সমস্ত ঘটনাটা ঘটল মুহূর্তের মধ্যে। দু-দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই প্রায় প্রতিধ্বনির মতো আর একটি গুলির আওয়াজ শোনা গেল। খিড়কির দরজা থেকে গুলি চালিয়েছে জন ব্লেভান্স।
অত কাছ থেকে জনের মতো পাকা বন্দুকবাজ কী করে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল বলা মুশকিল, খুব সম্ভব ওয়েন্স চটপট সরে গিয়েছিল–তবে গুলিটা যে ফসকে গিয়েছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। একটু দূরেই বাঁধা ছিল অ্যান্ডির ঘোড়া–ওয়েন্সের উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত বুলেট এসে লাগল তার গায়ে। জন্তুটা মারা পড়ল তৎক্ষণাৎ।
ওয়েন্সের রাইফেল তখনও কোমরের কাছেই নীচু করে ধরা ছিল। অস্ত্রটাকে না-তুলে সেই অবস্থাতেই সে সাঁৎ করে জনের দিকে ঘুরে গেল এবং পরক্ষণেই অভ্যস্ত আঙুলের চাপে রাইফেল করল অগ্নি-উদগিরণ।
পিছন দিকে ঘুরে পড়ে গেল জন ব্লেভান্স। গুলির আঘাতে তার একদিকের কাঁধ চূর্ণবিচূর্ণ।
একলাফে বারান্দা থেকে নেমে রাস্তার উপর এসে দাঁড়াল ওয়েন্স, এর মধ্যেই সে রাইফেলের লিভার টেনে শূন্য গুলির খোল ফেলে নূতন টোটা ভরে ফেলেছে। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে দু-দিকের দরজার উপরই সে নজর রাখতে পারছিল। পলকের জন্য খোলা জানালা দিয়ে অ্যান্ডির দেহ তার চোখে পড়ল টলতে টলতে ঘরের ভিতর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আহত খুনি। আবার গর্জে উঠল উইনচেস্টার রাইফেল, কিন্তু এবার ওয়েন্সের লক্ষ্য ব্যর্থ হল।
ঠিক সময়েই সরে গিয়েছিল ওয়েন্স, কারণ সে রাস্তায় নেমে পড়ার সঙ্গেসঙ্গেই বাড়ির পুবদিকে ঘুরে সামনে এসে দাঁড়াল মোস রবার্টস, পরক্ষণেই সশব্দে অগ্নিবৃষ্টি করল তার হাতের রিভলভার।
এতক্ষণের মধ্যে এই প্রথম ওয়েন্স গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করল। বাড়ির সামনে একটা ওয়াগন দাঁড়িয়ে ছিল, সেই গাড়িটার পিছনে সরে এসে ওয়েন্স রাইফেল চালাল।
প্রচণ্ড আঘাতে এক পাক ঘুরে পিছিয়ে গেল রবার্টস, তারপর টলতে টলতে আত্মগোপন করল বাড়ির পিছন দিকে।
কিন্তু লড়াই তখনও শেষ হয়নি। অ্যান্ডির পরিত্যক্ত রিভলভারটা তুলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল প্রতিশোধ গ্রহণে কৃতসংকল্প কিশোর স্যাম হোস্টন ব্লেভান্স। সে রিভলভার তুলে ওয়েন্সের দিকে লক্ষ্য স্থির করতে লাগল। কিন্তু স্যামের রিভলভার অগ্নিবর্ষণ করার সুযোগ পেল না, তার আগেই ওয়েন্সের রাইফেলের গুলি অব্যর্থ সন্ধানে প্রতিবন্দ্বীর বক্ষ ভেদ করল। স্যামের মৃত্যু হল তৎক্ষণাৎ। তার প্রাণহীন দেহ দরজা দিয়ে এসে পড়ল মায়ের প্রসারিত বাহুবন্ধনের মধ্যে।
