বলা দরকার যে এমনকি সুস্পষ্টভাবে শিক্ষাদানও এ-সমস্যা সমাধান করবে না; পিতামাতা ও শিক্ষকেরা যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শুভকামনা নিয়েও কাজ করেন, তবুও শব্দ ও ধারণার মধ্য দিয়ে যৌন অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা অসম্ভব, এটা বোঝা সম্ভব শুধু যাপন করে; যে-কোনো বিশ্লেষণেরই, তা যতোই গভীরই হোক-না-কেনো, থাকে একটা কৌতুককর দিক এবং সেটা সত্য প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়।
সংরাগহীন শিশুর কাছে কী করে ব্যাখ্যা করা যায় চুম্বনের বা আদরের সুখ? পারিবারিক চুম্বন দেয়া ও নেয়া হয় অনেক সময় এমনকি ওষ্ঠেই; শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির ওই সংস্পর্শের, অনেক ক্ষেত্রে, কেনো থাকে মাথা ঝিম-ধরানোর প্রভাব? এটা অন্ধের কাছে রঙের বর্ণনা দেয়ার মতো। যে-পর্যন্ত থাকে না সে-উত্তেজনা ও কামনার বোধি যা যৌনক্রিয়াকে দেয় তার অর্থ ও তার ঐক্য, সে-পর্যন্ত তার বিচিত্র উপাদানকে মনে হয় অতি জঘন্য ও পৈশাচিক। বিশেষত, ছোটো মেয়ে যখন বুঝতে পারে সে কুমারী ও রুদ্ধ, এবং তাকে একটি নারীতে পরিণত করার জন্যে দরকার পড়বে পুরুষের একটি যৌনাঙ্গের, যেটি বিদ্ধ করবে তাকে, তখন তার মনে জেগে ওঠে ঘৃণা ও ভীতির শিহরণ। যৌনাঙ্গপ্রদর্শন যেহেতু একটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যৌনবিকৃতি, অনেক তরুণী মেয়েই দেখেছে দাঁড়ানো শিশ্ন; তা যা-ই হোক, তারা দেখেছে পুরুষ পশুর যৌনাঙ্গ, এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঘোড়ার যৌনাঙ্গ প্রায়ই আকর্ষণ করেছে তাদের স্থিরদৃষ্টি; এটা হতে পারে খুবই ভীতিকর। সন্তানপ্রসবের ভয়, পুরুষের যৌনাঙ্গের ভয়, বিবাহিতদের আক্রান্ত করে যে-সব সংকট, সেগুলোর ভয়, অশোভন আচরণের প্রতি ঘৃণা–এসব মিলেমিশে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে ছোটো মেয়ে ঘোষণা করে : ‘আমি কখনো বিয়ে করবো না’। যন্ত্রণা, বোকামি, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে এটাই হবে নিশ্চিত প্রতিরোধ।
তবুও রূপান্তর ঘটতে থাকে। ছোটো মেয়ে এর অর্থ বুঝতে পারে না, কিন্তু সে লক্ষ্য করে যে বিশ্বের সাথে ও তার নিজের শরীরের সাথে তার সম্পর্কের মধ্যে ঘটছে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন : সে সচেতন হয়েউঠছে সে-সব স্পর্শ, স্বাদ, রঙের প্রতি, যেগুলো আগে ছিলো তার প্রতি উদাসীন; অদ্ভুত সব ছবি ঝিলিক দিতে থাকে তার মনে; আয়নায় সে নিজেকে প্রায় চিনতেই পারে না; তার নিজেকে ‘অদ্ভুত’ লাগতে থাকে, সব কিছু তার ‘অদ্ভুত’ লাগে।
এ-অস্থিরতার সময়ে যা ঘটতে থাকে, তা হচ্ছে বালিকার দেহ পরিণত হতে থাকে নারীর দেহে এবং হয়ে উঠতে থাকে মাংস। লালাগ্রন্থিক ন্যূনতার বেলা ছাড়া, যেখানে বিষয়ী আবদ্ধ হয়ে থাকে বালসুলভ পর্বে, বয়ঃসন্ধির সংকট হঠাৎ এসে হাজির হয় বারো-তেরো বছর বয়সে। ছেলের থেকে মেয়ের মধ্যে এ-সংকট দেখা দেয় অনেক আগে, এবং এটা ঘটিয়ে থাকে অনেক বেশি গুরুত্বপর্ণ বদল। কিশোরী মেয়ে এর সাক্ষাৎ লাভ করে অস্বস্তির সাথে, বিরক্তির সাথে। যখন দেখা দিতে থাকে স্তন ও শরীরের লোম, তখন জন্ম নেয় এমন একটা বোধ, যা অনেক সময় দেখা দেয়। গর্বরূপে, তবে সেটা মূলত লজ্জা; হঠাৎ বালিকা হয়ে ওঠে বিনয়ী, সে উলঙ্গ হতে চায় এমনকি তার মা ও বোনদের সামনে, সে নিজেকে দেখতে থাকে মিলেমিশে যাওয়া বিস্ময় ও বিভীষিকার মধ্যে, এবং নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে সে দেখতে থাকে প্রতিটি বৃন্তের নিচে বেড়ে উঠছে এ-টানটান ও কিঞ্চিৎ বেদনাদায়ক