ছলচাতুরি ও দিবাস্বপ্ন ছোটো মেয়েকে পরিচিত করিয়ে দিতে থাকে অক্রিয়তার সাথে; তবে নারী হওয়ার আগে সে একটি মানুষ, এবং সে ইতিমধ্যেই জানে যে নিজেকে নারী হিশেবে মেনে নেয়া হচ্ছেদাবি ত্যাগ করা এবং নিজের অঙ্গহানি করা; দাবি ত্যাগের ব্যাপারটি প্রলোভনজাগানো হলেও অঙ্গহানিত্ব জাগায় ঘৃণা। ভবিষ্যতের কুয়াশার মধ্যে পুরুষ, প্রেম এখনো সুদূর; বর্তমান মুহূর্তে ছোটো মেয়ে, তার ভাইদের মতোই, চায় সক্রিয়তা ও স্বাধীনতা। শিশুদের ওপর স্বাধীনতা গুরুভার নয়, কেননা এর সাথে দায়িত্ব জড়িত নয়; তারা জানে প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানের মধ্যে তারা নিরাপদ : তারা পালিয়ে যাওয়ার প্ররোচনা বোধ করে না। জীবনের দিকে তার স্বতস্ফূর্ত উদ্বেলন, খেলাধুলোয় তার আনন্দ, হাসাহাসি, রোমাঞ্চকর কর্মকাণ্ড ছোটো মেয়েকে দেখিয়ে দেয় যে মায়ের এলাকাটি সংকীর্ণ ও শ্বাসরুদ্ধকর। তার ইচ্ছে হয়মায়ের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পেতে, এ-কর্তৃত্ব প্রয়োেগ করা হয় এমন ঘনিষ্ঠ ও প্রাত্যহিক রীতিতে যার মতো কিছু ছেলেদের ওপর প্রয়োগ করা হয় না।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে সুখ পায়, যখন তারা তার সাথে এমনভাবে আচরণ করে যেনো সে আছে তাদের সমান অবস্থানে, এবং সে চেষ্টা করে অদের অনুমোদন পাওয়ার। সুবিধাপ্রাপ্ত জাতের অন্তর্ভুক্ত হলে তার ভালো লাগতো। মার্জিত আচরণের বিধিবিধান দ্বারা, নিজের পোশাকের ঝামেলা দিয়ে, গৃহস্থালি কাজকর্মের কাছে বন্দী হয়ে নিজের সব উড়ালকে প্রতিহত করতে সে পছন্দ করে না। অসংখ্য অনুসন্ধান।চালানো হয়েছে এ-ব্যাপারে, প্রায় অধিকাংশ থেকেই পাওয়া গেছে একই ফলাফল : বাস্তবিকভাবে সব ছেলেই–প্লাতোর কালের প্লাতোর মতোই–ঘোষণা করেছে যে। মেয়ে হতে তারা ভয় পায়; আর প্রায় সব মেয়েই দুঃখ পায় যে তারা ছেলে হয় নি। হ্যাভলক এলিসের পরিসংখ্যান অনুসারে, একশোর মধ্যে একটি ছেলে পছন্দ করে মেয়ে হতে; আর শতকরা পঁচাত্তরজনেরও বেশি মেয়ে পছন্দ করে তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে। অধিকাংশ মেয়েই অভিযোগ করে যে তাদের পোশাক বিরক্তিকর, তাতে চলাফেরার স্বাধীনতা থাকে না, তাদের সাবধান থাকতে হয় যাতে তাদের হালকা রঙের স্কার্ট ও ড্রেসে দাগ না লাগে।
