিণত করে একটি অভিশাপে। একজন প্রতীক হয়ে ওঠে পৌরুষের, আরেকজন নারীত্বের; আর নারীত্ব যেহেতু জ্ঞাপন করে বিকল্পতা ও নিকৃষ্টতা, তাই এর প্রকাশ হয়ে ওঠে লজ্জাজনক। বালিকার কাছে সব সময়ই তার জীবনকে মনে হয়েছে সে-অস্পষ্ট সারসত্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত, একটি সদর্থক রূপ দেয়ার জন্যে একটি শিশ্নের অভাবকে যার কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় নি : কিন্তু সে তার দু-উরুর মাঝে দিয়ে প্রবাহিত ধারায় সচেতন হয়ে ওঠে নিজের সম্পর্কে। যদি সে ইতিমধ্যেই মেনে নিয়ে থাকে তার অবস্থাকে, তাহলে সে সানন্দে ঘটনাটিকে স্বাগত জানায়—’এখন তুমি একজন নারী’। যদি সে সব সময়ই নিজের অবস্থা মেনে নিতে অস্বীকার করে থাকে, তাহলে রক্তাক্ত রায় তাকে বিমূঢ় করে; প্রায়ই সে হোঁচট খায় : মাসিক অশুচিতা তার মনে জাগায় ঘৃণা ও ভয়। ‘সুতরাং এই হচ্ছে “নারী হওয়া” শব্দগুলোর অর্থ!’ নির্ধারিত যে-ভাগ্য অস্পষ্ট ও অবর্তমানভাবে এ-পর্যন্ত তার ওপর চেপে ছিলো, তা এখন গুটিসুটি মারছে তার পেটে; কোনো নিস্তার নেই; সে বোধ করে যে সে ধরা পড়ে গেছে।