শাঁসটি, যা এপর্যন্ত ছিলো নাভির মতোই নিরীহ। একথা অনুভব করে সে বিচলিত বোধ করে যে তার আছে একটা অরক্ষিত স্থান; এ-স্পর্শকাতর ও যন্ত্রণাপূর্ণ স্থানটি অবশ্যই পোড়ার বা দাঁতের ব্যথার তুলনায় তুচ্ছ ব্যাপার; তবে আঘাতের ফলেই হোক বা অসুখের ফলেই হোক, সব ধরনের ব্যথাই অস্বাভাবিক জিনিশ। কিছু একটা ঘটছে–যা অসুখ নয়–যার ইঙ্গিত রয়েছে অস্তিত্বের নিয়মের মধ্যেই, তবে তার প্রকৃতি অনেকটা সংগ্রামের, একটা ক্ষতের। শৈশব থেকে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মেয়েটি অবশ্যই বড়ো হয়েছে, তবে সে কখনো তার বৃদ্ধি টের পায় নি : দিনের পর দিন তার শরীর ছিলো এক বর্তমান ঘটনা, নির্দিষ্ট, সম্পূর্ণ কিন্তু এখন সে ‘বাড়ছে’। এ-শব্দটিই বিভীষিকাজাগানো; স্তনের বিকাশের মধ্যে বালিকা বোধ করে বাঁচা শব্দটির দ্ব্যর্থতা। সে সোনাও নয়হীরেও নয়, এক অদ্ভুত পদার্থ, সব সময়ই পরিবর্তনশীল, অনির্দিষ্ট, যার গভীরতলে বিশদভাবে ঘটছে অপরিচ্ছন্ন রসায়ন। সে অভ্যস্ত মাথাভরা চুলে, যা রেশমি ফেটির মতো নীরবে ঢেউ খেলে; কিন্তু তার বগলে ও মধ্যভাগে এই নতুন উদাম তাকে রূপান্তরিত করে এক ধরনের জম্ভ বা শৈবালে। তাকে আগে থেকে সতর্ক করে দেয়া হোক বা না হোক, এসব বদলের মধ্যে সে অনুভব করে এক চূড়ান্ত অবস্থার পূর্ববোধ, যা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র থেকে : সে দেখতে পায় তাকে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে এক জীবনচক্রে, যা প্লাবিত করছে তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের গতিপথকে, সে জানতে পারে ভবিষ্যতের পরনির্ভরতাকে, যা তাকে দণ্ডিত করে পুরুষের কাছে, সন্তানের কাছে, এবং মৃত্যুর কাছে। শুধু স্তন হিশেবে তার স্তন দুটিকে মনে হবে এক অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিতভাবে চাপিয়ে দেয়া বিস্তার বলে। বাহু, পা, ত্বক, পেশি, এমনকি বর্তুল পাছা, যার ওপর সে বসে–এ-পর্যন্ত এগুলোর ছিলো সুস্পষ্ট উপযোগিতা; শুধু তার লিঙ্গটিকে, সুস্পষ্টভাবেই যেটি প্রস্রাব করার প্রত্যঙ্গ, মনে হতো কিছুটা সন্দেহজনক, তবে সেটি ছিলো গোপন ও অন্যদের কাছে অদৃশ্য। তার সুয়েটার বা ব্লাউজের নিচে থেকেও তার স্তন দুটি প্রদর্শন করে। নিজেদের, এবং যে-দেহটির সাথে ছোটো মেয়ে নিজেকে অভিন্ন বোধ করেছে, সেটিকে সে এখন বোধ করে মাংসরূপে। এটি হয়েওঠে একটি বস্তু, যা দেখতে পায় অন্যরা এবং যার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অন্যরা। ‘দু-বছর ধরে,’ এক মহিলা আমাকে বলেছেন, ‘আমার বুক লুকিয়ে রাখার জন্যে আমি ঢিলে জামা পরেছি, আমি এতো লজ্জায়ছিলাম এ নিয়ে’। এবং আরেকজন : ‘আমার আজো মনে পড়ে আমি কেমন অদ্ভুত বিভ্রান্তি বোধ করেছিলাম যখন আমার বয়সেরই এক বান্ধবী, তবে যে আমার থেকে অনেক বেশি বাড়ন্ত ছিলো, সে যখন উপুড়হয়ে একটি বল তুলছিলো আর আমি তার অন্তর্বাসের ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম তার পূর্ণবিকশিত স্তন দুটি। আমার নিজের বয়সের কাছাকাছি একটি দেহ, যার আদলে গড়ে উঠবে আমার দেহটি, সেটি দেখে নিজের কথা ভেবে আমার গাল লাল হয়ে উঠেছিলো’। কিশোরী মেয়ে বোেধ করে তার শরীর যেনো তার কাছে থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এটা আর ব্যক্তিতার সরাসরি প্রকাশ নয়; এটা অচেনা হয়ে ওঠে তার কাছে; এবং একই সময়ে অন্যদের কাছে সে হয়ে ওঠে একটি জিনিশ : পথে চোখে চোখে তাকে অনুসরণ করে পুরুষেরা এবং তার দেহসংস্থান সম্পর্কে মন্তব্য করে। তার ইচ্ছে হয় অদৃশ্য হয়ে যেতে; মাংস হয়ে উঠতে ও তার মাংস প্রদর্শন করতে তার ভয় লাগে।