দশ বা বারো বছর বয়সে অধিকাংশ ছোটো মেয়েই খাঁটি গারস মাক- অর্থাৎ, এমন শিশু, যারা কোনো একটি অভাবের ফলে ছেলে হতে পারে নি। একে তারা শুধু একটা বঞ্চনা ও অবিচার বলেই মনে করে না, তারা দেখতে পায় তারা দণ্ডিত হয়েছে যে-অবস্থায় থাকার জন্যে, সেটি অশুভ। দমিত হয় মেয়েদের প্রাণোচ্ছলতা, তাদের নিষ্ক্রিয় শক্তি রূপান্তরিত হয় স্নায়বিক দৌর্বল্যে; তাদের অতিশান্ত কাজগুলোনিঃশেষ করতে পারে না তাদের শক্তির প্রাচুর্য; তারা অবসাদগ্রস্ত হয়ে ওঠে, এবং অবসাদের মধ্য দিয়ে ও তাদের হীন অবস্থানের ক্ষতিপূরণের জন্যে নিজেদের তারা সমর্পণ করে বিষাদগ্রস্ত ও রোম্যান্টিক দিবাস্বপ্নের কাছে; তারা সুখ পায় এসব সহজমুক্তির প্রক্রিয়ার মধ্যে এবং হারিয়ে ফেলে তাদের বাস্তবতাবোধ; তাদের আবেগের কাছে তারা ধরা দেয় অদম্য উত্তেজনায়; কাজ করার বদলে তারা কথা বলে, অধিকাংশ সময় খিচুড়ির ধরনে মিলিয়েমিশিয়ে দেয় গুরুতুপূর্ণ কথার সাথে নিরর্থক কথা। অবহেলিত, ‘ভুলভাবে বোঝা’, তারা সান্ত্বনা খোঁজে আত্মরতিক কল্পনায় : নিজের প্রতি অনুরাগ ও করুণার সাথে নিজেদের তারা কল্পনা করতে থাকে উপন্যাসের রোম্যান্টিক নায়িকারূপে। খুবই স্বাভাবিকভাবে তারা হয়ে ওঠে ছেনাল ও নাটুকে, এ-ক্রটিগুলো লক্ষণীয় হয়ে ওঠে বয়ঃসন্ধিকালে। তাদের অসুস্থতা ধরা পড়েধৈর্যহীনতায়, বদমেজাজের ঘোরে, অশ্রুপাতে; তারা কান্না উপভোগ করে। অনেক নারী এ-অভ্যাস টিকিয়ে রাখে বুড়ো বয়স পর্যন্ত অনেকটা এজন্যে যে তারা দণ্ডিতের ভূমিকায়। অভিনয় করতে পছন্দ করে : এটা যুগপৎ তাদের নির্মম ভাগ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলার উপায়। ছোটো বালিকারা প্রায়ই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে দেখে নিজেদের, তাদের সুখ দ্বিগুণ করার জন্যে।
তবে এভাবে তার অক্রিয় ভূমিকা মেনে নিয়ে, প্রতিবাদ না করে বালিকা রাজি হয় এমন এক নিয়তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে, যা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া হতে যাচ্ছে তার ওপর, এবং এ-দুর্যোগ তাকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। কোনো ছেলে, সে উচ্চাভিলাষী, বা চিন্তাভাবনাশূন্য, বা ভীতু, যাই হোক, সে চোখ রাখে এক মুক্ত ভবিষ্যতের দিকে; সে নাবিক হবে বা হবে প্রকৌশলী, সে খামারে কাজ করবে বা শহরে চলে যাবে, সে বিশ্বটাকে দেখবে, সে ধনী হবে; সে স্বাধীনভাবে দাঁড়াবে সেভবিষ্যতের মুখোমুখি, যার ভেতরে তার জন্যে অপেক্ষায় আছে অভাবিত। বালিকা হবে স্ত্রী, মা, মাতামহী; সে ঘরবাড়ি গুছিয়েরাখবে যেমন রাখতো তার মা, ছোটো বয়সে সে যেমন সেবাযত্ন পেয়েছে, তাই সে দেবে তার সন্তানদের–তার বয়স বারো, কিন্তু এর মাঝেই তার উপাখ্যান লেখা হয়ে গেছে স্বর্গে। সে একে তৈরি না করে একে আবিষ্কার করবে দিনের পর দিন; সে ঔৎসুক্য বোধ করে, তবে ভয় পায় যখন গভীরভাবে চিন্তা করে এ-জীবনের কথা, যার প্রতিটি স্তরই আগাম জানা হয়ে গেছে এবং যার দিকে অপ্রতিরোধভাবে সে এগিয়ে চলছে প্রতিদিন।
