যাই হোক, হেফাজতে ইসলামের তের দফা দাবি রয়েছে, সেই তের দফা দাবি মানা হলে বাংলাদেশ এক ঘণ্টার মাঝে আফগানিস্তান হয়ে যাবে। সেই দাবিগুলো মেয়েদের জন্যে শুধু অপমানজনক নয়, ভয়ংকর রকম বিপদজনক। মেয়েদের এ রকম অসম্মান করা দাবি-দাওয়া কেমন করে দেওয়া হল সেটা নিয়ে আমার এক ধরনের বিস্ময় ছিল।
ঠিক তখন হেফাজতের নেতা আহমেদ শফীর সেই বিখ্যাত তেঁতুল-সংক্রান্ত বাণীটি প্রচারিত হল। আমাদের দেশ যে হাজার রকম বাধা-বিপত্তির মাঝেও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তার প্রধান কারণ হচ্ছে এই দেশে ছেলেরা আর মেয়েরা পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরে এই দেশে অসংখ্য পরিবারের পুরুষ সদস্য মারা যাবার পর মেয়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের রক্ষা করার জন্যে ঘরের বাইরে এসে কাজ শুরু করেছিল।
সেখান থেকে শুরু। এখন আমাদের দেশে ছেলেরা যে কাজ করতে পারে মেয়েরাও সেই কাজ করতে পারে। মেয়ে শ্রমিক এই দেশে খুব পরিচিত একটা দৃশ্য। স্কুলে অনেক জায়গায় ছেলেদের থেকে মেয়েরা সংখ্যায় বেশি। হেফাজতে ইসলামের নেতা আহমেদ শফী তার তেঁতুল-তত্ত্বে পরিষ্কার বলে দিলেন, মেয়েদের ক্লাস ফোর-ফাইভ থেকে বেশি পড়ার প্রয়োজন নেই। পুরুষদের একাধিক বিয়ে করতে উৎসাহ দিলেন। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ঘোর অবৈজ্ঞানিক কিছু তত্ত্ব দিয়ে সেটা নিরুৎসাহিত করলেন। যে সংগঠনের নেতার এ ধরনের বিশ্বাস তারা এই দেশে মেয়েদের সম্মান করবে সেটা তো আশা করা যায় না।
মেয়েদের অসম্মান করা ছাড়াও আরও কিছু ব্যাপার আছে। মে মাসের ৫ তারিখ একজন হেফাজতে ইসলামের কর্মী তার হুজুরের আদর্শে বলীয়ান হয়ে একটি এসএমএস পাঠিয়ে পরিষ্কারভাবে আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, সম্ভবত এটাই আমার শেষ রাত, পরদিন আমাকে জবাই করা হবে।
কিছুদিন আগে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের চালানো মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করার সময় বেশ কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র মারা গেছে। যার অর্থ তাদের কাজকর্ম শুধু আইন করে মেয়েদের ঘরের মাঝে বন্দি করে ফেলায় সীমিত নয়– বোমা তৈরি, বোমার ব্যবহার কিংবা আমাদের মতো মানুষদের জবাই করাসহ নানা ধরনের কাজেও তাদের উৎসাহ রয়েছে।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ হলে সমস্যা ছিল না, আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে তারা ক্ষমতায় গেলে হেফাজতে ইসলামের এই তের দফা বাস্তবায়ন করবে! ‘প্রথম আলো’ এবং ‘ডেইলি স্টার’ জরিপ করে বের করেছে নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে।
তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মেয়েরা ঘরের মাঝে বন্দি হয়ে যাবে? আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি লেখাপড়া করে, তারা আর পাশাপাশি পড়াশোনা করতে পারবে না? হেফাজতে ইসলামের তের দফা মেনে তো আর যাই হোক আধুনিক বাংলাদেশ কল্পনা করা যাবে না।
আজকাল দেশের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলো জরিপ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে নিয়ে আসছে। মজার ব্যাপার হল, ষোল কোটি মানুষের দেশে হাজার দেড়েক মানুষের জরিপ নিলেই ষোল কোটি মানুষের মনের কথা বের হয়ে আসছে। তাহলে নির্বাচনের আগে আমরা আরও কিছু জরুরি জরিপ কেন করে ফেলি না?
এই দেশের ভোটারদের অর্ধেক হচ্ছে মহিলা। আমরা কেন শুধু মহিলাদের মাঝে একটা জরিপ করে জেনে নিই না আগামী নির্বাচন নিয়ে তারা কী ভাবছেন। বাংলাদেশেটা যখন একটা আধুনিক দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে ঠিক তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল হেফাজতে ইসলামের তের দফা বাস্তবায়ন করার কথা বলে নির্বাচন করবে, এই দেশের মেয়েরা কি সেটা মেনে নিবে? স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা মেনে নেবে? গার্মেন্টেসের মেয়েরা মেনে নেবে? মেয়ে নির্মাণ শ্রমিকরা মেনে নেবে? মায়েরা মেনে নিবে?
২
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন সারাদেশে হরতাল চলছে। নূতন প্রজন্ম আসলে কখনও সত্যিকারের হরতাল দেখেনি। একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর ডাকে এদেশে কিছু হরতাল হয়েছিল। যারা সেগুলোতে অংশ নিয়েছে শুধু তারাই বলতে পারবে হরতাল ব্যাপারটা কী।
এখন যে হরতাল দেওয়া হয় সেগুলো মানুষকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা ঘরের মাঝে বসে নিজের কাজ করি। (সত্যি কথা বলতে কি, এই হরতালের কারণে আমার একটা আস্ত বই লেখা হয়ে গেছে!) কিন্তু গরীব মানুষের খুব কষ্ট। তারা নিশ্চয়ই এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে ভাবে, কেমন করে এই দেশের মানুষ এত মমতাহীন হতে পারে। কেমন করে তারা নিজেরা বাড়তি একটা দিন ছুটি উপভোগ করে তাদের মতো বাড়ির মানুষদের অভুক্ত থাকার দিকে ঠেলে দেয়।
সত্যি কথা বলতে কি, এই দেশের দুঃখী মানুষ সেটাও সহ্য করতে রাজি ছিল। কিন্তু ইদানিং যে ব্যাপারটা ঘটছে সেটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
আমরা সবাই দেখেছি হরতালে পিকেটিং করার জন্যে গাড়ির ভেতরে মানুষ রেখে গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমস্ত শরীর পুড়ে একজন কিশোর অঙ্গার হয়ে বসে আছে। এর চাইতে ভয়ংকর, হৃদয়বিদারক, নিষ্ঠুর দৃশ্য আর কী হতে পারে? কাজকর্ম করতে গিয়ে, চুলোর কাছে কিংবা মোমবাতির আলোতে যখন হঠাৎ করে আঙুলে আগুনের ছ্যাকা লাগে তখন আমরা কী যন্ত্রণায় ছটফট করি। যখন একজন মানুষের পুরো শরীর আগুনে পুড়ে যায় তখন সেই যন্ত্রণা না জানি কত ভয়ংকর!
কত নিষ্ঠুর হলে একজন মানুষ সম্পূর্ণ বিনা কারণে আরেকজন মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে? তাদের মনের ভেতর কি সেটা নিয়ে এতটুকু অপরাধবোধ নেই? ধরে নিতে হবে এটা রাজনীতির ধারা? হরতাল সফল করার জন্যে দেশের কিছু মানুষকে হত্যা করা যেতে পারে? এই দেশের মানুষ হিসেবে আমি কি নিজেকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত রাখতে পারব?
