এটাই ব্যাখ্যা করে কেনো ছোটো বালিকা তার ভাইদের থেকে বেশি আচ্ছন্ন হয়ে থাকে কামের রহস্যের ভাবনা দিয়ে। ছেলেরাও এসব ব্যাপারের প্রতি বোধ করে সংরক্ত আকর্ষণ; কিন্তু ভবিষ্যতে স্বামী ও পিতা হিশেবে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে তারা ভাবেই না। সেখানে বিয়ে ও মাতৃত্ব হয়ে ওঠে বালিকার সমগ্র নিয়তি; এবং যখন থেকে সে ওগুলোর গুপ্তকথা সামান্যও বোঝে, তার মনে হয় যেনো কদর্যভাবে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে তার দেহ। মাতৃত্বের ইন্দ্রজাল দূরীভূত হয়ে গেছে : মোটামুটি ঠিকভাবেই এখন এটা জেনে গেছে বালিকা, এবং আগে হোক বা পরে হোক সে জেনেছে যে শিশু দৈবক্রমে এসে উপস্থিত হয় না মায়ের দেহের ভেতরে এবং এটা একটা যাদুকাঠি নাড়ানোর ফলে দেহ থেকে বেরিয়ে আসে না; সে নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকে উদ্বেগের সাথে। এটা আর বিস্ময়কর মনে হয় না তার কাছে, বরং তার দেহের ভেতরে বিস্তার লাভ করবে একটা পরজীবী দেহ, এটা তার কাছে বীভৎস মনে হয়; এবং এ-দানবিক ফুলে ওঠার সামান্য ভাবনাই তাকে সন্ত্রস্ত করে তোলে।
এবং শিশুটি বেরোবে কীভাবে? এমনকি যদি কেউ তাকে সন্তানপ্রসবের আর্তনাদ ও যন্ত্রণার কথা নাও বলে থাকে, সে হয়তো হঠাৎ শুনে ফেলেছে এ-সম্পর্কে কথা বা পড়েছে বাইবেলের কথাগুলো : ‘কষ্টের ভেতর দিয়ে তুমি সন্তান জন্ম দেবে’; একটি পূর্ববোধ আছে তার ওই পীড়ন সম্পর্কে, যা সে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে কল্পনাও করতে পারে; সে অদ্ভুত সব ক্রিয়া উদ্ভাবন করে নাড়ির এলাকায়। যদি সে অনুমান করে জণটি বেরোবে পায়ুদ্বার দিয়ে, তাহলেও ওই ভাবনা তাকে আশ্বস্ত করে না : জানা গেছে যে ছোটো মেয়েরা মানসিক চাপজনিত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে যখন তারা মনে করে যে তারা প্রসবের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছে। যথাযথ ব্যাখ্যাও বিশেষ কাজে আসে না : তার ভেতর আনাগোনা করতে থাকে ফোলার, ছেঁড়ার, রক্তক্ষরণের ছবি।
গর্ভধারণ ও প্রসবের শারীরিক প্রকৃতি অবিলম্বে নির্দেশ করে যে শারীরিক কিছু একটা ঘটে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে। ‘একই রক্তের সন্তান’, ‘বিশুদ্ধ রক্ত’, ‘মিশ্র রক্ত’ প্রভৃতি কথায় ‘রক্ত’ শব্দটি প্রায়ই উপস্থিত থেকে অনেক সময় পরিচালিত করে। শিশুসুলভ কল্পনাকে; উদাহরণস্বরূপ, এমন মনে হতে পারে যে বিয়ে হচ্ছে একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে রক্তসঞ্চালনের এক ধরনের ধর্মীয় ব্ৰতানুষ্ঠান। তবে ‘শারীরিক কিছু একটা’ অধিকাংশ সময়ই সম্পর্কিত থাকে মূত্র ও বিষ্ঠাঘটিত প্রত্যঙ্গের সাথে; শিশুরা বিশেষ করে বিশ্বাস করতে চায় যে পুরুষটি প্রস্রাব করে নারীটির ভেতরে। যৌনক্রিয়াকে মনে করা হয় নোংরা। এটা অত্যন্ত বিপর্যস্তকর শিশুর কাছে, যার জন্যে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ‘নোংরা’ জিনিশ : তাহলে বড়োরা কীভাবে এমন জিনিশ মেনে নিতে পারে জীবনের অচ্ছেদ্য অংশরূপে?