কয়েক মিনিট পরে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল শেরিফ কমোডার ওয়েন্স। তার সঙ্গে এল আশেপাশে দণ্ডায়মান দর্শকের দল। মেয়েরা তখন চিৎকার করে কাঁদছে আর সাহায্য ভিক্ষা করছে।
বাড়ির ভিতরের অবস্থা তখন বিধ্বস্ত রণক্ষেত্রের মতো। দেয়াল, মেঝে, আসবাবপত্র রক্তে রক্তময়। বিছানার উপর পড়ে আছে রবার্টসের দেহ, ওইখানেই এসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। সে। দরজার কাছে স্যামের প্রাণহীন শরীর মেঝের উপর লম্ববান; আর একটু দূরেই মায়ের ঘরে মেঝের উপর পড়ে অসহ্য যাতনায় ছটফট করছে অ্যান্ডি কুপার, তার উদর বিদীর্ণ করে দিয়েছে রাইফেলের বুলেট।.আর্তস্বরে অ্যান্ডি বার বার অনুরোধ করছে তাকে যেন এই মুহূর্তে গুলি করে মেরে ফেলা হয়, এই যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারছে না।
অ্যান্ডির মৃত্যু হল পরের দিন। চারজনের মধ্যে প্রাণে বেঁচেছিল শুধু জন ব্লেভান্স। অর্ধমূৰ্ছিত অবস্থায় সে বসেছিল একটা চেয়ারের উপর, তার সর্বাঙ্গ রক্তসিক্ত। সে আরোগ্যলাভ করেছিল। পরবর্তীকালে বিচারে তার কারাদণ্ডের আদেশ হয়।
কিন্তু ওই ভয়ংকর রক্তাক্ত যুদ্ধে কমোডোর ওয়েন্স ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। সে রাইফেল ছুঁড়েছিল পাঁচবার তার মধ্যে একবারই সে ব্যর্থ হয়েছিল, বাকি চারটি গুলি লক্ষ্য ভেদ করেছিল অব্যর্থ সন্ধানে।
কাহিনি রক্তসিক্ত
১৮৬৩ সাল, গ্রীষ্মের শেষ।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অধিকৃত মেক্সিকোর অন্তর্গত কলোর্যাডো টেরিটরি নামক রাজ্যে স্থানীয় শাসনকর্তা গভর্নর জন ইভান্সের কাছে চিঠি পাঠাল একজন মেক্সিকোর অধিবাসী।
তার নাম, ফিলিপ নিরিও এসপিনোসা।
ফিলিপের চিঠিতে যা লেখা ছিল তার সারমর্ম হচ্ছে, যদিও সরকার তাকে ছাব্বিশটি আমেরিকান কুকুরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করছেন, তবু পত্ৰলেখকের মতে এ-বিষয়ে স্থানীয় অধিবাসী ও সৈন্যদের মতামত গ্রহণ করা উচিত, কারণ শেষোক্ত ব্যক্তিদের মতে পত্রলেখক কর্তৃক নিহত মানুষের সংখ্যা কম করেও চল্লিশ। তবে এ-বিষয়ে জোর করে কিছু বলা যায় না, লোকে হয়তো পত্ৰলেখককে একটু বেশি সম্মান দিয়ে থাকে। যাই হোক, এই খুনখারাপির ব্যাপারটা পত্ৰলেখকের কাছে অত্যন্ত ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে, তাই সে এখন শান্তি চায়। শান্তির মূল্য হিসাবে তার কিছু চাহিদা আছে–সদয় সরকার যদি সেই যৎসামান্য দাবি পূরণ করেন, তাহলে পত্ৰলেখক ফিলিপ তার অস্ত্র নামিয়ে দলের লোকদের খুনোখুনি থেকে নিরস্ত করতে রাজি। নিম্নলিখিত শর্তগুলি পত্রে উল্লিখিত যৎসামান্য দাবি
১) ফিলিপ এবং তার দলবল সম্পর্কে যেসব হত্যা, লুণ্ঠন ও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আছে, সেই অভিযোগগুলিকে প্রত্যাহার করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া চলবে না।