শিশুদের যখন সাবধান করা হয় অচেনাদের সম্পর্কে বা কোনো যৌন ব্যাপার ব্যাখ্যা করা হয় তাদের কাছে, এটা সম্ভব যে তখন নির্দেশ করা হয় রোগগ্রস্তদের প্রতি, প্রচণ্ড উন্মাদদের প্রতি, বিকৃতমস্তিষ্কদের প্রতি; এটা এক সুবিধাজনক ব্যাখ্যা। যে-শিশু সিনেমায় ছোঁয়া বোধ করে পাশের লোকটির, বা যে রাস্তায় কাউকে ন্যাংটো হতে দেখেছে, সে বিশ্বাস করে তারা পাগল। একথা সত্য যে উন্মত্তের মুখোমুখি হওয়া অপ্রীতিকর : মৃগীরোগীর আক্রমণ, স্নায়ুবিকারগ্রস্তের ক্রোধের বিস্ফোরণ, বা। প্রচণ্ড কলহ বিপর্যস্ত করে বয়স্কদের জগত, যে-শিশু এটা দেখে সে বিপন্ন বোধ করে; তবে সুদৃশ্যভাবে সজ্জিত সমাজে যেমন আছে কিছু সংখ্যক ভিখিরি, ঘোড়া, ও জঘন্য ঘায়েভরা জরাগ্রস্ত, সমাজের ভিত্তি বিচলিত না করে তাই সেখানে পাওয়া যেতে পারে কিছু অস্বাভাবিকও। কিন্তু সন্দেহ করা হয় যে পিতামাতা, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকেরা গোপনে উদযাপন করে কৃষ্ণ ম্যাস, তখন শিশু সত্যিসত্যিই ভয় পায়।
বস্ত্রপরিহিত ও সম্মানিত ভদ্রলোকগণ, যাঁরা নির্দেশ করেন শোভনতা, সংযম, যুক্তির জীবন, এ-ভাবনা থেকে কী করে যাওয়া যায় পরস্পর ধস্তাধস্তিরত দুটি পশুর ভাবনায়? এখানেই আছে বয়স্কদের আত্ম-মানহানি, যা কাঁপিয়ে তোলে তাদের স্তম্ভভিত্তি, যা অন্ধকারাচ্ছন্ন করে আকাশ। শিশু প্রায়ই ফাস-হয়ে-যাওয়া এ-গুপ্ততথ্য মেনে নিতে একগুয়েভাবে অস্বীকার করে : ‘আমার মা-বাবা ওটা করে না’, বালিকা জোরের সাথে বলে। বা সে নিজে গঠন করার চেষ্টা করে সঙ্গমের একটা শোভন চিত্র : যেমন একটি ছোেটা মেয়ে বলেছে, ‘যখন শিশুর দরকার হয়, তখন পিতামাতা যায় চিকিৎসকের রোগী দেখার ঘরে; তারা নগ্ন হয়, তারা নিজেদের চোখ বেঁধে নেয় কেননা তাদের কিছু দেখা নিষেধ; তারপর চিকিৎসক তাদের একত্র করে এবং দেখে যাতে সব কিছু ঠিকঠাক মতো হয়’; সে প্রণয়কর্মটিকে একটি শল্যচিকিৎসায়রূপান্তরিত করেছে, যা নিঃসন্দেহে অপ্রীতিকর, তবে দন্ত্যচিকিৎসকের সাথে একটা বৈঠকের মতো নির্ভুল। তবু অস্বীকার ও বাস্তব থেকে পলায়ন সত্ত্বেও, শিশুর মনে চুপিসারে ঢোকে অস্বস্তি ও সন্দেহ এবং সৃষ্টি হয় দুধ ছাড়ার মতো বেদনাদায়ক একটা প্রভাব।
এবং যা বাড়িয়ে তোলে ছোটো মেয়ের বিপন্নতা, তা হচ্ছে তার ওপর চেপে আছে দ্ব্যর্থবোধক যে-অভিশাপ, তার রূপ সে স্পষ্টভাবে বুঝে উঠতে পারে না। তার তথ্য বিশৃঙ্খল, বইগুলো পরস্পরবিরোধী; এমনকি কৌশলসংক্রান্ত ব্যাখ্যাও গাঢ় অন্ধকার দূর করতে পারে না; শত শত প্রশ্ন দেখা দেয় : সঙ্গমের কাজটি কি যন্ত্রণাদায়ক? না কি আনন্দদায়ক? এটা কততক্ষণ চলে–পাঁচ মিনিট না কি সারারাত? সে এখানে পড়ে যে একবার আলিঙ্গনেই এক মহিলা মা হয়েছে, আবার অন্য জায়গায় পড়ে যে ঘন্টার পর ঘন্টা যৌন সুখের পরেও নারী বন্ধ্যা থাকে। লোকজন কি প্রতিদিনই ‘এটা করে’? না কি মাঝেমাঝে? শিশু বাইবেল পড়ে, অভিধান ঘেঁটে, তার বন্ধুদের কাছে এসম্পর্কে জিজ্ঞেস করে নিজেকে অবহিত করতে চায়, সুতরাং সে অস্পষ্টতা ও ঘৃণার মধ্যে অন্ধের মতো হাতড়ে ফেরে।
